ছত্তিশগড়ের এই গুহা দু’টি ইতিহাস খ্যাত। এই গুহার সঙ্গে মহারাষ্ট্রের অজন্তা পাহাড়ের সাদৃশ্য রয়েছে। পুরাণ ও প্রকৃতি এখানে মিলেমিশে একাকার।
ছত্তিশগড়ের এই গুহা দু’টি ইতিহাস খ্যাত। এই গুহার সঙ্গে মহারাষ্ট্রের অজন্তা পাহাড়ের সাদৃশ্য রয়েছে। পুরাণ ও প্রকৃতি এখানে মিলেমিশে একাকার।
মেইনপাট ঘুরতে গিয়েছিলাম। যা ছত্তিশগড়ের সিমলা নামে পরিচিত। ওখানকার স্থানীয় সাইট সিয়িং ছাড়াও লিস্টে ছিল, ইতিহাস খ্যাত বেশ কয়েকটি গুহা। সেইমতো একদিন গাড়ি নিয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম। মেইনপাট থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে এই পর্যটনস্থল। ঠিকঠাক লোকেশন বললে, ছত্তিশগড়ের সুরগুজা জেলায় পুটা গ্রামের রামগড় পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এইসব গুহা। আমরা অম্বিকাপুর হয়ে বিলাসপুরের দিকে ছুটে চলেছি। যা আসলে ১৩০ নম্বর জাতীয় সড়ক। উদয়পুরের পর জাতীয় সড়ক ছেড়ে এবার ঘাট রোডে। আর মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পথ পড়ে। লম্বা দৌড় শেষে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। গাছপালা ঘেরা ছায়াসুনিবিড় পরিবেশে আমাদের গাড়ি পার্কিং করা হল। কাছেই চড়াই সিঁড়ির সারি পেরিয়ে পৌঁছলাম এক অর্ধচন্দ্রাকৃতি পাহাড়ের সামনে। মহারাষ্ট্রের অজন্তা পাহাড়ের সঙ্গে অনেকটা মিল পাই। যার মধ্যে আছে যোগীমারা ও সীতাবেঙ্গরা গুহা।
ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ প্রবেশ সম্মুখে এক বোর্ডফলক ও একটি প্রস্তর ফলক স্থাপন করেছে। ১৮৭৪- ৭৫ সালের মধ্যে এই গুহা দু’টির খোঁজ মেলে। পুরো চত্বরটাই কঠিন পাথরে পরিব্যপ্ত। এখানে পাশাপাশি দু’টি গুহা রয়েছে। বামদিকেরটি সীতাবেঙ্গরা ও ডানদিকেরটি যোগীমারা নামে পরিচিত। এগুলো সবই প্রাকৃতিক গুহা। সীতাবেঙ্গরা গুহা আকারে ও আয়তনে যোগীমারা গুহার থেকে বেশ খানিকটা বড়। লোককথা অনুযায়ী বনবাসকালে রাম-লক্ষ্মণ ও সীতা বেশ কিছুদিন এখানে কাটিয়ে ছিলেন। সীতাদেবী যে গুহায় থাকতেন, আজ সেটাই সীতাবেঙ্গরা নামে সুবিদিত। ওড়িশার কেওনঝড়ের কাছে সীতা বিনজি গুহায় ক’বছর আগে গিয়েছিলাম। সেখানে সীতার ধনাগার, লব কুশের জন্মস্থান ও তাদের পাঠশালা পর্যন্ত দেখে এসেছি। মোটকথা, সারা ভারত জুড়েই রামায়ণের প্রেক্ষাপট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সীতাবেঙ্গরা ও যোগীমারা উভয় গুহা থেকেই লিপির সন্ধান মেলে। সীতাবেঙ্গরা গুহায় কাটা দেওয়ালের উপরের দিকে ব্রাহ্মী লিপিতে দু’টি লাইনের একটি শিলালিপি রয়েছে। আর যোগীমারা গুহায় পাঁচ লাইনের একটি শিলালিপির সন্ধান মেলে। যা ব্রাহ্মী লিপিতে উৎকীর্ণ। তাছাড়া যোগীমারা গুহায় আটটি ম্যুরাল চিত্রের প্যানেল লক্ষ করা যায়। যার বেশিরভাগটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখানে মূলত তিনটি প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হয়েছিল। এখানকার চিত্রকলার রচনাশৈলী সমসাময়িক ভারহুত এবং সাঁচী ভাস্কর্যের মতো। এই কারণে এই চিত্রকর্মগুলির সম্ভাব্য সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। অতি উৎসাহী পর্যটকদের হাত থেকে লিপি বাঁচাতে যোগীমারা গুহার সম্মুখ এখন গ্রিল দিয়ে ঘেরা হয়েছে। চারপাশেও সুরক্ষিত রাখতে লোহার বেড়া পড়েছে। গুহা সম্মুখের পাহাড় ঢালে গভীর জঙ্গল। গাছে গাছে ওত পেতে বসে রয়েছে বাঁদরের দল। আগত পর্যটকদের কাছ থেকে কিছু খাবারের প্রত্যাশায়।
এই দু’টি গুহা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে এষণার শেষ নেই। তবে কেউই এই বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। সবটাই অনুমানসাপেক্ষ। সেই যুক্তিতে অনেক ইতিহাসবিদ সীতাবেঙ্গরাকে পৃথিবীর প্রথম নাট্যশালা বলে মত ব্যক্ত করেছেন। আর নীচের ধাপ কাটা পাথরের বেদি গ্যালারির ইঙ্গিত বহন করে। অর্থাৎ এখানে দর্শকরা শ্রেণিবদ্ধভাবে বসতেন। কেউ কেউ বলেন, এটা কেবলই বিশ্রামস্থল। পথচলতি পথিকরা এখানে বিশ্রাম নিতেন। আবার কবি কালীদাস ‘মেঘদূতম’ কাব্যগ্রন্থ এই গুহা চত্বরে বসেই লিখেছিলেন বলে কোনও কোনও ইতিহাসবিদের মত। যোগীমারা গুহার শিলালিপির ব্যাখ্যাও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি করে। কারও বক্তব্যে উঠে আসে যে সুতনুকা নামে এক দেবদাসী এই গুহা চত্বরে নৃত্য পরিবেশন করতেন। কিন্তু মন্দিরকে কেন্দ্র করেই সাধারণত দেবদাসী প্রথা আবর্তিত। সে হিসেবে এই তল্লাটের মধ্যে সমকালীন কোনও মন্দিরের অস্তিত্ব আদৌ মেলে না। তাই এই যুক্তি অকাট্য নয়। শিলালিপি থেকে নারী পুরুষের প্রেমকাহিনির কথাও ঘুরেফিরে আসে। তবে ভারতের অন্যান্য প্রাচীন গুহাশ্রেণি থেকে এই দু’টি গুহা একদিক থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে। কারণ অন্যান্য গুহার মতো এই দু’টিতে কোনও ধর্মীয় প্রতীক চিহ্নের প্রমাণ মেলেনি।
আগাছা ভরা ঢালু পথ ধরে এবার চলে এলাম হাতিপোল গুহা দেখতে। যোগীমারা গুহার অনেকটা নীচে একই পাহাড়ের তলদেশে এই গুহা। গুহা না বলে এটাকে পাহাড়ি সুড়ঙ্গ বলা যায়। সুড়ঙ্গের সামনের গাছগাছালি ভরা ভূমিরূপ অনবদ্য। সুড়ঙ্গের ভিতরে খুব বেশি যাওয়া গেল না। কারণ মাথার উপরে রয়েছে এক বিরাট মৌচাক। কেউ বা কারা তাদের ব্যতিব্যস্ত করেছে। ফলে তারা শুরু করেছে সাঁড়াশি আক্রমণ। ফলে আমরা পিঠটান দিলাম। এক দৌড়ে উঠে এলাম উপরে। সীতাবেঙ্গরা
পাহাড়ের উল্টো দিকের পাহাড়ের কোলে রয়েছে লক্ষ্মণ গুহা। তবে তা দেখতে সুড়ঙ্গ পথই ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি রয়েছে আরও দু’টি গুহা। তবে সেখানে কোনও লিপি পাওয়া যায়নি। তাই তা দেখার উৎসাহ তেমন ছিল না। শুনলাম রামনবমীতে এখানে বিরাট অনুষ্ঠান হয়।
এখান থেকে উল্টো দিকের চার কিলোমিটার পাকদণ্ডী পথ পেরলেই মেলে রামগড়। আর রামগড় পাহাড়ের সর্বোচ্চ শীর্ষে রয়েছে রামজানকী মন্দির। তবে তা দেখতে হলে ৬২৬টি পাথুরে সিঁড়ি চড়তে হবে। এই নির্জন ঘন জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি পথে ট্রেক করার অভিজ্ঞতা দারুণ। উপর থেকে নীচের ল্যান্ডস্কেপ চোখে লেগে থাকে। তবে রামজানকী মন্দির আদতে ছোটখাট এবং একেবারেই সাদামাটা। কাছেই রয়েছে সীতাকুণ্ড। এখান থেকে দুর্গম কাঁটা-ঝোপ ঘেরা জংলি পথে বেশ কিছুটা ট্রেক করলেই মেলে তিন তিনটি গুহা। সিদ্ধ গুহা, দুর্গা গুহা আর দুর্গা গুহার নীচে চন্দন মাটি গুহা। পাখির চোখে নীচের উপত্যকার প্যানোরামিক ভিউ দেখে মোহিত হয়ে যাবেন। তখন নীচে নামার ইচ্ছেই যাবে মরে।
প্রয়োজনীয় তথ্য: কলকাতা থেকে ট্রেনে প্রথমে ঝাড়সুগুদা। এখান থেকে ২২৫ কিলোমিটার দূরে মেইনপাট। মেইনপাট থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে যোগীমারা। আকাশপথে গেলে নামতে হবে রায়পুর। সেখান থেকে ৩০১ কিলোমিটার দূরে যোগীমারা। যোগীমারা গুহার কাছেই রয়েছে ছত্তিসগড় ট্যুরিজমের এক অসাধারণ রিসর্ট। থাকতে পারেন অম্বিকাপুরেও। তবে মেইনপাট থেকে দিনে দিনেই ঘুরে আসা যায়। মেইনপাটে রয়েছে একাধিক হোটেল, রিসর্ট ও হোম স্টে।
মানস মুখোপাধ্যায়