Bartaman Logo
১৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মুসৌরির অদূরে পাহাড়ি শহর

মুসৌরির কাছে ল্যান্ডোর শহরটি শান্ত ও সুন্দর। এখানে রাস্কিন বন্ডের বাড়ি ও অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য। বিস্তারিত পড়ুন।

মুসৌরির অদূরে পাহাড়ি শহর
  • ১৩ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কীভাবে যাবেন: 
ল্যান্ডোর যেতে হলে ট্রেন বা বিমানে দেরাদুন পৌঁছতে হবে। সেখান থেকে বাসে করে মুসৌরি আসতে পারেন। অথবা দেরাদুন থেকে গাড়িতেও মুসৌরি আসা যায়। এই শৈলশহরের খুবই কাছে অবস্থিত পাহাড়ি গ্রাম ল্যান্ডোর। ফলে মুসৌরি থেকে ভাড়ার গাড়িতে অথবা স্কুটিতে করে ঘুরে নেওয়া যায়। হাতে সময় থাকলে হেঁটেও এখানে পৌঁছতে পারেন। ছোট্ট এই পাহাড়ি শহরটি ঘুরে দেখার জন্য একবেলা হাতে সময় রাখাই যথেষ্ট।

Advertisement


আগে কয়েকবার মুসৌরি এসেছি। পাহাড়ের রানি মুসৌরি হাজারো বিনোদনের পসরা সাজিয়ে বসে আছে পর্যটকদের জন্য। আর তার ঠিক পাশেই শান্ত, নিরিবিলি পাহাড়ি শহর ল্যান্ডোর। একসময় এটি ছিল ব্রিটিশ ক্যান্টনমেন্ট। এখনও ছোট্ট এই শহরের বেশিরভাগ অংশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। মুসৌরির এত কাছে তবু আমার এই শহরটা আগে দেখা হয়ে ওঠেনি। 
 এবারের সফর তালিকায় ল্যান্ডোর রাখা হবে ঠিক করলাম। যাওয়ার জন্য মুসৌরির মল রোডের পিকচার প্যালেসের কাছ থেকে গাড়িতে উঠলাম। মুসৌরির বিখ্যাত ক্লক টাওয়ারের পাশ দিয়ে ল্যান্ডোর যাওয়ার রাস্তা। খুব সংকীর্ণ পথ। জ্যাম লেগেই থাকে। তবে সকাল সকাল বেরনোর ফলে আমরা তেমন জ্যাম পেলাম না।
ক্লক টাওয়ার পেরিয়ে প্রথমে চোখে পড়ল ডমস ইন। এটিকে ল্যান্ডোরের ল্যান্ডমার্ক রেস্তরাঁ বলা যায়। এখানে থাকারও ব্যবস্থা আছে। এখানকার খাবারের স্বাদ নাকি দুর্দান্ত। তবে শুধুই যে খাবারের জন্য এই রেস্তরাঁর নামডাক তা নয়, এর পরিচিতির আর একটা কারণ, রেস্তরাঁটির পাশেই বিখ্যাত লেখক রাস্কিন বন্ডের বাড়ি। 
প্রায়  দু’শো বছর আগে শহরটি তৈরি হয়। ল্যান্ডোর নামের পিছনে ছোট্ট একটা ইতিহাস আছে। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড আর ওয়েলস, এই নিয়ে ইউনাইটেড কিংডম। সেই ওয়েলস দেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের এক গ্রাম ‘ল্যান্ড ডোর’। আর সেই গ্রামের নাম থেকেই এসেছে ‘ল্যান্ডোর’। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর এখানে ইউরোপিয় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ১৯২৪ সালের সেনানিবাস আইন অনুসারে এখানে কোনো ধরনের নতুন নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়। সেই নিয়ম আজও বলবৎ। জায়গাটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বোর্ড দ্বারা পরিচালিত। 
আমরা যদিও গাড়িতেই গিয়েছিলাম, তবে সময় থাকলে মুসৌরি থেকে ল্যান্ডোর হেঁটেও ঘুরে নেওয়া যায়। অনেকে স্কুটি ভাড়া নিয়ে মুসৌরি থেকে আসেন। দূরত্ব দুই কিলোমিটার মাত্র। ল্যান্ডোর শহরের মূল রাস্তাটি গোলচক্কর নামে খ্যাত। শহরের সব ল্যান্ডমার্ক এই রাস্তার উপরে অবস্থিত। তবে রাস্তার দৈর্ঘ্য সাকুল্যে সাড়ে তিন থেকে চার কিলোমিটার। 
আমাদের গাড়ি এসে থামল ল্যান্ডোরের বিখ্যাত ‘চারদুকান’-এর কাছে। আদতে এগুলো চারটি খাবারের দোকান। ল্যান্ডোর ঘুরতে গেলে চারদুকানে খাওয়া মাস্ট। এইসব দোকানের বিখ্যাত খাবার বা ‘মাস্ট ইট’ হল জিঞ্জার লেমন টি, প্যানকেক, মোমো ইত্যাদি। 
কাছেই ১৮৪০ সালের তৈরি সেন্ট পলস চার্চ। আমরা বাঁদিক ধরে এগতে লাগলাম। এই রাস্তার সৌন্দর্য অতুলনীয়। দেবদারু, ওক, পাইন, ফার, ম্যাপেল, রডোডেনড্রনের বন চারদিকে। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম লালটিব্বা ভিউ পয়েন্ট। এটাই এই অঞ্চলের উচ্চতম স্থান। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে গাড়োয়াল হিমালয়ের অসাধারণ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। 
পুরো ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘেরা বরফশৃঙ্গ। সমুখে দিগন্ত বিস্তৃত প্রকৃতি। শৃঙ্গগুলির মধ্যে শ্রীকান্ত, স্বর্গারোহিণী, বান্দরপুচ্ছ,  যমুনোত্রী, সতোপন্থ, চৌখাম্বা, নন্দাদেবী দেখা যায়। দু’ধারে জঙ্গল, মাঝখান দিয়ে পথ। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়বে গথিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত কেলগ মেমোরিয়াল চার্চ। আমেরিকান মিশনারি ডঃ স্যামুয়েল কেলগের নামাঙ্কিত। পাশেই ল্যান্ডোরের বিখ্যাত ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুল। যেখানে এখনও বিদেশিরা বিভিন্ন ভারতীয় ভাষা শিখতে আসেন। এখান থেকে পায়ে পায়ে এগিয়ে বিখ্যাত ল্যান্ডোর বেক হাউস। এখানকার বহু সামগ্রী পুরনো ইংলিশ রেসিপির ফসল। বিভিন্ন ধরনের কেক, মাফিন, চকোলেট ক্রেপ, ওয়ালনাট পাই, রোস্টেড চিকেন মেলে। সবেরই স্বাদ অনবদ্য। কাছাকাছি আছে সিস্টার্স বাজার। 
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বেশিরভাগ সিস্টার বা নার্স ছিলেন মেথডিস্ট বা ক্যাথলিক নান। মনে করা হয় এখানেই তাঁদের বাসস্থান ছিল। বর্তমানে সিস্টার্স বাজার আসলে তিন চারটি দোকানের সমষ্টি। অনিল প্রকাশ স্টোর্স অন্যতম। এখানকার হোমমেড জ্যাম, চিজ, মধুর যথেষ্ট চাহিদা। আমরা জ্যাম কিনলাম। 
ভারতের শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক মানচিত্রেও এই জায়গার অবস্থান যথেষ্ট। এখানকার উডস্টক স্কুলের ভালোই নামডাক। বিখ্যাত লেখক রাস্কিন বন্ড যে এই শহরে থাকেন তা তো অনেকেরই জানা। এছাড়াও  নাট্যকার ও অভিনেতা টম অলটার এবং অভিনেতা ভিক্টর ব্যানার্জির সঙ্গে ল্যান্ডোরের নিবিড় সম্পর্ক।  নির্জন কোলাহলমুক্ত স্থানে হিমালয়ের সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করার পাশাপাশি ঊনবিংশ শতকের ব্রিটিশ সাহেবিয়ানার রূপ দেখতে চাইলেও আপনাকে আসতে হবে এখানে।  
সময় যেন থমকে আছে এখানে। মনে পড়ে রাস্কিন বন্ডের সেই বিখ্যাত উক্তি, পৃথিবী যতই বদলে যাক, কিছু জিনিস এমনও থাকে যার পরিবর্তন হয় না। সেই অপরিবর্তিত সৌন্দর্য এবার আপনার উপভোগ করার পালা।
বিশ্বরূপ মৈত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ