কোন মন্ত্রে এই এক মাসে বেশ কিছুটা ওজন ঝরিয়ে ছিপছিপে হবেন? রইল টিপস!
কোন মন্ত্রে এই এক মাসে বেশ কিছুটা ওজন ঝরিয়ে ছিপছিপে হবেন? রইল টিপস!
আর দিনকয়েক বাদেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র জানিয়ে দেবেন আশ্বিনের শারদপ্রাতে আলোকমঞ্জির বেজে ওঠার কথা। দিকে দিকে বার্তা যাবে, দেবীপক্ষ প্রায় এসে গিয়েছে। সেই পুজোয় নিজেকে সাজিয়েগুছিয়ে রাখার চেষ্টা সকলেরই কমবেশি থাকে। নিজেকে নতুন করে মেলে ধরাও পুজোর আর এক দিক। পুজোয় আগে অনেকেই ওজন ঝরিয়ে একটু হালকা হতে চান। তাছাড়া পুজোর সময় নানা অনিয়ম হয়। বাইরে খাওয়াদাওয়া বা বাড়িতে হরেক রান্নার পরিমাণ বাড়ে। তাই খাওয়াদাওয়ার সময়, অনিয়ম সব মিলিয়েই ওজনের উপর প্রভাব পড়ে। তাই পুজোর আগে থেকেই নিজের শরীরকেও প্রস্তুত করতে হয় উৎসবে শামিল হওয়ার উপযোগী করে। এই একটি মাস একটু নিয়মে থাকলে মনের সঙ্গে শরীরও ফিট, আবার ইচ্ছামতো পোশাকেও ফ্যাশন কোশেন্ট ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ মিলবে ষোলোআনা। তাই পুজোর মুখে জিমে ভিড় লেগেই থাকে। না, জিমে যেতেই হবে এমন কথা বলছি না। বরং ঘরোয়া উপায়েই সহজে ওজন ঝরিয়ে ফিট থাকার সুলুকসন্ধান রইল আজ।
পুজোর ঠিক মাস খানেক আগে কোন কোন খাবার ডায়েটে রাখবেন, শরীরচর্চা কীভাবে করবেন, জানালেন ফিটনেস এক্সপার্ট ও ডায়েটিশিয়ান ডঃ সুমেধা সিং। তাঁর মতে, ‘পুজোর আগে জীবনে সামান্য কিছু নিয়ম যোগ করলেই কিছুটা ওজন ঝরবে, শরীরও সুস্থ থাকবে। নিজের মতো করে বা ইউ টিউব দেখে একেবারে ক্র্যাশ ডায়েট শুরু করে দিলে চলবে না। এই সময় অনেকেই হঠাৎ ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং শুরু করেন বা শুধুই তরল খাবার খেতে শুরু করেন। এতে ওজন ঝরে ঠিকই, কিন্তু এর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। কে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করতে পারবেন আর কে নয়, সেটির পরামর্শ দেবেন চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ান। তাই এক্সপেরিমেন্ট না করে কিছু বদল আনুন জীবনে।’
ফাস্ট ফুডে না: পুজোর সময় প্রচুর পেটপুজো হবে। তাই এই ক’টা দিন বাইরের খাবার, ফাস্ট ফুডকে ‘না’ বলুন। একান্তই বাইরে খেতে হলে সঙ্গে মাখনা, মশলাবিহীন বালিতে ভাজা চিঁড়ে, তেল ছাড়া মুড়িমাখা খান। অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার না খাওয়াই ভালো। রোল-চাউমিন, বিরিয়ানি, ভাজাভুজি, কেক-মিষ্টি, সফট ড্রিঙ্কস, চকোলেট এসব ক’টা দিন ডায়েট থেকে বাদ দেওয়াই ভালো।
সব কার্বস বাদ নয়: ওজন ঝরাতে গিয়ে অনেকেই কার্বোহাইড্রেট বাদ দিয়ে দেন। এই ভুল করবেন না। শরীরে সবকিছুর ভারসাম্য প্রয়োজন। তাই ওজন ঝরাতে চাইলে এক মাস জটিল কার্বহাইড্রেট-যুক্ত খাবার খান। যেমন ভাত বা সাদা পাউরুটির বদলে ব্রাউন ব্রেড, ওটস, ডালিয়া, আটার রুটি এসবের পরিমাণ বেশি রাখুন।
চিনির বদলে গুড় বা মধু নয়: চিনির চেয়ে গুড় বা মধুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স খুব কম নয়। তাই চিনির বদলে সেসব খেলেই যে খুব উপকার হবে, তা নয়। বরং রান্নায় চিনি দেওয়ার ঘরানা থাকলে সেটা রাতারাতি বদলের দরকার নেই, শুধু পরিমাণ কমিয়ে দিন। বরং অল্প করে স্টেভিয়া ব্যবহার করতে পারেন।
আলু কম খান: বাঙালির বহুল ব্যবহৃত ও সবচেয়ে জনপ্রিয় কোনও সব্জির কথা উঠলে সকলের আগে আসবে আলুর নাম। মাছের ঝোল, কচি পাঁঠা, বিরিয়ানি কিছুই বাদ যায় না আলুর মাহাত্ম্য থেকে। তবে পুজোর আগে এই একটা মাস নানা সব্জি ও তরিতরকারিতে আলু ব্যবহারে রাশ টানুন। তাই বলে আলুকে একেবারে বাদ দিয়ে দেওয়ার নিদান নেই, কেবল পরিমাণ কমিয়ে দিন।
তেলমশলা কম: বাঙালি বাড়ির রোজের রান্নাতেও একটু তেল-মশলার প্রচলন থাকে। তাই পুজোর আগে তেলমশলা একেবারে বাদ দিয়ে খাওয়ার কথা বলছি না। তবে তেল ও মশলা দু’টি ব্যবহারেই রাশ টানতে হবে। এই ক’টা দিন হালকা খাবার খান। সাদা তেল, চিজ, মাখন এড়িয়ে চলুন। বরং গুড ফ্যাট ঘি অল্প পরিমাণে রাখুন ডায়েটে। প্রতি সদস্য পিছু ৪০০-৫০০ মিলিলিটার তেলে মাস চালানোর চেষ্টা করুন। মাছ কড়া করে, তেলে চুবিয়ে না ভেজে, হালকা স্যতে করে রান্না করার পদ্ধতি
শিখে নিন।
লিফট নয় সিঁড়ি: নিয়মিত হয়তো লিফট ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু পুজোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে চাইলে এই ক’দিন লিফটের বদলে সিঁড়ি ভাঙুন। এতে পায়ের ও কোমরের কোর মাসলের জোর বাড়বে সঙ্গে ওজন ঝরতেও সাহায্য করবে এই অভ্যাস। যাঁদের হাঁটাহাঁটি করার মতো সময় হয় না, তাঁরা বরং অফিস থেকে ফেরার পথে কয়েকটা স্টপ আগে নেমে বাকি রাস্তা হেঁটে ফিরুন। হাঁটলে সুখী হরমোনের প্রভাবে মন ভালো হয়। শরীরও ভালো থাকে। ওজন থাকে নিয়ন্ত্রণে।
টুকটাক শরীরচর্চা: ভারী এক্সারসাইজ, জিম এসবে সময় দিতে না পারলেও অসুবিধা নেই। বাড়ির কিছু পরিশ্রমসাধ্য কাজ নিজের হাতে করুন। এতে ক্যালোরি বার্ন হবে। নিয়মিত সাঁতার, যোগাসন কিংবা হাঁটাহাঁটির অভ্যাস রপ্ত করতে পারলেও অনেক। হাঁটা ও জগিংয়ে সবচেয়ে দ্রুত ওজন ঝরে। অফিস বা বাড়িতে কাজের ফাঁকে চেয়ার থেকে উঠে কয়েক পা হেঁটে আসুন প্রতি ৪৫ মিনিট অন্তর। একটু ফ্রি হ্যান্ড বা স্ট্রেচিং করুন সময় সুযোগ মতো।
ফল খেলে ফল পাবেন: প্রতিদিন অন্তত ৫০ গ্রাম ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন। শসা কিন্তু কোনও ফল নয়, সব্জি। কাজেই রোজ শসা খেয়ে ভাববেন না, ফল খেলাম! বরং মরশুমি ফল, আপেল, পেয়ারা ইত্যাদি খান। ফল চিবিয়ে খান, রস করে নয়। প্রতিটা বড় মিল খাওয়ার আগে একটা করে ফল খান। তাতে অন্য খাবার কম খাবেন, খিদে কম পাবে।
জল খান: শরীরে কতটা জলের প্রয়োজন, যা জানাবেন চিকিৎসক। কিডনির অসুখ না থাকলে সাধারণত ৩-৪ লিটার জল প্রতিদিন বরাদ্দ রাখা উচিত। রোগা হতে চাইলে জল খাওয়ায় মন দিন।
ঘুমে ফাঁকি নয়: শুনতে অবাক লাগলেও ঘুমের সঙ্গেও শরীরের ক্যালোরি বার্ন হওয়ার যোগাযোগ রয়েছে। তাই পুজোর আগে এই একটি মাস ঘুমের আগে আর মোবাইল আসক্তি নয়। বরং প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
সাপ্লিমেন্টকে সাপ্লি দিন: পরীক্ষায় ফেল করলে তাকে বলে সাপ্লি পাওয়া। রোগা হওয়ার ঝোঁকে অনেকে সাপ্লিমেন্ট বা দ্রুত রোগা হওয়ার ক্যাপসুল ব্যবহার করেন। এতে কিন্তু রোগার চেয়ে রোগী হওয়ার শঙ্কা বেড়ে যায়। তাই সাপ্লিমেন্টকে সাপ্লি দিয়ে ফেল করিয়ে দেওয়াই ভালো। ওয়েট লিফটিংয়ের অভ্যাস না থাকলে অকারণে সাপিলমেন্ট খাবেন না। ওজন ঝরানোর কোনও শর্টকাট নেই। ৭০ শতাংশ ডায়েট ও ৩০ শতাংশ শরীরচর্চাই এর নেপথ্য নায়ক। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই অকারণে ক্যাপসুল বা সাপ্লিমেন্ট খেয়ে নিজের বিপদ ডাকবেন না।
অত ভাববেন না: ছোটখাট সব বিষয় নিয়েই অতিরিক্ত চিন্তা করার অভ্যাস থাকলে এবার তা বদলে ফেলুন। মন অন্যদিকে রাখুন। প্রয়োজনে মনোবিদের সাহায্য নিন। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় স্ট্রেস, দুশ্চিন্তা, স্বভাবগত টেনশন একেবারেই নয়।
জীবনের পালে কয়েকটা নিয়মের হাওয়া বদলে দিলেই পুজোর আগে আপনি বেশ কিছুটা ওজন ঝরিয়ে হালকা!
তা বলে জীবনকে হালকাভাবে নেবেন না যেন, বরং গাঢ় মৌতাতে জীবনের সব ওঠাপড়া উপভোগ করতে চাইলে সুস্থ শরীর ও প্রফুল্ল মন প্রয়োজন। তাই খেয়াল রাখুন নিজের। যত্নে রাখুন জীবন।
মনীষা মুখোপাধ্যায়