কীভাবে যাবেন: ট্রেনে বরবিল বা রাউরকেল্লা পৌঁছান। সেখান থেকে গাড়িতে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে সারান্ডা পৌঁছে যাবেন। কলকাতা থেকে টানা গাড়িতে এনএইচ ৬ এবং এনএইচ ৪৯ ধরেও যেতে পারেন। ১২ ঘণ্টা মতো সময় লাগে।
কীভাবে যাবেন: ট্রেনে বরবিল বা রাউরকেল্লা পৌঁছান। সেখান থেকে গাড়িতে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে সারান্ডা পৌঁছে যাবেন। কলকাতা থেকে টানা গাড়িতে এনএইচ ৬ এবং এনএইচ ৪৯ ধরেও যেতে পারেন। ১২ ঘণ্টা মতো সময় লাগে।
সারান্ডার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি কিরিবুরুর দিকে। মাঝখানে একটা চৌমাথার মোড় আসতেই হাত দেখিয়ে এক নবীন যুবক লিফট চাইল। তাও আবার ঝরঝরে বাংলা ভাষায়। অচেনা জায়গায় অপরিচিত কাউকে গাড়িতে তুলতে একটু ভয় লাগলেও বাঙালি দেখে আমরা তাঁকে গাড়িতে তুলে নিলাম। জানা গেল, কয়েক কিলোমিটার দূরে এক মেডিক্যাল ক্যাম্প আছে। উনি ওই ক্যাম্পের মেডিক্যাল সুপারভাইজার। প্রাথমিক পরিচয় পর্ব সারা হলে উনি জানতে চাইলেন, ‘এখানে কি আপনাদের কোনো রিলেটিভের বাড়ি?’
‘না না। আমরা তো এখানে বেড়াতে এসেছি।’ উনি সামনের সিটে বসেছিলেন। আমাদের কথা শুনে পেছন ঘুরে তাকিয়ে বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ‘বেড়াতে এসেছেন? আপনারা আর বেড়াতে যাওয়ার জায়গা পেলেন না? এখানে দেখার কী আছে? শুধুই জঙ্গল। ওয়েস্ট বেঙ্গলে এত সুন্দর সুন্দর জায়গা ছেড়ে এখানে কেউ বেড়াতে আসে!’
ওঁর কথা শুনে মাথাটা গরম হয়ে গেল। কতদিন ধরে সারান্ডা আসব ভাবছি, এত পড়াশোনা করেছি, এত ভিডিও দেখে আপ্লুত হয়েছি। আর উনি কিনা বলেন, এখানে কিছুই নেই! অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে একটা তেতো হাসি হাসলাম। ওই হাসিটাই ছিল ওঁর যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর। এদিকে সকাল থেকে ট্রেনের বিভ্রাটে সারাদিন আমাদের বেশ ভালো রকম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। আসলে আমাদের বুকিং ছিল মনোহরপুর ফরেস্ট বাংলোতে। কিন্তু টাটায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও যখন মনোহরপুরগামী ট্রেন কিছুতেই এল না, তখন বাধ্য হয়ে টাটা থেকে গাড়ি ভাড়া করতে হল।
চাইবাসায় দুপুরের খাবার খাওয়ার পর আবার আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করল। রাস্তা যেন কিছুতেই ফুরাতে চায় না। দু’হাত ছাড়া ছাড়া রাস্তার দু’পাশে হাঁড়িয়া ছাড়া আর অন্য কোনো দোকান চোখে পড়ে না। রোদ ক্রমশ কমতে শুরু করেছে। পথশ্রমে সকলেই ক্লান্ত। চার ঘণ্টার কাছাকাছি পথ চলার পর ড্রাইভার মশাই জানালেন যে, মনোহরপুর এখনও প্রায় আশি কিলোমিটার। সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে। তার চেয়ে আপনারা বরং কিরিবুরুতে থেকে যান। সেই প্রস্তাবে রাজি হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু কিরিবুরুতে থাকব কোথায়? কোথাও তো আমরা বুকিং করে আসিনি। ড্রাইভার সাহেব বললেন, ‘হিলটপ গেস্ট হাউস আছে। ফাঁকাই থাকে। একটু রিকোয়েস্ট করলে ওরা ঠিক দিয়ে দেবে।’ সেই মেডিক্যাল সুপারভাইজারের গন্তব্য এসে গিয়েছে। নামার আগে একটু অন্য সুরে তিনি বললেন, ‘এখানে কে আর বেড়াতে আসবে? নিশ্চয়ই ফাঁকা থাকবে।’ ততক্ষণে অরণ্যের হাতছানি একটু একটু করে ভালো লাগতে শুরু করেছে। সে সময় এমন বেরসিকের মতো মন্তব্য কার আর ভাল লাগে!
কিরিবুরুতে পৌঁছে যেখানে আমাদের গাড়ি থামল, সেই জায়গাটার নাম কিরিবুরু হিলটপ বা সানরাইজ পয়েন্ট। খোঁজ নিয়ে জানা গেল গেস্ট হাউসে জায়গা নেই। সেইলের (স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া) কোনো একটা ট্রেনিং চলছে। ফলে অনেক কর্মী সেখানে ঠাঁই নিয়েছেন। একে তাকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, কাছেই একটা প্রাইভেট গেস্ট হাউস আছে। সেটা পাওয়া যেতে পারে। গিয়ে দেখলাম, কেউ কোত্থাও নেই। ঘরে তালা ঝুলছে। আশপাশের লোকজন সেই গেস্ট হাউসের মালিককে ফোন করার মিনিট দশেকের মধ্যে উনি চলে এলেন। খুব অমায়িক ভদ্রলোক। গেস্ট হাউস মানে একচালা দুটো ঘর। পাশেই ফল–ফুলে ভরতি বিশাল বাগান। বড়ো রুমটা আমাদের জন্য খুলে দিলেন। যাবতীয় ক্লান্তি ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে সেখানেই ঠাঁই নিলাম। আধঘণ্টার মধ্যেই বিছানা থেকে ঘর, বাথরুম সব সাফসুতরো করে দিলেন। স্নান সেরে ফ্রেশ হতেই আমাদের পরিবেশন করলেন গরম গরম চাউমিন আর চা। সারাদিনের ক্লান্তি ও বিরক্তি একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছিল। ততক্ষণে সন্ধে নেমে গিয়েছে। চা–পর্ব সেরে আমরা হাঁটতে বেরলাম। পাশাপাশি লোকজনের ঘরবাড়ি রয়েছে। আকাশে ঝকঝকে চাঁদ উঠেছে। এর আগে অনেকবার উত্তরবঙ্গে গেছি। সন্ধেবেলায় যখনই হাঁটতে বেরোতাম, তখনই মনে হত আকাশের সব তারা ওই সামনের পাহাড়ে চলে এসছে। সারান্ডাটাও সেইরকম লাগছিল।
‘সাতশো পাহাড়ের দেশ’-এর এক পাহাড়ে আমরা রয়েছি। আর আমাদের চারপাশে না জানি আরও কত অজস্র পাহাড় রয়েছে। পাহাড় থেকে দূরে বোকারো স্টিলসিটির আলোগুলো তারার মতোই মিটমিট করে জ্বলছিল। রাত বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হাওয়ার দাপট। সান্ধ্য ভ্রমণ সাঙ্গ করে রুমে ফিরে আসতে হল। ততক্ষণে আমাদের ডিনার তৈরি। গরমাগরম ধোঁয়া ওঠা ভাত। সঙ্গে আলু বেগুন ভাজা, ফুলকপির তরকারি ও ডিমের কষা। খাওয়ার পর মনে হল, আরেক রাউন্ড ঘুরে এলে কেমন হয়! সত্যি কথা বলতে কী, ওইরকম জংলি চাঁদ আর জ্যোৎস্নাযাপন ছিল কিরিবুরুর সেরা পাওনা। রাতের নিস্তব্ধতা বাড়ছে। কোথাও শাল–সেগুন, কোথাও সোনাঝুরি গাছের দল ঘুমিয়ে পড়ছে। দূরের পাহাড়গুলো যেন আরও মায়াবী হয়ে উঠছে।
ভোরবেলায় পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। একা একাই কাকভোরে বেরিয়ে পড়লাম। ভোরবেলায় কিরিবুরুর চারপাশের প্রকৃতি দেখে মনটা ভোরের আলোর মতো নরম হয়ে গেল। মনে হল গতকাল আসল গন্তব্যে (মনোহরপুর) পৌঁছতে না পেরে ভালোই হয়েছে। সেখানে নিশ্চিতভাবে প্রকৃতিকে এত সুন্দরভাবে পেতাম না।
‘কিরি’ শব্দের অর্থ পোকা। আর ‘বুরু’ মানে পাহাড়। কিরিবুরু অর্থাৎ পোকা–পাহাড়। এই আক্ষরিক অনুবাদ শুনে মনে হতেই পারে, প্রচণ্ড পোকার উৎপাত। একেবারেই তা নয়। অরণ্যে ঘেরা বেশ শান্ত, স্নিগ্ধ এক জনপদ। যেখানে সময় আপন খেয়ালে বয়ে যায়। রাস্তায় যেসব লেখা চোখে পড়ল সেসব অধিকাংশই ওড়িয়া ভাষায় লেখা। কিন্তু ঝাড়খণ্ডে ওড়িয়া ভাষা কেন? লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতেই জানতে পারলাম কিরিবুরুর একটা অংশ যেমন ঝাড়খণ্ডে, তেমনই এই হিলটপ অংশটা ওড়িশার মধ্যে পড়ে। সারান্ডার জঙ্গলে দুই রাজ্যের সীমানা রয়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তার এপারটা ঝাড়খণ্ড, ওপারটা ওড়িশা।
কিরিবুরু জায়গাটা অজস্র শাল গাছের জঙ্গলে পরিপূর্ণ। মাথার উপর ঝকঝকে নীল আকাশ, সবুজ বনানী আর লালমাটির রাস্তা— সে এক অপূর্ব দৃশ্যপট। ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট ও স্নান পর্ব চুকিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আয়রন মাইনস ও ঘাঘরি ফলসের উদ্দেশে। আয়রন মাইনস–এ ঢোকার আগে অনুমতি করিয়ে নিতে হয়। মাথাপিছু ২০০ টাকা। এরপর নিবিড় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম ঘাঘরি ফলসের উদ্দেশে। দু’পাশে এমন নিবিড় ঘন জঙ্গল যে কথা বলতেও ভয় হয়। জঙ্গলের নানা রঙের সবুজ আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। কতরকম পাখি নির্ভয়ে খেলে বেড়াচ্ছে। তা দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম ঘাঘরি ফলসে। নীচ থেকে তেমন ভালো লাগছিল না। কিন্তু ঝুলন্ত ব্রিজ ধরে যত সেই ঝরনার কাছে এগতে থাকি, ততই বাড়তে থাকে তার রূপ ও গর্জন। ব্রিজ আর শেষ হয় না। যেখানে দাঁড়াচ্ছি, সেখান থেকেই ঝরনাকে দেখছি নতুন চেহারায়। ফিরে এসে বিকেলে গেলাম সানসেট পয়েন্ট দেখতে। সাতশো পাহাড়ের দেশে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই বড়ো মনোরম। মেঘাতুবুরু, স্থানীয় কিরিবুরু বাজার দেখে আমরা ফিরে এলাম। মেঘাতুবুরু বড়োই মায়াজড়ানো। দু’পাশে জঙ্গলের মাঝে বিকেল নেমে আসছে। ওই রাস্তায় হেঁটে যাওয়া সত্যিই বেশ রোমাঞ্চকর।
অন্তরা চৌধুরি