সদ্য বিয়ে হয়েছে অস্মিতার। বিয়ের পর এদিক ওদিক নেমন্তন্ন, টুকটাক ঘোরাফেরা, হানিমুন সেরে এবার গুছিয়ে বসার পালা। অফিসও শুরু হয়েছে জোরকদমে। স্বামী-স্ত্রীর চাকরির কারণে বাপের বাড়ি-শ্বশুরবাড়ি দুই ছেড়ে আলাদা শহরে সংসার পাততে হয়েছে ওদের। বাড়িতে আলাদা করে অভিভাবক কিংবা বেরনোর সময় হাতের কাছে এটা-ওটা গুছিয়ে দেওয়ার লোক নেই। বর বিশাখ বেরিয়ে যাওয়ার পর নিজের বেরনোর জন্য মেরেকেটে এক ঘণ্টা সময়ও হাতে থাকে না। নতুন জায়গায় বিশ্বস্ত পরিচারিকা পেতেও সময় লাগে। তাই আনকোরা হাতেই বেশিরভাগ কাজ সামলাতে হচ্ছে অস্মিতাকে।
তূণীরের জীবনের গল্প আবার খানিক আলাদা। ওর বাবা-মা দু’জনেই উঁচু পদে কর্মরত। তূণীরও বেশ দায়িত্বপূর্ণ পদে রয়েছে। সাতসকালে সকলের খেয়ে বেরনোর তোড়জোড় করতে গিয়ে মায়ের ছুটোছুটি তার চোখ এড়ায়নি। ও বা ওর বাবা হাতে হাতে টুকটাক কাজ এগিয়ে দিলেও মায়ের বড় ভরসা মিনতিমাসি। ছোট থেকেই দেখছে মায়ের গৃহকাজের সহায়িকা মিনতিমাসি আর মা মিলে আগের রাতেই সকালের কাজ অনেকটা হালকা করে রাখেন।
চাকরির ঘোড়দৌড়, তাড়াহুড়োয় অফিস ও হেঁশেল একসঙ্গে সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়! সকালের জলখাবারের সঙ্গে নিজেদের অফিসের টিফিন, বাড়ির খুদে সদস্যটির জন্য দুপুরের খাবার বা টিফিন বানানো, বয়স্ক সদস্যদের জন্য খাবার তৈরি সবই রয়েছে রুটিনে। আবার খাবারেও চাই বৈচিত্র্য। তাই আগে থেকে পরিকল্পনা না করে রাখলে সকালে হেঁশেল সামলাতে কালঘাম ছুটবে। সুতরাং সহজ কিছু কৌশল জানা থাকলে, চটজলদি রান্নাও হবে, খেতেও হবে সুস্বাদু।
কোন কোন পদ ভেবে নিন
আগের দিন রাতেই ঠিক করে নিন কাল কী কী রান্না হবে। অনেক বাড়িতে সকালে বাজার সেরে রান্নার প্রচলন আছে। তবে অফিস যাওয়ার চাপের মধ্যে এই পদ্ধতি খুব সুখকর হবে না। বাজার করার সময় একসঙ্গে তিন-চার দিনের বাজার সারুন ও আগের দিন রাতেই পরিকল্পনা করে রাখুন কী রান্না করবেন। খুব দীর্ঘ রেসিপি সকালের জন্য রাখবেন না। রাখলেও তার বেশিরভাগ প্রস্তুতি আগের দিন করে রাখুন। প্রাতরাশে কী বানাবেন, অফিস বা স্কুল কলেজের টিফিনে কী দেবেন, দুপুরের রান্না কী হবে সব ঠিক করে রাখুন আগেই। এতে ভাবনা ও আয়োজনের জন্য সময়টা বেঁচে যাবে। দ্রুত ভাত রান্নার টিপস
সকালের তাড়াহুড়োয় অনেকেই ভাতের ফ্যানের আন্দাজ বুঝতে পারেন না। হয় বেশি ফুটিয়ে ফেলেন, নয়তো জল কম দেওয়ায় ভাত সেদ্ধ হতে অনেকটা সময় ব্যয় করে। ফ্যান গালতে দেরি হলে আবার ভাতে মাড় কিছুটা বসে একে অন্যের গায়ে জড়িয়ে যায়। তাই ভাত রান্নার সময় চাল ও জলের অনুপাত জেনে নিন। চালভেদে এই জলের অনুপাত অনেক সময় বদলে যায়। রান্নার আগে চাল কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখুন। চাল ভিজিয়ে হাতের কাজ সারুন। এবার ভাত রান্নার সময় ভাতের জলে একটা পাতিলেবু চিপে দিয়ে দিন। এতে ভাত ঝরঝরে হবে, ফ্যান গালতে একটু দেরি হলেও একে অন্যের গায়ে জড়াবে না এবং ভাত থেকে লেবুর হালকা সুগন্ধ বেরবে।
রান্নার আগাম প্রস্তুতি
পরের দিন কী কী রান্না হবে তার প্রস্তুতি আগের দিন রাতেই করে রাখুন। তরিতরকারি ধুয়ে, কেটে রাখুন এয়ারটাইট ব্যাগে। এভাবেই ফ্রিজে রেখে দিন। তাতে টাটকাও থাকবে, সকালে ব্যবহারও করতে পারবেন। শাক রান্না করার পরিকল্পনা থাকলে আগের রাতেই তা কুচিয়ে নুন-জলে ধুয়ে শুকনো করে একটা বায়ুনিরুদ্ধ ব্যাগে রেখে দিন। আদা-রসুন গোটা গোটা ব্যবহার করলে তাও আলাদা কৌটোয় ভরে রাখুন। যেসব মশলা পরের দিন সকালে লাগবে, তা হাতের কাছে গুছিয়ে রাখুন।
মশলা তৈরি রাখুন
সকালে উঠে বাটাবাটি বা গুঁড়ো করার ঝঞ্ঝাটে যাবেন না। তার চেয়ে রাতেই সেরে রাখুন সেই পাঠ। আদা-রসুনও বেটে রাখতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে আলাদা এয়ারটাইট পাত্রে বেটে ফ্রিজে রেখে দিন। খোলা পাত্রে রেখে ঢাকা দিয়ে রাখলেও কিন্তু ফ্রিজে গন্ধ হবে। তাছাড়া ফ্রিজের আর্দ্রতার প্রভাব পড়বে মশলায়।
এ তো গেল প্রস্তুতির সাতকাহন। রান্নার সময়ও যদি একটু সচেতন থাকেন, তাহলেও কিন্তু বাঁচতে পারে সময়। সবদিক সামলে চলা গৃহিণীরা এমন ঘরোয়া উপায়ে আস্থা রাখেন।
ঢাকাচাপা দিয়ে রান্না
খাবার দ্রুত রান্না করব, তেল বেশি দেব না অথচ সুস্বাদু হবে— এই তিন মন্ত্রে বিশ্বাসী হলে সাধারণ তরিতরকারি ঢাকা দিয়ে দিয়ে রান্না করুন। অনেকে তাড়াহুড়োয় আঁচ বাড়িয়ে ঢাকা ছাড়াই রান্না করতে শুরু করেন, এতে তেমন স্বাদও হয় না আবার অনেক সব্জিই আধসেদ্ধ থেকে যায়। তাই আঁচ মাঝারি রেখে প্রয়োজন মতো ঢাকা দিয়ে রান্না করুন।
জটিল রেসিপি নয়
যে রেসিপিতে খাটনি বেশি, সময় অনেক বেশি লাগে, সেগুলো অফিসের দিন না করে উইকএন্ড বা ছুটির দিনের জন্য তুলে রাখুন। বরং কখনও কুচো চিংড়ি, কখনও পোস্ত কখনও সর্ষে বাটা, কাসুন্দি ইত্যাদি ব্যবহার করে তরকারিকে সহজেই স্বাদু করুন। এই ধরনের রান্নায় সময়ও অনেক কম লাগে।
আভেনের সদ্ব্যবহার
তাড়াহুড়োর সময় বাড়ির দু’-তিনটি গ্যাস আভেনকেই ব্যবহার করুন। কোনওটায় ভাত বসিয়ে, পাশেরটায় তরকারি রাঁধুন। অনেকের বাড়িতে তিন-চার আভেনের গ্যাস বার্নার পাওয়া যায়। পারলে ওই সময় দুধ বা কোনও ভাজাভুজি অন্য দুটোয় বসিয়ে দিন। পালা করে করে মাঝেমাঝেই দেখে নিন সবগুলি। একসঙ্গে অনেক আভেন সামলাতে না পারলে অন্তত দু’টি আভেনে রান্না সারুন।
নুন ও জলের পরিমাণে নজর
তরকারি বা ঝোল রান্নার সময় অনেক সময় তাড়াহুড়োয় অনেকেই বেশি জল দিয়ে ফেলেন। পরে সেই ঝোল ঘন করতে কিছুটা সময় ব্যয় হয়। জল দেওয়ার সহজ নিয়ম— সব্জি ও মাছ যেন ঝোলে সম্পূর্ণ ডুবে না যায়। বাইরে থেকে যেন তাদের দেখা যায়। তাড়াহুড়োয় রান্নায় নুনও বেশি হয়ে যেতে পারে এক আধদিন। সেক্ষেত্রে নুন ছাড়া কাঁচা আলু কেটে ঝোলে ডুবিয়ে কিছুক্ষণ রেখে সেই আলুর টুকরো ফেলে দিন। ঝোলের অতিরিক্ত নুন আলু শুষে নেবে।