আমাদের ঠাকুর বলছেন, ‘আমায় অনুসরণ করে যে, অন্ধ তামিস্রে গতি হয়না তার।’ মনের সর্ববিধ মূঢ়তা হতে মুক্তি পেয়ে চিন্ময় পরিণাম লাভ করতে হলে আমাদের যে তাঁর জীবন ও তাঁর আচারেরই অনুবর্তন করতে হবে—ওই কথা কটিতে ঈশা সে বিষয়ে অবহিত করেছেন আমাদের। অতএব ঈশার জীবনই আমাদের স্বাধ্যায়ের বিষয় হক। ঈশার শিক্ষা সব সাধুসন্তদের শিক্ষাকেই ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর চিদ্বিলাসের খবর যে রাখে, গোপন অমৃতের সন্ধান পাবে সে। কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই তাঁর কথামৃত পান করব—বহুজনেরই এতে তেমন আগ্রহ নাই। তার কারণ ঈশার দিব্যভাব ধরতে পারেনি তারা। সহজভাবে ঈশার বাণী হৃদয় স্পর্শ করবে যাদের, তারাই ওর মর্ম বুঝে নিজের জীবনটি তাঁর ছাঁচে ঢালাই করতে চেষ্টা পাবে। দীনতার অভাবে ত্রিতত্ত্বের অসন্তোষভাজন হও যদি, তাহলে ওই তত্ত্বকথা নিয়ে বাদবিসংবাদে লাভ কি তোমার? বড় বড় কথা আউড়িয়ে মানুষ পুণ্যাত্মা কি ধার্মিক হয়ে যায় না। পবিত্র জীবন যাপনেই কেবল ভগবানের প্রিয় হতে পারে সে। বিবেকদংশনের সংজ্ঞার্থ জানার চেয়ে ওটির উপলব্ধিতেই আমার আকাঙ্ক্ষা বেশি।
দার্শনিকদের পুঁথি ও প্রবচনাদির কথা না হয় বাদই দিলাম। সদাশয়তা ও স্বভাবমাধুর্য যদি না থাকে, বাইবেলখানা আগাগোড়া মুখস্থ করলেই বা কি লাভ তোমার? ভগবানকে ভালবাসা ও তাঁর সেবা করা ছাড়া জগতের আর সব কিছুই চূড়ান্ত দুরাগ্রহ এবং মিথ্যা। সংসার পরিত্যাগ করে নিজেকে ক্রমে চিন্ময় রাজ্যের সন্নিহিত করে তোলাই হল মানুষের পক্ষে জ্ঞানের চরমোৎকর্ষ, আর নশ্বর ধন-সম্পদের আকাঙ্ক্ষা ও ভরসা করাই চিত্তের অসারতার লক্ষণ। মান মর্যাদা ও উচ্চপদের অভিলাষও মানুষের একটা ব্যসন।
জৈব বাসনার বশবর্তী হওয়া, যেজন্য পরিণামে অবশ্যই মর্মান্তিক শাস্তি পেতে হবে, সে-বস্তু কামনা করাই দুরাগ্রহ। সৎভাবে জীবনযাপনে সচেষ্ট না হয়ে দীর্ঘায়ুলাভের কামনা—সেও ব্যসন মাত্র। ভবিষ্যতের দিকে না তাকিয়ে কেবল বর্তমান নিয়ে মাথা ঘামানো মানুষের নিরর্থক ভাবনা। নিত্যানন্দধামের জন্য ব্যাকুল না হয়ে, চপলা-চমকে অপসৃত হয় যা, তার প্রতি আসক্ত হওয়াকে বলি অন্তঃসারশূন্যতা। চোখে সব কিছু দেখা যায় না আর কানেরও শ্রবণশক্তি সীমিত—এ প্রবাদটা বেশীর ভাগ সময় মনে রেখ। দৃশ্যবস্তুতে আসক্তি দূর করে মনকে ফিরাও সেই বস্তুর দিকে যা ‘ন চক্ষুষা পশ্যতি কশ্চন।’ ইন্দ্রিয়পরতন্ত্রের বুদ্ধি মলিন বুদ্ধি, তারা ঈশ্বরকৃপায় বঞ্চিত। স্বভাবতঃ প্রত্যেক মানুষই জ্ঞানলাভ করতে চায়। কিন্তু ভগবৎকৃপালব্ধ নয় যে-জ্ঞান, ধর্মভয় নাই যাতে, সে জ্ঞানে লাভ কি? নিজে কিভাবে জীবন কাটাচ্ছে সে-হিসাব না রেখে নানা মত ও পথের আলোচনা করছে যে-দাম্ভিক দার্শনিক—ঈশ্বরপরায়ণ নিরীহ একটা চাষাও তার চেয়ে ভাল। নিজেকে চেনে যে, নিজের চোখে সে অতি হীন। লোকের প্রশংসায় একটুও উল্লাস হয় না তার।ধর, জগতের সব কিছুই জানি আমি, অথচ দয়াদাক্ষিণ্যের ধার ধারি না। সে-জানায় কর্মফলদাতার কাছে কি সুসার হবে আমার? অত্যধিক জ্ঞানস্পৃহা হতে বিরত হও। ঘোর বিক্ষেপ ও প্রমাদের উদ্ভব হয় ওথেকে। পণ্ডিত যাঁরা, আমরা খুসী মনে তাঁদেরই জ্ঞানী বলে ধরে নিই, সেই চোখেই দেখি তাঁদের। কিন্তু দুনিয়ায় এমন অনেক বিদ্যা আছে, যা জেনে অধ্যাত্মকল্যাণ সামান্যই, বা কোনও কল্যাণই হয় না। আত্মার যাতে কল্যাণ হয় তাছাড়া অন্য কিছুতে মন দেয় যে, পুরো অজ্ঞানী তো সেই-ই। এক রাশি বচনে আত্মার অভাববোধ ঘোচে না।
‘ঈশানুস্মরণ’ টমাস আ কেম্পিস অনুবাদ শ্রীনারায়ণী দেবী থেকে