স্বপ্ন শুধু দেখলেই হয় না। স্বপ্ন পূরণও করতে হয়। সেই লক্ষ্যেই গিয়েছেন শতরূপা মজুমদার। তাঁদের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নাম তাই ‘স্বপ্নপূরণ।’ কীভাবে শুরু হয়েছিল তাঁদের এই যাত্রা? পরোপকারের ভূত বরাবরই মাথায় ছিল পঞ্চাশ ছোঁয়া শতরূপার। সুযোগ সুবিধে হলেই কোথাও শাড়ি বিতরণ, কোথাও বই বিতরণ ইত্যাদি এদিক-ওদিক করেই বেড়াতেন। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে ছবিটা কিছুটা বদলায়।
গোড়ার কথা
সেবার শহর থেকে এক মাসির সঙ্গে সেলাই মেশিন দিতে গিয়েছিলেন নদী পেরিয়ে হাসনাবাদ হিঙ্গলগঞ্জের দরিদ্র মহিলাদের। গ্রামের মানুষ সেখানে একজোট হয়েছেন। আর শতরূপা দেখেছেন তাঁদের কতরকম প্রয়োজন। প্রয়োজনের তুলনায় কত কম প্রাপ্তি ওই মহিলাদের। শতরূপা পেশায় শিক্ষিকা জানার পরে মহিলাদের মধ্যে অনেকে তাঁকে অনুরোধ করেন, বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য। মায়েদের আকুতি শুনে মনে দাগ কাটে শতরূপার। এমনিতেই শিক্ষিকা হিসেবে একযুগেরও বেশি সময় আগে তাঁর মনে হয়েছিল, শহরেই সবরকম সুযোগ সুবিধা। গ্রামে সত্যিই নেই কিছু। অথচ গ্রামের শিশুদের মধ্যেও সম্ভাবনা থাকে পুরোমাত্রায়। ওদের ঠিক পথে চালিত করলে ওদের মধ্যে থেকেই প্রতিভার বিকাশ হতে পারে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা অনেক সময়ই
এই দিকটা দেখতে পান না। অনেক শিশুর ভবিষ্যৎ এভাবে নষ্ট হয়ে যায়। শিক্ষকদের সদর্থক ভূমিকাটা পালন করতে চেয়েছিলেন তিনি।
ভালোলাগা ভালোবাসা
সেই ভাবনা থেকে ওই সময়ে হাসনাবাদে ছোট একটি শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি করেন শতরূপা। দরমা ঘেরা একটা কুঁড়েঘর— স্বপ্ন দেখার শুরু তাই ঘিরেই। এই গন্তব্যে পৌঁছতে একটা সময় তাঁকে ট্রেনে করে স্টেশন, সেখান থেকে ভ্যানরিকশায় নদীর পাড়। নৌকায় নদী পেরিয়ে অটো করে যেতে হতো তাঁকে। সাত বছর পর অর্থাৎ ২০১৯ সালের সেতু তৈরি হয়েছে সে পথে। তাঁর এই সাধু উদ্দেশ্য কখনও বাধা পায়নি। শহরে শিক্ষকতা আর গ্রামে গিয়ে সপ্তাহান্তে শিশুদের জন্য শিক্ষাকেন্দ্র চালানো, এভাবেই চলছিল। গ্রামগুলোয় বাচ্চাদের আগে সাত-নয় বছর বয়স হওয়ার আগে বাবা মা স্কুলে পাঠানোর কথা ভাবতেনই না, বলছিলেন শতরূপা। প্রাথমিক শিক্ষা বলেও যে কিছু হতে পারে, এটা অনেকের ধারণার বাইরে ছিল। বোঝানোর কাজ শুরু করেন তিনি। বিড়ি শ্রমিকদের শিশুদের পড়ানো দিয়ে তাঁর কাজের সূত্রপাত। নিছক ভালোলাগা থেকে যে কাজের শুরু, তা ধীরে ধীরে ভালোবাসায় পরিণত হল। ২০-২২ জন শিশু থেকে সংখ্যা বেড়ে বছর ছয়েকের মধ্যে দাঁড়াল ৫০-১০০। ২০১৮ সালে শতরূপা জীবনের একটা বড় সিদ্ধান্ত নেন। চাকরি করতে করতে সমাজসেবা করব ভাবলেও সেটা হাতেকলমে করা যায় না— এই উপলব্ধি থেকে চাকরি ছেড়ে তিনি নিজেকে সঁপে দেন শিশুদের শিক্ষাদানে। দু’একর জমি জোগাড় করে বাচ্চাদের জন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুল তৈরি করবেন ঠিক করেন। জীবনে চলার পথে ইংরেজির দরকার পড়বেই। তাই শিশুরা যখন বৃহত্তর জগতে পা রাখবে, তখন যাতে ধাক্কা না খায় তাই প্রথম থেকেই আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে, ভেবেছিলেন এমনটাই।
প্রথমদিকে স্বাভাবিকভাবেই বাচ্চাদের উপস্থিতির হার কম ছিল। অনেক অভিভাবক বিষয়টা সম্পর্কে নিশ্চিত জানতেন না কিছু। সরকারি স্কুলে বিনামূল্যে পড়ানোর সুবিধা ছেড়ে ওই স্কুলে কেন দেবেন, সেই ভাবনাও ছিল। সিবিএসই বোর্ডের স্বপ্নপূরণ স্কুলে কিন্তু সামান্য হলেও বেতন দিতে হয়। ২৫০-৩৫০-৪৫০ টাকা। ক্লাসভেদে এইভাবে বাড়ানো হয়। এটা শুধু প্রধান স্কুলে। বাকি স্কুলগুলো আরও কম। আসলে সামান্য হলেও বেতনের ব্যবস্থা রয়েছে যাতে অভিভাবক থেকে শিশু, সবার কাছে এটা স্পষ্ট হয় যে কিছুই বিনামূল্যে পাওয়া যায় না জীবনে। বিনামূল্যে পাওয়া গেলে তার কদরও থাকে না, মনে করেন শতরূপারা।
পাশে থাকা
কোভিডের মধ্যে একদিকে তাঁর স্কুল তৈরির কাজ চলছিল। অন্যদিকে যে শিশুদের তিনি এতদিন পড়িয়ে এসেছেন, তাদের জন্য অনলাইনে শিক্ষাদান চালিয়ে যান শতরূপা। সেই সময় তো গ্রামে গ্রামে শোনা গিয়েছিল অনলাইন ক্লাস ঠিকভাবে করতে না পারায় অনেক শিশু পিছিয়ে পড়েছে। শতরূপার শিক্ষার আওতায় বাচ্চারা ব্যতিক্রমী। কীভাবে এই অসাধ্য সাধন করলেন? তিনি জানালেন, কত জন অভিভাবকের কাছে অ্যানড্রয়েড ফোন আছে, তার খোঁজ শুরু করেন তাঁরা। দেখা যায় ৬০-৬৫ শতাংশ বাবার কাছে স্মার্টফোন রয়েছে, যার সাহায্যে বাচ্চাদের ক্লাস করানো সম্ভব। বাবারা ওই সময় বাইরে কোথাও কাজের জন্য যেতেও অপারগ। তাই বাবাদের ফোন থেকেই শেখানোর কাজ চলতে থাকে। আর যাদের ফোন ছিল না, সেসব জায়গায় গিয়ে ওয়ার্কশিট দিয়ে আসতেন শতরূপা সহ অন্য শিক্ষকরা। তাঁদের খাবারদাবার পৌঁছনোর সঙ্গে এটাও করা হতো নিয়মিতভাবে। হাসনাবাদ পেরিয়ে পশ্চিম খেজুরবেরিয়া (উমপুন বিধ্বস্ত) এবং ছোটসাহেবখালিতেও তাঁদের কাজ শুরু হয়।
এক্ষেত্রে শতরূপাদের অভিজ্ঞতা এতটাই ভালো যে বললেন, কোনও অভিভাবক এগিয়ে আসেননি এটা বলা যাবে না। বাবাদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। নার্সারি থেকে শুরু করে কেজি পর্যন্ত বাচ্চাদের চাল ডাল মিশিয়ে বাছতে দেওয়া হতো, ফাইন ও গ্রস মোটর স্কিল তৈরির জন্য। বাবারা এক্ষেত্রে উৎসাহী হয়ে এগিয়ে আসতেন বাচ্চাদের আগ্রহ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। বাচ্চাকে ছড়া শেখানোতেও সমান উৎসাহ দেখাতেন তাঁরা।
শিক্ষার স্বপ্নপূরণ
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা স্বপ্নপূরণ-এর উদ্যোগে এখন মোট পাঁচটি স্কুল রয়েছে সুন্দরবনে। ‘স্বপ্নপূরণ শিক্ষা নিকেতন’। সেদিনের সেই কুঁড়েঘর এখন বড় বিল্ডিং। প্রধান স্কুলটিতে এখন ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ানো হয়। স্কুলে স্টেম ল্যাব পর্যন্ত তৈরি করতে পেরেছেন তাঁরা। সুন্দরবনে তাঁরাই প্রথম। বাচ্চাদের জন্য আবাসিক স্কুল পরিকল্পনায় রয়েছে তাঁদের। শুরু করেছিলেন শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু বড় পুঁজি নিয়ে সেই কাজটা বৃহত্তরভাবে করার দিশা তখন ছিল না। কাজ করতে করতেই শিখেছেন অর্থ জোগাড় করে তহবিল গড়ার কাজ। কোভিড তাঁদের পরিচিতি পেতে সাহায্য করেছে, জানালেন শতরূপা। সে সময় অন্তত ৫ হাজার মানুষকে রান্না করা খাবার সংস্থার উদ্যোগে পৌঁছে দেওয়া হতো। তার আগে উমপুন সাইক্লোনে বিধ্বস্ত বিভিন্ন স্থানে তাঁরা খাবার দিতে যেতেন। শুধু অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা ভেবে খাবার বিতরণ করতেন তাঁরা। এই কাজ নজরে পড়ে আরও অনেকের। মানুষ ‘স্বপ্নপূরণ’ সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রচারের ফলে নানা জায়গা থেকে তাদের কাছে আসতে থাকে সাহায্য। এখন এই সংস্থার কর্মী সংখ্যা ছুঁয়েছে ৮৬। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ স্থানীয় মানুষ, যাঁরা সংস্থার হয়ে কাজ করেন। বাকি কর্মীরা বাইরে থেকে নিযুক্ত হন। এখন আবাসিক শিক্ষক শিক্ষিকা রয়েছেন অন্তত ১৭ জন। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিছু কিছু স্কুল তাঁরা দত্তক নিয়েছেন, বালি দ্বীপ এবং কুলতলিতে, বললেন শতরূপা।
স্কুলপাঠ শেষ হলে বিভিন্ন কলেজের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ রয়েছে যাতে বাচ্চারা বড় হয়ে সেখানে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিতে পারে, এবং শেষে একেবারে চাকরি নিয়ে বেরতে পারে। এটা অভিভাবকদের কাছেও একটা বড় স্বস্তির কারণ।
এই স্বেচ্ছাসেবায় শতরূপা পাশে পেয়েছেন তাঁর পরিবারকে। তখন সমাজ রক্ষণশীল থাকলেও তাঁর সাধু উদ্দেশ্য কখনও থেমে থাকেনি। এখন তাঁর নিজের মেয়েও আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছে এই কাজে। জীবনের উদ্দেশ্য শুধু নিজেরটুকু নিয়ে বাঁচা নয়, এই ভাবনাটা তিনি জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন তাঁর কন্যার মধ্যেও।
অন্বেষা দত্ত