Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

মাইলফলকের ইতিকথা

মাইলফলক। ইংরেজিতে তর্জমা করলে মাইলস্টোন। শব্দটির উৎপত্তিও হয়েছিল ইংরেজিতেই। মাইলফলকের ব্যবহার কবে থেকে শুরু হয়েছিল, সেটা বলা মুশকিল।

মাইলফলকের ইতিকথা
  • ২৯ জুন, ২০২৫ ০৪:০০

অরিন্দম ঘোষ: মাইলফলক। ইংরেজিতে তর্জমা করলে মাইলস্টোন। শব্দটির উৎপত্তিও হয়েছিল ইংরেজিতেই। মাইলফলকের ব্যবহার কবে থেকে শুরু হয়েছিল, সেটা বলা মুশকিল। তবে ইতিহাসের নথি ঘাঁটলে পাওয়া যায় যে, অতি প্রাচীনকাল থেকেই রোমানরা এই ধরনের ফলক ব্যবহার করে আসছে। আসলে তারা সাম্রাজ্যের মধ্যে ছড়ানো রাস্তার নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। আর সেই কারণেই রাস্তার পাশে পাথর বা স্তম্ভগুলো স্থাপন করা হতো । সেইসময় এই মাইলফলকগুলো শহর ও অন্যান্য স্থানগুলোর মধ্যে দূরত্ব পরিমাপ করার ল্যান্ডমার্ক হিসাবে কাজ করত। এর মাধ্যমে পথচারী কতটা ভ্রমণ করলেন সেটাই কেবল নির্দেশ করত না, বরং পরবর্তী শহরটি আরও কত দূরে তার তথ্যও তিনি নির্ভুলভাবে পেয়ে যেতেন। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা এই মাইলফলকের ধারণাটি রোমানদের কাছ থেকে পেয়েছিল।

Advertisement

পথচারীদের কাছে মাইলফলক যে কেবল  দূরত্ব পরিমাপক হিসাবে কাজ করেছিল তাই নয়, ছোটদের পরপর সংখ্যা চেনার ক্ষেত্রেও এগুলির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এই প্রসঙ্গে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের একটি কাহিনি শোনানো যাক। বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কলকাতায় আসছেন ছোট্ট ঈশ্বরচন্দ্র। পথের ধারে মাইলফলক দেখে বাবার কাছে কৌতূহল সহকারে প্রশ্ন করলেন, ‘বাবা, রাস্তার ধারে শিল পোঁতা আছে কেন?’  বালকের জিজ্ঞাসা শুনে তাঁর বাবা হাসিমুখে উত্তর দিলেন, ‘ও শিল নয়, উহার নাম মাইলস্টোন।’ ঈশ্বরচন্দ্র পরবর্তীকালে আত্মজীবনী ‘বিদ্যাসাগর চরিত’-এর দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে লিখে গিয়েছেন সেই কথা। এর পরের ঘটনা শুনলে তোমরা আরও অবাক হবে। ছোট্ট ঈশ্বরচন্দ্র মাইলফলক দেখে দেখে ইংরেজি সংখ্যা চিনতে চিনতে এগচ্ছেন। হঠাৎ একটি মাইলফলক পেরনোর সময় তাঁর বাবা তাঁকে অন্যমনস্ক করে দেন। এরপর তাঁরা পরবর্তী মাইলফলকের কাছে উপস্থিত হন। বালক ঈশ্বরচন্দ্র জানতে চাইলেন যে, আগের মাইলফলকটা অনুপস্থিত কেন? ছেলের সংখ্যা চেনার এই দক্ষতার পরিচয় পেয়ে তাঁর বাবা খুবই খুশি হয়েছিলেন। তাহলেই ভাব ছোট্ট বন্ধুরা, এই মাইলফলক কীভাবে ছোট্ট ঈশ্বরচন্দ্রকে পথ চলার ফাঁকেই পরপর সংখ্যা চিনতে শিখিয়েছিল।
মাইলফলক সম্বন্ধে আরও একটা আকর্ষণীয় তথ্য জানানো যাক। রাস্তায় চলতে চলতে একটু ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখা যায় সাদা রঙের মাইলফলকগুলোর ওপরের অংশগুলো বিভিন্ন রঙের হয়। কোনওটা সবুজ, কোনওটা আবার হলুদ। এছাড়াও সাদা মাইলফলকের ওপরের অংশ কমলা, নীল ও কালো রঙেরও হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতিটা রঙের আলাদা আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। যেমন সাদা মাইলফলকের ওপরের অংশ যদি সবুজ দেখতে পাও, তাহলে বুঝবে সেটা রাজ্য সড়ককে নির্দেশ করছে। অর্থাৎ, রাস্তাটি রাজ্য সড়ক। একইভাবে কমলা রং গ্রাম বা পাড়া, নীল বা কালো রং শহর বা জেলা, হলুদ রং জাতীয় সড়ককে বুঝিয়ে থাকে। আসলে মাইলফলকের এই এক-একটা রং এক-একটা পথের ভিন্ন ভিন্ন গল্প শোনায়। বিষয়টা কী মজার, তাই না! শুধু তাই নয়, কোনও জায়গায় দেখতে পাবে, মাইলফলকের গায়ে শূন্য সংখ্যাটি চিহ্নিত করা আছে। এর অর্থ ওই নির্দিষ্ট স্থান থেকেই দূরত্ব গণনা শুরু করা হয়েছে বা ওখানেই দূরত্ব গণনা শেষ হয়েছে।
এই মাইলফলক একসময় পথিকের কাছে ছিল পথ চলার প্রেরণা। কিন্তু, বর্তমান সময়ে অনেক মানুষজনই অ্যান্ড্রয়েড ফোনের গুগল ম্যাপ বা জিপিএস ব্যবহার করে পথের দূরত্ব মাপতে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন। রাস্তার পাশে বহুকাল আগে স্থাপন করা বিবর্ণ মাইলফলকগুলোর দিকে ফিরেও তাকান না তাঁরা। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্ত মাইলফলক আর নতুন করে পরিষ্কারও করা হয় না। যেগুলো কালের নিয়মে ভেঙে গিয়েছে, সেগুলো একলা একলা ভাঙাচোরা অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই পথ চিহ্নগুলো ক্রমশই গুরুত্ব হারাচ্ছে পথচারীদের কাছে। আজও কি কোনও ছোট্ট ছেলে বা মেয়ে ফিকে হয়ে আসা জরাজীর্ণ মাইলফলকের দিকে তাকিয়ে সংখ্যা শিখে চলেছে? মোবাইল নেটওয়ার্ক কোনও কারণে কাজ না করলে হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলা গাড়িচালক কি আজও রাস্তার পাশে রংচটা মাইলফলকের দিকে অজান্তে এক লহমায় তাকান না? মাইলফলকের স্মৃতি মনে করতে করতে বড়রাও হয়তো অনেকেই মাঝেমাঝে ফিরে যান তাঁদের ফেলে আসা ছেলেবেলার স্মৃতিমেদুর দিনগুলোতে।

সম্পর্কিত সংবাদ