Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

বিশ বছর আগের সেই অপহরণ... রোমা ঝাওয়ার

মুখ্যসচিব এ কে দেবের বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে একটা ক্রিম রঙের মারুতি এসে দাঁড়াল। ভিতরে চারজন। হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। ঘড়ি দেখল একজন—৮টা বেজে গিয়েছে। সকাল। অপেক্ষা শুধু একটা ইন্ডিকা গাড়ির। সেই গাড়ি সামনে এলেই শুরু হবে ‘অ্যাকশন’!

বিশ বছর আগের সেই অপহরণ... রোমা ঝাওয়ার
  • ১৯ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ঘটনাবহুল জীবন। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমাদের চারপাশে কিছু না কিছু ঘটে চলেছে। বহু ঘটনা হারিয়ে যায় মুহূর্তের ভিড়ে। কোনও ঘটনা উঠে আসে শিরোনাম হয়ে। আর তার মধ্যে কিছু রেখে যায় দাগ। রক্তের দাগ। এমনই সাড়া ফেলে দেওয়া কয়েকটি ঘটনা ফিরে দেখল বর্তমান। সোহম করের কলমে।

Advertisement

মুখ্যসচিব এ কে দেবের বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে একটা ক্রিম রঙের মারুতি এসে দাঁড়াল। ভিতরে চারজন। হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। ঘড়ি দেখল একজন—৮টা বেজে গিয়েছে। সকাল। অপেক্ষা শুধু একটা ইন্ডিকা গাড়ির। সেই গাড়ি সামনে এলেই শুরু হবে ‘অ্যাকশন’! 
লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে মিনিট পাঁচেকের অপেক্ষা। একটা সিগারেট শেষ হতে না হতেই... ‘উও দেখ... চিড়িয়া আ গ্যায়া।’ মারুতি থেকে চারজন নামল। সামনে বসে থাকা তরুণীকে এক টানে নামাল। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর তরুণী কন্যা রোমা ঝাওয়ার তখন চিত্কার করছেন, ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ কে কাকে বাঁচাবে? দু’জনের হাতে যে পিস্তল। ঘড়িতে তখন সকাল ৮টা ১৫। তরুণীকে নিয়ে ছুটল সেই মারুতি। 
দু’দশক আগের ওই শীতের সকাল তোলপাড় ফেলেছিল গোটা রাজ্যে। ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০০৫। সল্টলেকের মতো হাই-প্রোফাইল এলাকা থেকে এক ব্যবসায়ীর কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে কিডন্যাপ! তাও ভরা দিনের আলোয়! প্রশ্ন উঠল, রাজ্যে মহিলাদের নিরাপত্তা কোথায়? সামাজিক অবক্ষয়? নাকি সর্ষের মধ্যে ভূত? ইন্ডিকা গাড়ির দরজা চালক লক করলেন না কেন? এমন অনেকগুলো প্রশ্ন জুলাইয়ের বৃষ্টির মতো ঝাপটা মেরেছিল রাইটার্সের অন্দরে। ‘বর্তমান’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বরুণ সেনগুপ্ত সম্পাদকীয় কলামে লিখলেন, ‘একটি মেয়ে বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিত্কার করছে, অথচ কেউ তার সাহায্যে এগিয়ে যাচ্ছে না। এই রকম পরিস্থিতি যেখানে, বা যে রাজ্যে, সেখানে কি শুধু পুলিসের উপরই সব দোষ চাপিয়ে দেওয়া যায়? আমাদের সমাজের বহু মানুষের ক্লীব মনোভাব যতদিন না পাল্টাবে, ততদিন যেমন রাজনৈতিক জুলুমবাজ এবং স্বৈরাচারীরাও যা ইচ্ছা তাই করার সাহস পাবে, তেমনই নানা সমাজবিরোধী অপরাধীর দুঃসাহসও বাড়তেই থাকবে।’ এই ছিল তোলাপাড় ফেলে দেওয়া এই ঘটনার সামাজিক বিশ্লেষণ।  
এবার পুলিসি তদন্তের দিকে তাকানো যাক। সেদিন সকালে খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে গেলেন দক্ষিণবঙ্গের আইজি বাগীশ মিশ্র, প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের ডিআইজি হরমনপ্রীত সিং, জেলা পুলিস সুপার প্রভীন কুমার, ডিআইজি সিআইডি (অপারেশন) রাজীব কুমার, এসএস (সিআইডি) বিনীত গোয়েল সহ অন্যান্য দুঁদে পুলিস কর্তারা। তদন্ত যত এগিয়েছে, প্রশ্নের উত্তর তো দূরের কথা, আরও প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। ৪ ফেব্রুয়ারি, অর্থাত্ শুক্রবার সকালে ঠিক কী ঘটেছিল? সেদিন রোমার গাড়ি চালাচ্ছিলেন সুকুমার মণ্ডল। সল্টলেকের সিবি ব্লকের বাড়ি থেকে প্রতিদিনের মতোই গাড়ি চেপে কলেজের উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন তিনি। রোমা জিডি বিড়লা কলেজের ফ্যামিলি রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের ছাত্রী। ভাইপো বেদান্তকে নিয়ে বসেছিলেন চালকের পাশেই। পিছনের সিটে রোমার বান্ধবী শবরী। ডিবি ব্লকের বাসিন্দা, একই কলেজের ছাত্রী। তদন্তে সুকুমারের বক্তব্য ছিল, ‘চারজন মারুতি থেকে নামে। দু’জনের হাতে পিস্তল ছিল। গাড়ির সামনে এসে তারা বলতে থাকে, জলদি নিকলো। রোমা ভাইপোকে গাড়িতে রেখেই বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার করতে থাকেন। চোখের নিমেষে রোমাকে নিয়ে মারুতি ছোটে ইএম বাইপাসের দিকে।’ ঘটনার মিনিট ২০ পরই অপহরণকারীরা রোমার মোবাইল ফোন থেকে তাঁর দাদাকে ফোন করে। হিন্দিতে বাতচিৎ। মুক্তিপণ দাবি করে ৫০ লক্ষ টাকা। হাওড়ায় রোমার বাবার একটি ডাইং ও প্রিন্টিংয়ের কারখানা ছিল। পুলিস সাংবাদিকদের জানিয়েছিল, সন্ধ্যা পর্যন্ত চারবার ফোন এসেছিল। লোকেশন ছিল বেলেঘাটা, ফুলবাগান, শ্যামবাজার। সূর্য অস্ত যেতে মুক্তিপণের দাবি ২০ লক্ষ টাকায় নেমে আসে। রাত ৯’টার দিকে আবার বরানগর এলাকার একটি টেলিফোন বুথ থেকে ফোন। অপহরণের ১৫ ঘণ্টা পর, শুক্রবার গভীর রাতে বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলেন রোমা। জানান, ভালো আছেন।
রোমা বাড়ি ফিরেছিলেন। সুস্থ সবল অবস্থাতেই। কোনও কিছুর বিনিময়ে? টাকা? নাকি পুলিসের তত্পরতায়? উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে ফুলবাগানের একটা গ্যারাজে। 
(চলবে)

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ