Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অমৃতকথা

বেদের প্রামাণ্যে যাহার দৃঢ় বিশ্বাস আছে, তাহার স্বধর্মনিষ্ঠা ও নিষ্কামকর্মে প্রবৃত্তি আসে। স্বধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির চিত্তশুদ্ধি হয়। বুদ্ধি শুদ্ধ হইলে আত্মজ্ঞান হয়।

অমৃতকথা
  • ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বেদের প্রামাণ্যে যাহার দৃঢ় বিশ্বাস আছে, তাহার স্বধর্মনিষ্ঠা ও নিষ্কামকর্মে প্রবৃত্তি আসে। স্বধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির চিত্তশুদ্ধি হয়। বুদ্ধি শুদ্ধ হইলে আত্মজ্ঞান হয়। আত্মজ্ঞান লাভ হইলে মূল-অজ্ঞানের সহিত সংসারের চিরতরে নিবৃত্তি ঘটে। জল হইতে উৎপন্ন শেওলা প্রভৃতির দ্বারা আবৃত হইয়া পুষ্করিণীস্থিত জল যেমন দৃষ্টিগোচর হয় না, সেই প্রকারে আত্মার অবিদ্যাশক্তি হইতে উৎপন্ন অন্নময়াদি পঞ্চকোশের দ্বারা আবৃত হইয়া আত্মা প্রকাশ পায় না। জলের উপরে ভাসমান শৈবালাদি দূর করিয়া ফেলিলে তৃষ্ণানাশক, পানমাত্র আনন্দদায়ক, স্বাভাবিক শুদ্ধ নির্মল জল স্পষ্টরূপে পুরুষের নিকট প্রকাশ পায়।

Advertisement

যখন বিবেক-বিচারের দ্বারা পাঁচটি কোশের কোনটিই আত্মা নয়, এই প্রকার দৃঢ় নিশ্চয় জন্মে, তখন শুদ্ধ, সদানন্দময়, প্রত্যেকের অন্তরে সাক্ষিরূপে স্থিত, শ্রেষ্ঠ, প্রকাশস্বভাব আত্মা স্বতই প্রকাশ পান। বিচারশীল ব্যক্তি সংসার বন্ধন হইতে মুক্তিলাভের জন্য আত্মা কি, অনাত্মা কি, এই বিচার করিবেন। এই বিচারের দ্বারা নিজেকে (অনাত্মা সকল দৃশ্য পদার্থ হইতে পৃথক্‌) সচ্চিদানন্দময় ব্রহ্মরূপে জানিয়া পরমানন্দ লাভ করেন। মুঞ্জাতৃণ হইতে তাহার ভিতরের ডাঁটা বাহির করিবার জন্য তাহার উপরের আবরণগুলি যেভাবে ফেলিয়া দিতে হয়, সেই ভাবে দৃশ্য দেহাদি অনাত্মবস্তুসমূহ হইতে বিচারের দ্বারা দ্রষ্টা, নির্লিপ্ত, নিষ্ক্রিয় আত্মাকে পৃথক্‌ জানিয়া এবং সেই শুদ্ধ আত্মায় সকল অনাত্মবস্তুকে বিলীন করিয়া দিয়া (আত্মা ব্যতীত আর ঩কিছু নাই, এই প্রত্যয়কে আশ্রয় করিয়া) যে ব্যক্তি দৃশ্যবর্গের সাক্ষিরূপে ব্রহ্মের সহিত অভেদ ভাবে অবস্থান করেন তিনি মুক্ত। মাতাপিতার ভুক্ত অন্নাদির পরিণাম হইতে উৎপন্ন এই দেহ অন্নময় কোশ বলিয়া অভিহিত হয়। ইহা অন্নের দ্বারা জীবিত থাকে, অন্ন না পাইলে মরিয়া যায়। ত্বক্‌-চর্ম-মাংস-রক্ত-অস্থি- বিষ্ঠার সমষ্টি এই অন্নময় কোশ কখনও নিত্যশুদ্ধ আত্মা হইতে পারে না। এই দেহ জন্মের পূর্বে বা মৃত্যুর পরেও বর্তমান থাকে না। ইহা জন্মমৃত্যুর মধ্যকালে অল্প সময়ের জন্য আবির্ভূত হয় এবং অল্পকালের জন্যই রমণীয়ভাবে প্রকাশ পায়। ইহা যতদিন বর্তমান থাকে ততদিন একরূপও থাকে না (অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদির হ্রাস-বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পরিণতি লাভ করে); ইহা ঘটাদির ন্যায় দৃশ্য পদার্থ (ঘটা যেমন মৃত্তিকার পরিণামমাত্র এবং ক্ষণস্থায়ী, দেহও সেইরূপ ভূতসমূহের পরিণাম) এবং জড় (চৈতন্যরহিত)। এই প্রকারের দেহ কীরূপে দেহমনের সকলপরিণামের  জ্ঞাতা স্বীয় আত্মা হইতে পারে? (অর্থাৎ জড়দেহ কখনই চৈতন্যস্বরূপ আত্মা নয়; আত্মা দেহ হইতে সর্বতোভাবে ভিন্ন)।

স্বামী বেদান্তানন্দ অনুদিত শঙ্করাচার্যের ‘বিবেকচূড়ামণি’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ