ফরাসি রিভিয়েরার ঝলক পুদুচেরিতে
ফরাসি রিভিয়েরার ঝলক পুদুচেরিতে
কীভাবে যাবেন: যদিও পুদুচেরির নিজস্ব বিমানবন্দর আছে। কিন্তু আপাতত সীমিত উড়ান চলাচল করে সেখানে। হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরু থেকে পুদুচেরি পৌঁছনো যায়। কলকাতা থেকে চেন্নাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে যাতায়াত করাই সুবিধাজনক। ট্রেনপথে পুদুচেরির সঙ্গে যুক্ত ভিল্লুপুরম, চেন্নাই, তিরুপতি ইত্যাদি।
ইচ্ছা ছিল ফরাসি ভূমধ্যসাগর উপকূল বেড়াতে যাওয়ার? ‘কুত দ্য আজুরে’র মতো নীল সমুদ্র ধরে নিরিবিলি পরিবেশে দিন কাটাবেন ভেবেছিলেন? আর তারই মধ্যে জারি হল নিষেধাজ্ঞা! তাহলে চলুন তামিলনাড়ু ঘেঁষা কেন্দ্রশাসিত পুদুচেরি, যার পুরনো নাম পণ্ডিচেরি। ১৯৫৪ সালে ফ্রান্স থেকে ভারতের হাতে চলে এলেও, আজও এখানে সযত্নে রক্ষিত হচ্ছে ফরাসি জীবনযাত্রা। শহরের পুরনো এলাকা যা ‘ফ্রেঞ্চ টাউন’ (হোয়াইট টাউন) হিসেবে বিখ্যাত, যেন সত্যিই ভারতের বুকে এক টুকরো বিদেশ।
প্রথমেই নজর কাড়বে প্যাস্টেল রঙা বাড়িগুলি— কোনোটা হলুদ, কোনোটা নীল, কোনোটা গোলাপি। বেশিরভাগ বাড়িই দোতলা। বারান্দা থেকে উপচে পড়ছে বোগেনভেলিয়া গাছ। এখনও দেখবেন খড়খড়ি দেওয়া জানালা, পোশাকি ভাষায় যার নাম ফ্রেঞ্চ উইন্ডো ও লোহার কারুকাজ করা রেলিং। মজার ব্যাপার, শতাব্দী প্রাচীন ও নতুন তৈরি বাড়ির মধ্যে তফাত করা প্রায় অসম্ভব। রাস্তাঘাটে ফরাসি নাম বজায় আছে।
হেঁটে বা সাইফেলে চেপে ঘুরে নিন ফ্রেঞ্চ টাউন। গ্রিড প্যাটার্নের রাস্তা, বেশ পরিচ্ছন্ন। গথিকশৈলীতে তৈরি ‘দ্য ব্যাসিলিকা অব দ্য সেক্রেড হার্ট অব জিসাস’, ফরাসি কনসুলেট, গভর্নর হাউস ইত্যাদি দেখার পাশাপাশি ফরাসি খাবারের স্বাদ নিতেও ভুলবেন না। ইদানীং বেশ কিছু শৌখিন বুটিক বা স্টুডিও হয়েছে যেখান থেকে জামাকাপড় ও হস্তশিল্পের নানা জিনিস কিনতে পারেন। সারাদিন ঘোরাঘুরি সেরে বিকেল-সন্ধেটা কাটান পুরানো শহর সংলগ্ন ‘প্রমেনাড বিচ’-এ। এই বিচটিকে অনেকেই দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের কুত দ্য আজুরের সঙ্গে তুলনা করেন। সন্ধেবেলা এখানে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। তাই পায়ে হেঁটেই নিশ্চিন্তে বিচ রোড উপভোগ করতে পারেন। অবশ্যই দেখে নেবেন ঋষি অরবিন্দর স্মৃতি ঘেরা অরোভিল মাতৃমন্দির।
মিনি সুইৎজারল্যান্ড চোপতা
কীভাবে যাবেন: নিকটতম বিমানবন্দর জলিগ্রান্ট (দেরাদুন) থেকে চোপতা সড়কপথে প্রায় ২২০ কিমি। নিকটতম ট্রেন স্টেশন হৃষিকেশের দূরত্ব সড়কপথে মোটামুটি ২০০ কিমি। চোপতা যাওয়ার সরাসরি বাস প্রায় নেই। তবে রুদ্রপ্রয়াগ বা গুপ্তকাশী পৌঁছে সেখান থেকে শেয়ার জিপ বা ট্যাক্সি পাওয়া যেতে পারে।
উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল হিমালয়ের কোলে চোপতা গ্রাম। চারপাশে উপত্যকা জুড়ে ঢেউ খেলানো বুগিয়াল (তৃণভূমি, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘মেডোজ’)। গ্রামটিকে ঘিরে রেখেছে হিমালয়ের নানা বিখ্যাত শৃঙ্গ। তারই মধ্যে নন্দাদেবী, ত্রিশূল, চৌখাম্বা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এতেই শেষ নয়। আরও অনেক শৃঙ্গই রয়েছে বরফে ঢাকা। এমন সব পাহাড় আর সবুজ গালচে টানা উপত্যকাটিকে দেখে অনায়াসেই তুলনা টানা যায় সুইস আল্পস-এর কোনো পাহাড়ি গ্রামের সঙ্গে।
গ্রীষ্মকালে সুইৎজারল্যান্ডের পাহাড়ি গ্রামের মতোই চোপতার বুগিয়াল মখমলি সবুজ ঘাসে ঢাকা পড়ে থাকে। মেষপালকেরা হাজির হয় ভেড়ার দল নিয়ে। দেখা মেলে নানা অ্যালপাইন ফুলের। আবার শীতকালে কনকনে ঠান্ডায় বরফের চাদরে ঢেকে যায় সবুজ বুগিয়াল। পাহাড় শ্রেণির ওপর তখন বরফের মোটা আস্তরণ। তারই ফাঁক থেকে হয়তো বা পাহাড়ের খানিক অংশ উঁকি মেরে বেরিয়ে আসে। পাথুরে চকোলেট রং দুধ সাদা বরফের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। দেখে মনে হয় সুইস কোনো পিকচার পোস্ট কার্ড বুঝি! যে কোনো মরশুমেই তাই চোপতা যেন ‘মিনি সুইজারলান্ড।’
গাড়োয়ালের এই গ্রামে গেলে এমন হোটেলে থাকবেন যেখান থেকে নিস্বর্গ স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়। হোটেলের ঘরের বড় কাচের জানলা দিয়ে শুয়ে বসেই হিমালয়ের শোভা উপভোগ করতে পারবেন। অল্প হাঁটাহটি করে অনয়াসে দিন দু-তিন কাটিয়ে দিতে পারেন। কেদারনাথ অভয়ারণ্যের একাংশ রয়েছে এই চোপতায়। বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট ওয়াকিং ট্রেইল ধরেও ঘুরতে পারেন। পাইন আর সেডার গাছে ভরা পাহাড়ি অরণ্যর মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে পারেন। এইসব ওয়াকিং ট্রেইল বা পায়ে হাঁটা পাহাড়ি পথে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই কোনো ফাঁক থেকে বেরিয়ে পড়বে শ্বেতশুভ্র হিমালয়। নীল আকাশ, বরফে ঢাকা পাহাড় আর পাইনের সোঁদা গন্ধ কিন্তু কোনো ভৌগোলিক বিভেদ মানে না। বনবিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে ক্যাম্পিংও করা যায় এই বুগিয়ালে। এখানে নানা ধরনের পাখিরও দেখা মেলে। অ্যাডভেঞ্চার করার ইচ্ছে হলে চড়াই বেয়ে তুঙ্গনাথ মন্দির দেখে আসতে পারেন। চোপতা থেকে প্রায় কিলোমিটার পাঁচেক দূরে পঞ্চকেদারের অন্যতম তুঙ্গনাথ। কথিত রয়েছে, এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ শিবমন্দির। নিয়মিত পাহাড়ে ট্রেকিং করার অভিজ্ঞতা থাকলে আরও কিলোমিটার দুয়েক কষ্টকর চড়াই ভেঙে পৌঁছতে পারেন চন্দ্রশিলা টপ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে, বরফে মোড়া শিখরগুলি দারুণ দেখায়। তবে শীতকালে তুঙ্গনাথ মন্দির বন্ধ থাকে। ট্রেক রুটের খোলা-বন্ধ নির্ভর করে বরফ পড়ার উপর। যদিও ‘স্কি’ করার কোনো আয়োজন এখনও গড়ে ওঠেনি এই প্রত্যন্ত গ্রামে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বরফে ঢাকা বুগিয়াল স্কিয়িং-এর জন্য উপযুক্ত। আর যদি একান্ত স্কিয়িং করতে চান, তাহলে চোপতা থেকে বদ্রিনাথ ছুঁয়ে পৌঁছে যেতে পারেন আউলি। সেখানে শীতে বরফ ঢাকা বিস্তীর্ণ বুগিয়ালের উপর স্কি করার সুযোগ পাবেন অবাধে। ভারী মনোরম সেই আনন্দ। লাল, হলুদ, সবুজ, নীল সহ আরও কত শত রঙের জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে স্কিয়ারদের মেলা বসে আউলির বরফাবৃত বুগিয়ালে।
উত্তরা গঙ্গোপাধ্যায়