Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

বয়স্কদের আইনি অধিকার

কলকাতা নাকি এখন এক বিস্তৃত বৃদ্ধাশ্রম। না! এ কোনও গল্প কথা নয়। বিভিন্ন আলোচনায়, লেখায় বারেবারে ফিরে আসে এই বাক্য। আমাদের চারপাশও তাকে স্বীকৃতি দেয়।

বয়স্কদের আইনি অধিকার
  • ৩ মে, ২০২৫ ০৪:০০

নিজেদের আইনি অধিকার সম্পর্কে কতটা সচেতন প্রবীণরা? আলোচনায় আইনজীবী মিন্টু চক্রবর্তী।

Advertisement

 

কলকাতা নাকি এখন এক বিস্তৃত বৃদ্ধাশ্রম। না! এ কোনও গল্প কথা নয়। বিভিন্ন আলোচনায়, লেখায় বারেবারে ফিরে আসে এই বাক্য। আমাদের চারপাশও তাকে স্বীকৃতি দেয়। নতুন প্রজন্ম পেশার তাগিদে শহরের বাইরে। কেউ বা রাজ্য, দেশ ছেড়ে বিদেশে ডানা মেলেছেন। প্রবীণরা রয়ে গিয়েছেন স্মৃতি আগলে। শুধু কলকাতা নয়, গোটা রাজ্য বা দেশের নিরিখেই প্রবীণদের অসহায়তা নতুন নয়। কেউ সঙ্গীহীন। কারও বা চলছে দাম্পত্যের শেষাংশের দৌড়। সন্তানরা শহরে থাকলেও অনেক সময়ই বাবা, মায়ের সঙ্গে থাকেন না। কিন্তু তাঁদের প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য পালন কি হয় যথাযথ? অবসরের পর সন্তানের উপর নির্ভরশীল থাকার সময় আর্থিক সুযোগ সুবিধা থেকে কি তাঁরা বঞ্চিত? সব অর্থে পূর্ণ মর্যাদায় কি বেঁচে থাকতে পারেন প্রবীণ নাগরিকরা? ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু প্রবীণদের অবহেলার চিত্র কিছু কম নয়। তাঁরা কি নিজেদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন? 
আইনজীবী মিন্টু চক্রবর্তী জানালেন, ভারতীয় আইনে বিশেষ দু’টি আইন রয়েছে। বয়স্করা এই দুই আইনের পূর্ণ সহযোগিতা পেতে পারেন। প্রথমে আলোচনা করা যেতে পারে, পুরনো আইন, দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওর ১৯৭৩ আন্ডার সেকশন ১২৫ নিয়ে। যা বর্তমানে নতুন আইন অনুযায়ী, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা ২০২৩-এর আন্ডার সেকশন ১৪৪-এর সেকশনে আলোচনা করা হয়েছে কে বা কারা আর্থিক রক্ষণাবেক্ষণ পেতে সক্ষম। ১৪৪ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা  ধারার আওতায় ২০২৩-এর সাব সেকশন ওয়ান ক্লজ ডি-তে বলা হয়েছে, যেসব পিতা মাতা নিজের রক্ষণাবেক্ষণ করতে অসমর্থ, সন্তানরা যদি তাঁদের রক্ষণাবেক্ষণ না করেন, সেক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের সন্তানের বিরুদ্ধে নিজস্ব এলাকার বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁদের উপর অত্যাচারের তথ্য প্রমাণও প্রয়োজন। এবং তাঁরা যে আর্থিক অনটনে রয়েছেন, সেই তথ্য দরখাস্ত আকারে এবং সঠিক তথ্য প্রমাণ নিয়ে আবেদন করতে হবে। ভারপ্রাপ্ত বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট দুই পক্ষের বক্তব্য বিচার করে আবেদনকারীকে ভরণপোষণ (মেনটেন্যান্স) অর্ডার করেন। যদিও এক্ষেত্রে বিচার পেতে কিছুটা বেশি সময় লাগে। 
ভারতীয় সংবিধানে বয়স্ক নাগরিকদের জীবনযাপন নিশ্চিত করার বিষয়ে এবং তাঁদের ন্যূনতম সুবিধা পাওয়ার অধিকার নিয়ে নানা কথা রয়েছে। ভারতের প্রত্যেক প্রবীণ নাগরিকের মর্যাদাপূর্ণ ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রশাসন উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আইনজীবী জানালেন, কম সময়ে পিতা, মাতা ও বৃদ্ধ মানুষের আবেদন দ্রুত মেটানোর জন্য আবেদনকারী ‘দ্য মেনটেন্যান্স অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার অব পেরেন্টস অ্যান্ড সিনিয়র সিটিজেন অ্যাক্ট ২০০৭’-আইনে সেকশন সিক্স-এর আওতায় তাঁদের নিজস্ব এলাকা অথবা তাঁদের সন্তান যেখানে বসবাস করেন, সেই এলাকার ট্রাইবুনালের নির্ধারিত ট্রাইবুনাল অফিসারের কাছে সেকশন ফাইভের আওতায় আবেদন করতে পারেন। এই আইন ব্যবস্থায় বৃদ্ধ পিতা, মাতা যেমন আবেদন করতে পারেন, তেমন তাঁদের হয়ে অন্য কোনও ব্যক্তি বা সংস্থাও আবেদন করতে পারে। ট্রাইবুনাল অনেক ক্ষেত্রে সুয়ো মোটোও (স্বতঃপ্রণোদিতভাবে) এই অভিযোগ গ্রহণ করতে পারে। এই আইনে সেকশন ফাইভে সমস্যার দ্রুত সমাধান করার বিধানও দেওয়া রয়েছে। এই আইন ব্যবস্থায় সেকশন সিক্স-এর ট্রাইবুনালে বিশেষ ট্রাইবুনাল অফিসারকে বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সমগোত্রীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর দেওয়া অর্ডার অমান্য হলে পরোয়ানা জারি হতে পারে। তাছাড়া সেকশন ফাইভ অনুযায়ী যদি সন্তান ট্রাইবুনালের অর্ডার অমান্য করেন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে কারাবাসের রায়ও হতে পারে। 
এই নতুন আইনের সেকশন ২৩-এ আলোচনা করা হয়েছে কোনও ক্ষেত্রে বৃদ্ধ পিতা ও মাতা তাঁদের সম্পত্তি দান করার পরে যদি সন্তান নির্ধারিত দানপত্রে উল্লেখিত শর্ত মেনে না চলেন, তাহলে সেই দানকে কীভাবে ‘অকার্যকর হস্তান্তর’ বলা হবে। একটি উদাহরণ দিয়ে মিন্টু বলেন, ‘কিছুদিন আগে কলকাতা হাই কোর্টের মাননীয় বিচারপতি রাজা শেখর মান্থার রামপদ বসাক বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের একটি রিট মামলায় এক কালজয়ী অর্ডার দিয়েছেন। ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল ২১ অনুযায়ী বৃদ্ধ পিতা, মাতা সংবিধানে উল্লেখিত অধিকারের মাধ্যমে তাঁদের পুত্র, পুত্রবধূর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পেরেছেন। উল্লেখ্য, সেখানে পুত্র ও পুত্রবধূকে পিতা, মাতার বাড়িতে অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মামলাতেও ‘দ্য মেনটেন্যান্স অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার অব পেরেন্টস অ্যান্ড সিনিয়র সিটিজেন অ্যাক্ট ২০০৭’-আইন নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।’ 
বার্ধক্যকালীন সমস্যা গোটা পৃথিবী জুড়েই বাড়ছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ ১ অক্টোবর তারিখটিকে ‘বিশ্ব বয়স্ক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। কিন্তু বছরের একটি নির্দিষ্ট দিন নয়, বরং প্রতিটি দিনই যে প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ ভাবে জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে, তা যেন বাস্তবে অনেকাংশেই কার্যকর হয় না। প্রবীণদের জন্য আইন রয়েছে, কিন্তু তা জানেন ক’জন? সচেতনতার প্রয়োজন। আইনজীবীর মতে, সমস্যা হলে অবশ্যই পেশাদারি সাহায্য নিন। ‘দ্য মেনটেন্যান্স অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার অব পেরেন্টস অ্যান্ড সিনিয়র সিটিজেন অ্যাক্ট ২০০৭’-এর আওতায় বিচার হওয়া সম্ভব।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য

সম্পর্কিত সংবাদ