তিন ভগবানের মনের মতো করে পাত সাজানো কম ভাবনার নয়। তাঁদের পছন্দ-অপছন্দ বুঝে খাদ্য উৎসর্গ করতে হয়। রথের সময় পুরীতে নানা সময় বিভিন্ন প্রসাদের চল রয়েছে। তেমনই দুই প্রসাদের কথায় ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
তিন ভগবানের মনের মতো করে পাত সাজানো কম ভাবনার নয়। তাঁদের পছন্দ-অপছন্দ বুঝে খাদ্য উৎসর্গ করতে হয়। রথের সময় পুরীতে নানা সময় বিভিন্ন প্রসাদের চল রয়েছে। তেমনই দুই প্রসাদের কথায় ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
রথের দিন শ্রীজগন্নাথধাম পুরীকে নিয়ে কতই না উৎসাহ! প্রভুর উদ্দেশে অন্য সময় নানাবিধ অন্নভোগ উৎসর্গ হলেও রথারূঢ় দেবতারা কোনো অন্নভোগ গ্রহণ করেন না। রথে থাকাকালীন খানিক ভিন্ন পদে সাজে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার ভোজপর্ব। তার অন্যতম বলগণ্ডি ভোগ। আবার অধরপনা উৎসবে হাজির থাকে বিশেষ শরবত ও পানীয়। আর এক দিন হয় রসগোল্লা ভোগ। এই তিন ধরনের খাদ্য-পানীয়র কাহিনি রইল আজ।
বলগণ্ডি ভোগ
শ্রীমন্দির ও গুণ্ডিচা মন্দিরের মাঝখানে বলগণ্ডি নামক স্থানে রথের সময় জগন্নাথদেব ক্লান্তি দূর করার জন্য কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। পঞ্চামৃত ও সুগন্ধি শীতল জল দিয়ে দেবতাদের দর্পণ অভিষেক করানো হয়। সুগন্ধি চন্দন ও কর্পূর সহযোগে দেবদেবীর শ্রীঅঙ্গে প্রলেপ দেওয়া হয়। চামর ও পাখার বাতাস করা হয়। এই সময়ে জগন্নাথসহ দেবতাদের ভোগ নিবেদন করা হয়। এতে থাকে সুবাসিত জল, ডাব, খেজুর, নারকেল, কলা সহ প্রভুর প্রিয় ফল, সর, রাবড়ি, ছানা, মালপোয়া, মোহনভোগ। একে বলে বলগণ্ডি ভোগ।
অধরপনা
একাদশীর দিন প্রভু সোনার রাজবেশে ভক্তদের দর্শন দেন। সঙ্গে সুভদ্রা ও বলরামও সোনার রাজবেশে সজ্জিত হন। এর পরদিন সন্ধ্যাবেলায় অধরপনা উৎসব পালিত হয়। ‘পনা’ শব্দের অর্থ ‘মিষ্টি শরবত’ বা পানীয়। জল, দুধের সর, দই, খণ্ডচিনি, কলা, কর্পূর, জায়ফল, কালো মরিচ, বড়ো এলাচের গুঁড়ো একসঙ্গে মিশিয়ে অধরপনা প্রস্তুত হয়। এরপর এই সুগন্ধি শরবতে তুলসীপাতা ও মঞ্জরী দিয়ে দেবতার অধরের সমান উঁচু এমন এক বিশাল পাত্রে রেখে নিবেদন করা হয়। দেবতাদের অধরের সমান উচ্চতার পাত্রে এই শরবত দেওয়ার জন্যই একে বলে ‘অধরপনা’। এই পানীয় জগন্নাথ সুভদ্রা বলরাম ছাড়াও রথের অন্যান্য দেবতাকেও নিবেদন করা হয়। সন্ধ্যার সময় ষোড়শোপচারে পুজোর শেষে দেবদেবীদের তা উৎসর্গ করা হয়। আরতির পর ওই পাত্রগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। তখন পাত্রস্থিত শরবত রথের মেঝেতে ও রথের নীচে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ওড়িশাবাসী মনে করেন, মহাপ্রভুর কাছে যেসব অতৃপ্ত আত্মা, প্রেত, অপশক্তি মুক্তির জন্য আসে, তারা মহাপ্রভুর প্রসাদস্বরূপ শরবত মাটি থেকে পান করে দিব্য বিগ্রহদের দর্শন ও তাঁদের কাছে শান্তি প্রার্থনা করে। মহাপ্রভু পতিতপাবন। তিনি তাদের মুক্তি দান করেন। অনেক ভক্তও মাটিতে পড়ে থাকা অধরপনা সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে এসে পরিবারের মৃত প্রিয়জনদের উদ্দেশে নিবেদন করেন। তবে এক্ষেত্রে একটি বিশেষ নিয়ম প্রচলিত আছে। এই বিশেষ শরবত দেবতাদের সেবায়েত ও ভক্তদের জন্য কোনো অবস্থাতেই গ্রহণীয় নয়!
রসগোল্লা ভোগ
ওড়িশার লোককথা অনুসারে, রথযাত্রায় দেবী লক্ষ্মীকে মাসির বাড়িতে না নিয়ে যাওয়ার জন্য অভিমানী হন দেবী। রথশেষে প্রভু জগন্নাথ যখন মাসির বাড়ি থেকে ফিরে আসেন, তখন রাগের চোটে সদর দরজায় তালা দিয়ে রাখেন লক্ষ্মীদেবী। অগত্যা রথেই প্রভুকে দিন কাটাতে হয়। শেষমেষ রসগোল্লা দিয়ে স্ত্রী দেবী লক্ষ্মীর মান ভাঙান প্রভু জগন্নাথ। ওড়িশায় ‘নীলাদ্রি বিজে’ উৎসবের একটি অংশ এই রসগোল্লা ভোগ প্রদান। মন্দিরে প্রবেশের আগে শ্রীজগন্নাথকে রসগোল্লা ভোগ দেওয়া হয়।