Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ময়দানের মেয়ে

২০২৫-এর ২ নভেম্বর। টেলিভিশনের পর্দায় যখন ভারতীয় মহিলাবাহিনী দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে জীবনের প্রথম বিশ্বকাপে হাত দিচ্ছে, আসমুদ্রহিমাচল তখন আবেগের স্রোতে দুরমুশ করে দিচ্ছে যাবতীয় মনখারাপকে। রাস্তায় নেমে এসেছে এক একটা মহল্লা। প্রায় প্রতি ক্রিকেটপ্রেমীর চোখে জল! এ জল শাপমুক্তির। এ জল অপেক্ষা অবসানের।

ময়দানের মেয়ে
  • ২১ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

এ মেয়ের গুণ অনেক। একইসঙ্গে বাংলার হয়ে খেলেছেন বাস্কেটবল ও ক্রিকেট। বয়স সত্তর পেরলেও মন এখনও মাঠের দিকেই! বঙ্গ ক্রিকেট ও বাস্কেটবলে অন্যতম নির্ভরযোগ্য নাম জয়ন্তী মুখোপাধ্যায় শোনালেন তাঁর ফেলে আসা অতীতের কথা।

Advertisement

২০২৫-এর ২ নভেম্বর। টেলিভিশনের পর্দায় যখন ভারতীয় মহিলাবাহিনী দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে জীবনের প্রথম বিশ্বকাপে হাত দিচ্ছে, আসমুদ্রহিমাচল তখন আবেগের স্রোতে দুরমুশ করে দিচ্ছে যাবতীয় মনখারাপকে। রাস্তায় নেমে এসেছে এক একটা মহল্লা। প্রায় প্রতি ক্রিকেটপ্রেমীর চোখে জল! এ জল শাপমুক্তির। এ জল অপেক্ষা অবসানের। 
তখন কলকাতার অভিষিক্তা এলাকায় দু’কামরার ফ্ল্যাটে বসে টেলিভিশনে চোখ রেখেছিলেন একজন। তাঁর চোখে সেদিন জল ছিল না। ছিল আগুন! তিনি বঙ্গকন্যে জয়ন্তী মুখোপাধ্যায়। এক সময় ভারতীয় বাস্কেটবল ও ক্রিকেট দলের নিয়মিত খেলোয়াড়! 

কাট টু ১৯৬০
পরিবার বলতে তিন ভাই আর মা। ছোটোবেলায় বাবা মারা যান। ছোটো তিন ভাইকে বড়ো করার দায় অনেকটাই তাঁর কাঁধে ছিল। তাই ছোটোবেলায় খুব একটা খেলাধুলা করা হয়নি। তবে পাড়ার কেউ খেললে দাঁড়িয়ে পড়তেন। ভালোবাসতেন খেলাধুলা। ভাগ্য বদলাল চেতলায় মামারবাড়ি বেড়াতে এসে। সেখানে চোখে পড়ে গেলেন রাখী সংঘ ক্লাবের প্রেসিডেন্টের। জয়ন্তীর খেলার প্রতি আগ্রহ ও স্বাভাবিক প্রতিভা দেখে তাঁকে দলের বাস্কেটবল টিমে নিয়ে নেওয়া হয়। রাখী সংঘ তখন বাংলার হয়ে জাতীয় স্তরে প্লেয়ার পাঠাত। বাস্কেটবলে তাদের বেশ নামডাকও ছিল। জয়ন্তীকে মনে ধরে রাখী সংঘের ক্লাবকর্তা ও কোচদের। তিলে তিলে তৈরি করা হয় তাঁকে। জয়ন্তীও সব ভুলে খেলায় মনপ্রাণ সঁপে দেন। 
তাহলে তখন বাড়ির অবস্থা? তিন ভাই ও মায়ের অবস্থান? জানালেন জয়ন্তী নিজেই। ‘মাকে অনেক আত্মীয়, প্রতিবেশী বলেছিলেন, ‘মেয়েকে খেলায় দিয়েছ? মেয়েলিভাব চলে যাবে! বিয়ে হবে না!’ মা খুব শান্ত স্বভাবের ছিলেন। কারো কথা শোনেননি। আমাকে সমর্থন করেছেন। শুধু একবার সকলের কথায় খুব অতিষ্ঠ হয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘এ থেকে কি কিছু ভবিষ্যৎ আছে? যদি না থাকে, তাহলে আর খেলো না।’ মাকে কথা দিয়েছিলাম, বাড়ির দুঃখ ঘোচাব। সেটা করতে পেরেছি।’ 
কীভাবে করলেন, তা জানতে গেলে আবার ফিরতে হবে রাখী সংঘের মাঠে। ১৯৬৩-তেই রাজ্যদলের হয়ে খেলার সুযোগ পেলেন জয়ন্তী। কটকে খেলা। সেবছরই চ্যাম্পিয়ন বাংলা! তখন জয়ন্তী ২০ বছরের তরুণী। মোট চারবার ন্যাশনাল খেলেছে জয়ন্তীদের বাংলা। তবে মেয়েদের খেলাধুলার অবস্থা তখন এখনকার মতো ছিল না। ভালো খেললে একটুআধটু নাম ও মেডেল জুটলেও, চাকরি হত না সহজে। জয়ন্তীও ততদিনে চাকরি খুঁজছেন। হাতে একটু টাকাপয়সা না থাকলে খেলা চালানোও যে দুষ্কর! এমন সময় কোনো এক টুর্নামেন্টে খেলা দেখতে এলেন স্টেট ব্যাংকের বড়কর্তাদের একাংশ। তাঁরা তখন মহিলা বাস্কেটবল টিম তৈরি করতে উদ্যত হয়েছে। মাঠে জয়ন্তীকে দেখে স্টেট ব্যাংকের কর্তারা তাঁকে টিমে নিতে মনস্থ করেন। রাতারাতি স্পোর্টস কোটায় ব্যাংকে চাকরি হয়ে গেল জয়ন্তীর। জানালেন, ‘কলকাতার মেইন ব্রাঞ্চে প্রায় ৩৯ বছর চাকরি করেছি। খেলেওছি তার সঙ্গে। যেদিন প্রথম চাকরি পেলাম, বাড়িতে গিয়ে মাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। বলেছিলাম, ‘তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, খেলে সব ঠিক করে দেব। আজ পেরেছি’।’

খেলার জগৎ
বাংলার বাস্কেটবলের তরুণী একসময় ডাক পেয়েছেন বাংলার ক্রিকেট দলেও। তখন তিনি নিয়মিত বাস্কেটবল খেলোয়াড়। বাংলা ও স্টেট ব্যাংকের হয়ে খেলছেন। ১৯৭৩-’৭৪ সালে বাংলায় মহিলা ক্রিকেট দল খোলার কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু তখন বাংলার বুকে আর ক’টা মেয়েই বা ক্রিকেট খেলে? তাই অন্যান্য খেলায় ভালো পারফর্ম করছেন, এমন মেয়েদের খুঁজে আনার দায়িত্বে ছিলেন বাংলার তৎকালীন কর্মকর্তারা। তাঁদেরই একজন ক্রিকেটার তপনজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়। ময়দান যাঁকে চেনে ‘টি জে ব্যানার্জি’ বলে। তিনিই জয়ন্তীকে ‘অফার’ দিলেন ক্রিকেট খেলার। ততদিনে বাংলা খুঁজে পেয়েছে শ্রীরূপা বসুকে। শ্রীরূপা আবার হকিও খেলেছেন। এই শ্রীরূপাকে তখন বলা হত বাংলার স্টার ক্রিকেটার। তাঁর অধিনায়কত্বেই বাংলা দলে সুযোগ পেলেন জয়ন্তী। তবে ভাবনা ছিল, একইসঙ্গে বাস্কেটবল ও ক্রিকেটের ন্যশনাল পড়লে কী করব? সমাধান বাতলেছিলেন বাংলার ক্লাবকর্তারা। তাঁরা জানান, এমনভাবে দুটো খেলা সাজানো হবে যাতে একটি অন্যের সঙ্গে ক্ল্যাশ না করে। শুরু হল ‘উইকেট কিপার ব্যাটার’ জয়ন্তীর জীবন। কিন্তু একসঙ্গে দুটো খেলা? সামলাতেন কী করে? বললেন, ‘নিজেকে ফিট রাখতাম, নানা নিয়মে চলতাম। শুরুর দিকে হাতে বেশি অর্থ ছিল না। তাই ভালো খাবার, জিম এসব কল্পনারও অতীত ছিল। তার মধ্যেই আমরা অনুশীলন করে করে নিজেদের প্রস্তুত রাখতাম। কোচের কথা শুনতাম। ওয়ার্ক আউটের বিকল্প হিসেবে বাড়ির কাজ করা খুব কাজে লাগত।’ কথা বলতে বলতে ফ্ল্যাটের বাইরে আকাশের দিকে তাকালেন জয়ন্তী। তাঁর চাহনিতে তৃপ্তি।

ব্যক্তিজীবনের ছোঁয়া
বাস্কেটবলে আট-ন’বার ন্যাশনাল খেলেছেন। প্রি এশিয়ান, ইউনিভার্সিটি ব্লু সব খেলেছেন। হয়েছেন চ্যাম্পিয়নওষ গোটা ভারত ঘুরে বেরিয়েছেন খেলার জন্য। ক্রিকেটও খেলেছেন সাতের দশকে। বিয়ে করেন ১৯৭১-এ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জমানায়। তারপরেও মাঠে গিয়েছেন নিয়মিত। প্র্যাকটিস চালিয়ে গিয়েছেন। বিয়ের পর স্বামী যেতেন খেলা দেখতে? প্রশ্নটা করেই তাকিয়েছিলাম পাশেই বসে থাকা সুভদ্র মানুষটির দিকে। যাঁর চোখে তখনও স্ত্রীকে নিয়ে সম্ভ্রম। মুচকি হাসলেন। উত্তর দিলেন জয়ন্তী নিজেই। হেসে বললেন, ‘বাড়ির ছোটো বউ আমি। ও খুব লাজুক ছিল। নিজেও স্টেট ব্যাংকে ছিল। ব্যাংকের খেলা দেখতে একবার মাঠে গিয়েছিল। আর যায়নি। তবে আমার খেলাকে খুব সমর্থন করত। ওর বাড়ির সকলেই ভালোবাসত আমাকে।’ কাছেপিঠেই একটু মেঘ ডেকে উঠল। এই ভালোবাসার আকালে কলকাতার আকাশ হঠাৎ মেঘলা হয়ে উঠল এই স্মৃতিমেদুরতায়। খেলোয়াড়ি বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পর আর খেলেননি জয়ন্তী। তবে মাঠ তাঁকে ছেড়ে যায়নি আজও। একসময় বাস্কেটবলে বাংলা দলের ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন দলে। বাংলা টিমের সঙ্গে বহু জায়গায় ম্যানেজারি করতে গিয়েছেন। এখনও ছোটোবেলার ক্লাবকে ভোলেননি। রাখী সংঘের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে এখনো রয়েছে জয়ন্তীর নাম।

স্বপ্নসন্ধান
অভিষিক্তার দু’কামরার ফ্ল্যাট, স্বামী, আত্মীয়স্বজন ও খেলার ক্লাব এই নিয়েই জয়ন্তীর জগৎ। সেখানে বাস্কেটবল কোর্টের ধুলো ও ক্রিকেটের পিচ অহরহ নিজেদের সঙ্গে কথা বলে। জয়ন্তী স্বপ্ন দেখেন এই দুই খেলাতেই বাংলার মেয়েরা বিশ্বজয় করবে। ঠিক যেমন এবার করলেন রিচা ঘোষ! 
মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ