ধ্রুব উপাখ্যান
ধ্রুব উপাখ্যান
সৃষ্টি কর্তা ব্রহ্মা একদিন নূতন রূপ ধারণ করলেন। দেখতে দেখতে এই নূতন দেহ দুভাগে ভাগ হয়ে গেল—এক ভাগে পুরুষ আর অন্য ভাগে স্ত্রী। পুরুষ হলেন মনু এবং শতরূপা তাঁর স্ত্রী। মনু ও শতরূপার দুটি ছেলে—একটির নাম উত্তানপাদ, আর একটির নাম প্রিয়ব্রত। উত্তানপাদের দুটি রাণী—সুরুচি এবং সুনীতি। সুরুচির ছেলের নাম উত্তম এবং সুনীতির ছেলে ধ্রুব। রাজা সুরুচিকে বেশী ভালবাসেন, তাঁর ছেলে উত্তমকে কোলে নিয়ে সিংহাসনে বসেন। একদিন উত্তানপাদ সিংহাসনে বসে আছেন—তাই দেখে ধ্রুব বাবার কোলে উঠে সিংহাসনে বসতে চাইল। সুরুচি বললেন, ধ্রুব, তুমি সুনীতির ছেলে; রাজসিংহাসনে তোমার কোন অধিকার নেই। শ্রীহরির তপস্যা কর যদি পরের জন্মে আমার ছেলে হয়ে জন্মাতে পার। তবেই ঐ লোভনীয় রাজসিংহাসনে বসার অধিকার পাবে।
বিমাতার এই তিরস্কারে বালক ধ্রুব কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে গেল। মা আদর করে কোলে নিয়ে বললেন, বাছা, কেঁদো না। অপরকে অপরাধী মনে করছ কেন? যে অপরকে দুঃখ দেয় সে নিজেই দুঃখ পাবে। তোমার বিমাতা তার কড়া কথার জন্য নিজেই শাস্তি পাবে। আমি রাজার প্রিয় নই, আমি কিছু বলতে গেলে রাজা আমার কথায় কান দেবেন না। আর সুরুচি তোমাকে ঠিকই বলেছেন, একান্তভাবে শ্রীহরির ভজনা কর; এছাড়া তোমার রাজসিংহাসন লাভের আর কোন উপায় নেই। যাঁর পাদপদ্ম সেবা করে ব্রহ্মা পেয়েছেন ব্রহ্মপদ, মুনিরা যাঁর পদ বন্দনা করেন, তুমি সেই পদ্ম-পলাশ-লোচন শ্রীহরিকে তোমার মনের কথা বল। শ্রীহরি ছাড়া তোমার দুঃখ আর কেউ দূর করতে পারবে না। বালক ধ্রুব মায়ের কথায় ঠিক ঠিক বিশ্বাস করে তখনই রাজপুরী ছেড়ে বনের পথে বেরিয়ে পড়ল। কোথায় শ্রীহরি! তুমি দেখা দাও। পথে দেবর্ষি নারদের সঙ্গে দেখা হল। যেখানে ভগবানের ভক্ত, সেখানেই নারদ। সরল শিশুর কাছে ব্যাপারটা কি জেনে নিলেন। তারপর পরীক্ষা করার জন্য নারদ বললেন, ধ্রুব, তুমি তো দেখছি নিতান্ত শিশু! তুমি কি করে তপস্যা করবে? তপস্যা যে বড় কঠিন ব্যাপার! আর ভগবানকে পাওয়া—সে যে আরও কঠিন। অতএব বাছা, তুমি এ পথ থেকে নিবৃত্ত হও; ঘরে ফিরে যাও। ধ্রুব তার উত্তরে বললে—বিমাতা অপমান করেছেন। আমার মন বড় চঞ্চল ও হৃদয় অশান্ত। আপনার উপদেশ আমার অশান্ত হৃদয়ে স্থান পাচ্ছে না। হে প্রভু! আমার পূর্বপুরুষগণ যা লাভ করতে পারেন নি আমি শ্রীহরির সেই অভয়পদ লাভ করতে ইচ্ছা করি। আপনি স্বয়ং ব্রহ্মার অংশ, আমাকে ঠিক পথ বলে দিন। নারদ তাতে প্রীত হয়ে বললেন, তোমাকে আমি পরীক্ষা করছিলাম। তুমি ঠিকই বলেছ—শ্রীহরির চরণ বন্দনাই একমাত্র পথ। যমুনাতীরে মধুবনে (বৃন্দবনে) তুমি যাও, তিনি সেখানে নিত্য অবস্থান করেন। সেখানে তুমি একমনে তাঁকে ডাক—আর এই মন্ত্রটি জপ করবে—ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়।
নারদের উপদেশমত ধ্রুব মধুবনে উপস্থিত হল এবং কঠোর থেকে কঠোরতর তপস্যায় নিজেকে নিযুক্ত করল। কিছুদিনের মধ্যেই শ্রীহরি বালকের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দর্শন দিলেন।
স্বামী অমলানন্দের ‘ভাগবতের কথা ও গল্প’ থেকে