Bartaman Logo
১৪ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নামকরণের রাজনীতি

সংসদীয় গণতন্ত্রে কোনো অঞ্চল বা রাজ্যের নাম পরিবর্তন কেবল ভৌগোলিক পরিচয় বদলের সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অবস্থান, দেশপ্রেম এবং ঐতিহাসিক আবেগের টানাপোড়েনে রূপ নেয়।

নামকরণের রাজনীতি
  • ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংসদীয় গণতন্ত্রে কোনো অঞ্চল বা রাজ্যের নাম পরিবর্তন কেবল ভৌগোলিক পরিচয় বদলের সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অবস্থান, দেশপ্রেম এবং ঐতিহাসিক আবেগের টানাপোড়েনে রূপ নেয়। রাজ্যের নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত বিতর্কটি দীর্ঘদিনের হলেও সম্প্রতি তা কেন্দ্র ও রাজ্যের রাজনৈতিক মঞ্চে পুনরায় তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ থেকে বদলে ‘বাংলা’ রাখা হবে না—এই অবস্থান আগেই স্পষ্ট করেছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এবার সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় দাঁড়িয়ে একই বার্তার পুনরাবৃত্তি করলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর পরিষ্কার বক্তব্য, পূর্বতন তৃণমূল সরকার কেবল সংখ্যার জোরে বিধানসভায় এই সংক্রান্ত প্রস্তাব পাশ করিয়েছিল। বিজেপি অতীতে যেমন এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে, বর্তমানেও ঠিক একই অবস্থানে অনড় রয়েছে। সম্প্রতি সংসদে কেরল রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে ‘কেরলম’ করার বিল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছিল। কেরল সরকারের সেই প্রস্তাবে কেন্দ্র সাড়াও দেয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে সেই অনুযায়ী বিল পেশ করা হয়। কেরল নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের টানে নাম পরিবর্তনের অনুমোদন পেলেও, সেই আলোচনার আঁচ এসে লাগল পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অধ্যায়ে। একদিকে কেন্দ্রীয় সদিচ্ছার অভাবের অভিযোগ, আর অন্যদিকে দেশভাগের স্মৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার তর্ক—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে রাজ্যের নামের বিষয়টি আবারও রাজনীতির কেন্দ্রে চলে এল। ‘কেরলম’ সংক্রান্ত বিলটির উপর আলোচনা চলাকালীন তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় সাত-আট বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলে ‘বাংলা’ করার দাবি জানিয়ে এসেছে পূর্বতন রাজ্য সরকার। অথচ কেন্দ্রের তরফ থেকে সেই বিষয়ে কোনো সদর্থক পদক্ষেপ করা হয়নি। কেরলের এই সাফল্য নিশ্চিতভাবেই আনন্দের, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের যুক্তিসঙ্গত দাবি কেন বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে, তা সত্যিই বোধগম্য নয়।

Advertisement

তৃণমূল সাংসদের সেই আক্ষেপ ও প্রশ্নের জবাব দিতে উঠে শমীক ভট্টাচার্য ১৯৪৭ সালের ২০ জুনের ঐতিহাসিক ভোটাভুটির প্রেক্ষাপট বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কেন ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামটি শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ডের পরিচয় নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ইতিহাস ও আবেগের প্রতীক। তিনি প্রস্তাব করেন, রাজ্যের নাম বাংলায় ‘বাংলা’ বা ইংরেজিতে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ না রেখে, সমস্ত ভাষাতেই একইভাবে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ লেখা ও উচ্চারণ করা উচিত। সংসদে ভাষণ দেওয়ার সময় শমীকবাবু স্পষ্ট ভাষায় জানান, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা প্রতিনিধি হিসাবে তাঁদের একটি নির্দিষ্ট ও গভীর রাজনৈতিক অতীত রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, নথিপত্রে রাজ্যের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’। তবে ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাঙালি হিন্দুদের জন্য একটি সুরক্ষাকবচ বা আলাদা ভূমির প্রয়োজন থেকেই জন্ম হয়েছিল এই ভূখণ্ডের। সেদিন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বও একমত হয়ে জানিয়েছিলেন যে পাকিস্তান বা পশ্চিম পাকিস্তান যাই গঠিত হোক না কেন, বাঙালি হিন্দুদের অস্তিত্ব রক্ষায় ‘পশ্চিমবঙ্গ’ গঠন অপরিহার্য। বিজেপি সাংসদের যুক্তি, কেবলমাত্র ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’-এর অনুবাদ হিসাবে ‘বাংলা’ নামটি গ্রহণ করা হলে দেশভাগের সময়ে যে সমস্ত মানুষ রক্তাক্ত হয়েছিলেন ও অকাতরে শহিদ হয়েছিলেন, তাঁদের অমূল্য ঐতিহাসিক অবদানকে কার্যত ভুলে যাওয়া হবে। ফলে কেবল ভাষার টানে ‘বাংলা’ নাম গ্রহণ করলে সেই রক্তভেজা ইতিহাস ক্ষুণ্ণ হতে পারে। ঠিক যেভাবে বিহারের ঐতিহাসিক পরিচিতি হিসাবে ‘পাটলিপুত্র’ নামটি মর্যাদাপূর্ণ, তেমনই সার্বিক পরিচয়ের স্বার্থে সব ভাষাতেই ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামটি বজায় রাখা চূড়ান্ত প্রয়োজন। তৃণমূল জমানায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর দেখিয়ে এককভাবে নাম পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, এর পাশাপাশি বিহারের বখতিয়ারপুর জংশনের নাম পরিবর্তনের জোরালো দাবি তোলেন শমীক। তাঁর বক্তব্য, কলকাতা থেকে ঐতিহ্যবাহী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যাওয়ার পথে যে বখতিয়ারপুর স্টেশনে নামতে হয়, তা এক ঐতিহাসিক অপমান। যে বখতিয়ার খিলজি প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেছিলেন, স্বাধীন ভারতে আজও তাঁর নামে রেলস্টেশন থাকাটা জাতীয় লজ্জার শামিল। তাই ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে এই সমস্ত নাম পরিবর্তন করা আবশ্যক।
আসলে, কোনো অঞ্চলের নামকরণ কোনো রাজনৈতিক দলের একক এজেন্ডা হতে পারে না। ‘বাংলা’ বনাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ সংঘাতের গভীরে রয়েছে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ। একটি চায় আঞ্চলিক ভাষা ও আধুনিক স্বকীয়তার নিরিখে নতুন পরিচয় গড়তে, অন্যটি চায় ইতিহাসের যন্ত্রণাদগ্ধ অতীত ও ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখতে। কেন্দ্র যেভাবে একই বিষয়ে এক রাজ্যের স্বকীয়তাকে সম্মান জানিয়ে অন্য রাজ্যের দীর্ঘদিনের 
দাবিকে মুলতুবি রেখে দিয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সাম্যের বার্তা দেয় না। রাজকীয় দম্ভ নয়, বরং ঐতিহাসিক আবেগ ও জনগণের গণতান্ত্রিক ইচ্ছার মধ্যে একটি সুস্থ সমন্বয় সাধন করাই সংসদীয় রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ