মাতৃশক্তির আরাধনার সময় আসন্ন। যেসব মহিলা উদ্যোগপতি কাজের মাধ্যমে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন তাঁদের শক্তিকে কুর্নিশ করার সময়। আজ সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস-এর অন্যতম ডিরেক্টর জয়িতা সেন।
মাতৃশক্তির আরাধনার সময় আসন্ন। যেসব মহিলা উদ্যোগপতি কাজের মাধ্যমে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন তাঁদের শক্তিকে কুর্নিশ করার সময়। আজ সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস-এর অন্যতম ডিরেক্টর জয়িতা সেন।
সোনার মেয়ের হাতে তৈরি সোনার নকশা। ২০০৯ সাল থেকে এটাই জয়িতা সেনের অন্যতম পরিচয়। অলংকারের দুনিয়ায় জয়িতা পরিচিত নাম। তাঁর হাত ধরেই সেজে ওঠে সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডসের গয়না। গয়নাই তো সাজিয়ে তোলে ভারতীয় কন্যেকে, তাহলে আবার গয়নার সাজ? বিষয়টা তাহলে খুলেই বলি।
সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডসের গয়নাগুলি যে নকশায় গড়ে ওঠে, তারই নেপথ্য হাতযশ জয়িতার। জয়িতা সেন এই সংস্থার অন্যতম ডিরেক্টর এবং মার্কেটিং ও ডিজাইনিং বিভাগের প্রধান। গয়নার নকশায় পরীক্ষা নিরীক্ষা ও ক্রেতার রুচি বুঝে গয়না তৈরি, এই দুই ফ্যাক্টরকেই মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হয় তাঁকে। পাশাপাশি গোটা সংস্থা চালনা করা, কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদির গুরুদায়িত্বও রয়েছে। জয়িতার কাজ সহজ ছিল না মোটেই। অথচ সেই কাজই প্রায় ১৭ বছর ধরে করে আসছেন তিনি।
ছোটো থেকেই ব্যবসায়িক পরিবারে বড়ো হয়েছেন জয়িতা। বাবা হার্বাল পণ্য ও রিয়েল এস্টেটের দক্ষ ব্যবসায়ী। বাবাকে ব্যবসায় সাহায্য করার পাশাপাশি বিজ্ঞাপন সংস্থা খুলতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিয়ের পর নিয়তি হয়তো তাঁর জন্য সাজিয়ে রেখেছিল অন্য প্ল্যাটফর্ম। পুরানো দিনের স্মৃতিচারণ বললেন, ‘যখন সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডসের পরিবারে বিয়ে হল, তখন দেখলাম, আমার শ্বশুরমশাইয়ের পর ব্যবসা সামলানোর জন্য আমার স্বামী ছাড়া আর কেউ সেভাবে নেই। তাই স্বামীকে পারিবারিক ব্যবসায় সাহায্য করতে সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডসের সঙ্গে যুক্ত হই। তখন ২০০৯। শ্বশুরমশাই আমাকে এই কাজে খুবই উৎসাহ দিয়েছেন। কাজও শিখিয়েছেন। বহু প্রযুক্তিগত জিনিস, হীরে, সোনার নানা কারিগরি কাজ শিখলাম। ২০০৯-এ প্রযুক্তি এত উন্নত হয়নি। তখন নতুন কোনো নকশা বানাতে অনেক বেগ পেতে হত। গয়নার নকশা আঁকায় সৃজনশীলতা কাজে লাগালাম।’
একটা সময় জয়িতার কাছে গয়না ছিল পরার ও দেখতে সুন্দর লাগার জিনিস, কখনো ভাবেননি এই গয়না প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িয়ে যাবেন একদিন। কথায় কথায় বললেন, ‘বিয়ের পর পর দেখতাম কষ্টিপাথরে ঘষে সোনা কতটা খাঁটি দেখা হচ্ছে। গোল্ড টেস্টিং মেশিন তখনও আসেনি। কষ্টিপাথরে সোনা যাচাইয়ের কাজও শিখেছি। তখন আমার ২২-২৩ বছর বয়স। এসব করতে করতেই কাজটা ভালোবেসে ফেললাম। আমাদের কারিগররাও বংশপরম্পরায় এখানে কাজ করেন। ফলে এ এক জেনারেশন অব আর্ট।’
প্রথম থেকেই নবীন প্রজন্মকে মাথায় রেখে গয়না বানাতে চেয়েছিলেন জয়িতা। সোনার পাশাপাশি রুপো ও ফ্যাশন জুয়েলারির নানা ধরনের নকশা তৈরি করতে চাইতেন। স্বামীর উৎসাহ তো ছিলই, পাশে ছিলেন শ্বশুর-শাশুড়ি দু’জনেই। সকলের সমর্থন নিয়ে শুরু করছিলেন ছকভাঙা এই কাজ। যার উপর ভিত্তি করে তৈরি সেনকো গোল্ডের ‘গসিপ’।
এই কালেকশন জনপ্রিয় হওয়ার পর হালকা ওজনের সোনার গয়নার দিকে ঝুঁকলেন জয়িতা। সোনা মানে শুধু উৎসব অনুষ্ঠানের সঙ্গী নয়, সোনা পরে অফিসও করা যায়! এই ভাবনাকে পাথেয় করে নিত্য পরার মতো হালকা ওজনের কিছু গয়নার নকশাও তৈরি করলেন। সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডসের ‘লাইট জুয়েলারি’ বিভাগেও এল জনপ্রিয়তার ঢল। ব্যবসা বড়ো হচ্ছে। ডিজাইনিংয়ের টিম হল। কাজ শেখাতে শুরু করলেন জয়িতা। ২০২০ সালে শ্বশুরমশাইয়ের মৃত্যুর পর সংস্থার মার্কেটিংয়ের কাজও সামলাচ্ছেন। স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন তিনি, ‘একটা সময় বাবা রাইমা সেন, বিদ্যা বালান এঁদের সংস্থার মুখ করছেন। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরের গুরুত্ব বোঝা শুরু করলাম। এখন এসব সিদ্ধান্ত আমিই নিই।’
নিজে মেয়ে। তাই মেয়েদের জন্য কিছু করতে চেয়েছেন বরাবর। প্রতি বছর সমাজের নানা স্তরের সফল মহিলাদের স্বীকৃতি জানানোর অনুষ্ঠান ‘অপরাজিতা’-র আয়োজন করেন জয়িতারা। যা সংস্থার মুকুটে যোগ করেছে উজ্জ্বল পালক।
মহিলা উদ্যোগপতি হওয়া তো চাড্ডিখানি কথা নয়! তাঁদের উদ্দেশে জয়িতার পরামর্শ, নিজের পণ্যের জন্য বাজার বুঝতে হবে। সততা, পরিশ্রম ও সৃজনশীনতার কোনো শর্ট কাট হয় না যে!
মনীষা মুখোপাধ্যায়