ঘরে ঢুকে শুধু জানালা খোলার অপেক্ষা। হাত বাড়ালেই যেন বিরাট এক চায়ের সাম্রাজ্য। আমরা রয়েছি ছোট্ট এক টিলায়। মাঝে একফালি রাস্তা। তার ওপারেই একের পর এক চা-পাহাড়ের সারি। উত্তরবঙ্গের ও কে টি এস্টেট বা গোল পাহাড় যেন এক অপার বিস্ময়। ঠিক করেছিলাম মিরিকের আশপাশে কোনও পাহাড়ি গ্রামে থাকব। প্রথম ঠাঁই ছিল কমলালেবুর গ্রাম তাবাকোশি। কিন্তু পরের গন্তব্য আর ঠিক করিনি। তাবাকোশিতে যাঁর হোমস্টেতে উঠেছিলাম তাঁকেই বললাম, ‘একটা ভালো জায়গা বেছে দিন।’ তিনি বললেন, ‘ও.কে টি। চোখ বন্ধ করে চলে যান।’
তিনিই বুকিংয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। গাড়ি ছুটল ও কে টি-র দিকে। মিরিক থেকে দার্জিলিং যাওয়ার এই পথ বড়ই সুন্দর। দু’পাশে পাইন বন, আর তারই পাশে ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে সবুজ চা-বাগান। রাস্তার প্রতিটা বাঁকই এক একটা ভিউ পয়েন্ট। গোপালধারা টি-এস্টেটের কাছে আসতেই ছবিটা বদলে গেল। গোলগোল এক একটা চা-পাহাড়। সোজা পথে চলতে চলতে গাড়ি হঠাৎই বাঁক নিল। বুঝলাম গন্তব্য এসে গিয়েছে। পাথুরে রাস্তায় গাড়িটা একটু উঠেই দাঁড়াল একটা বাড়ির সামনে। এটাই আমাদের আগামী দু’দিনের ঠিকানা। বাড়ির সামনে একটা প্রশস্ত লন। দিগন্ত বিস্তৃত চা-বাগানের ছোট্ট ছোট্ট পাহাড়। গাড়ি থামতেই একমুখ হাসি নিয়ে হাজির হোমস্টের মালিক মনোজ তামাং। বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই এসে গেল দার্জিলিং চা। আসার পথে ফোনে কয়েকবার মনোজজির সঙ্গে কথা হয়েছিল।
গোটা বাড়িটাই পাইন কাঠের তৈরি। বাড়ির প্রত্যেকটি কোণায় নান্দনিকতার ছোঁয়া। ওপেন কিচেন। যদিও এখানে রান্না হয় না। রান্না হয় মনোজজির নিজের ঘরে।
আমাদের পৌঁছাতে দুপুর হয়ে গিয়েছিল। একটু ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় আসতেই দেখলাম টেবিল সাজানোর তোড়জোড় চলছে। মনোজজির স্ত্রী ও শ্যালিকা বেশ নিষ্ঠা সহকারে কাঁসার থালা বাটি গ্লাসে আমাদের খাবার পরিবেশন করলেন। ভাত, রাইশাক, আলুভাজা, স্কোয়াশের সব্জি, ডিমের কারি, আচার ও আলুর পাঁপড়।
পাহাড়ে বেড়াতে এসে সূর্যের আলো থাকতে থাকতেই যতটা সম্ভব ঘুরে নিতে হয়। কয়েক পা যেতেই চোখে পড়ল গভীর খাদ। জঙ্গলে পরিপূর্ণ। রোদের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে। স্থানীয় এক নেপালি মহিলা তাঁর নিজের অর্কিডের বাগানে বসে রোদে চুল শুকাচ্ছিলেন। আমরা যেতেই অভ্যর্থনা জানালেন। আমরা তাঁর অর্কিড কালেকশনের প্রশংসা করলাম। পিসিমণি দেখলাম ওই মহিলাকে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করার জন্য উসখুস করছে। আমি গ্রিন সিগন্যাল দিতেই পিসিমণি ভয়ঙ্কর হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করল, ‘ইধার চিতাবাঘ আছে?’ মহিলাও হাসিমুখে উত্তর দিলেন, ‘হাঁ। লেপার্ড হ্যায় তো। রাতমে আতা হ্যায় উস জঙ্গলসে। বকরি, কুত্তা লে যাতা হ্যায়।’ মহিলার কথা শুনে পিসিমণির মুখ শুকনো হয়ে গেল।
সেখান থেকে কয়েক হাত দূরেই রয়েছে এক বৌদ্ধ মনাস্ট্রি। যদিও সেটির কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। তারই মধ্যে একটি ঘরে ভগবান তথাগত অবস্থান করছেন। কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষুককে পড়াশোনা করতে দেখলাম।
ফিরে দেখি মনোজজি সন্ধে দিচ্ছেন। ওদিকে চা আর স্ন্যাক্সও রেডি। দিনের আলো নিভতে না নিভতেই ঠান্ডার দাপট বাড়তে লাগল। মনোজজি সব ঘরে একটা করে রুম-হিটার দিয়ে গেলেন। গরমাগরম চা আর সর্ষে ও রাইশাকের বড়া দিয়ে সন্ধের টিফিন জমে গেল।
রাত তখন প্রায় তিনটে। চোখে ঘুমের রেশ মাত্র নেই। কাজেই কাউকে কিছু না বলে কর্তার সঙ্গে চুপিচুপি ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়লাম। কনকনে হিমেল হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগল আমাদের চোখেমুখে। আকাশে তখন জ্বলজ্বল করছে শুকতারা আর শুক্লা পঞ্চমীর চাঁদ। বনজ্যোৎস্নায় সবুজ অন্ধকারে সেই পাহাড়ি উপত্যকাকে মনে হচ্ছে এক কল্পলোকের জগৎ। হিমালয়কে বলা হয় দেবভূমি। ব্রহ্ম মুহূর্তে হিমালয়ের সেই নৈসর্গিক দৃশ্য আমাদের অভিভূত করে তুলছিল। কিন্তু এমন সময় দেখি কালো লোমশ কোনও কিছু হঠাৎ আমাদের গায়ে উঠতে চাইছে। আমরা ‘মাগো’,‘বাবাগো’ বলে জোর চিৎকার শুরু করি। ভয়ের চোটে হার্ট ফেল হওয়ার জোগাড়। আমাদের চেঁচামেচিতে বাকিরাও উঠে পড়েছে। টর্চের আলোয় দেখি তার দুটো চোখ জ্বলছে। না, হিমালয়ান লেপার্ড নয়। মনোজজির পোষা কুকুর ভুলু; কালো লোমওয়ালা এক কুকুর। তার সঙ্গে সকালেই আমাদের ভাব হয়েছিল। ভুলু খুব আদুরে। তাকে প্রশ্রয় দিতেই সে ঘরের ভেতর এসে হাজির। অবশেষে অনেক খুঁজে দুটো বিস্কুট দিতে তবে নিষ্কৃতি পাওয়া গেল।
আর ঘুম হল না। সবাই মিলে ভোরের রূপ উপভোগ করলাম। আকাশে তখন ঊষার রং লেগেছে। মনোজজি আমাদের বললেন চা-বাগানে যেতে। আজ আকাশ পরিষ্কার। খুব ভালো কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাবে। আমরাও তড়িঘড়ি সামনের চা-পাহাড়ে উঠতে লাগলাম। মনোজজি দূর থেকে চিৎকার করে হিন্দিতে বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন। সূর্যের প্রথম আলো আগে কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপরে পড়বে।’ আমরা চা-বাগানের একেবারে মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছি। কাঞ্চনজঙ্ঘার অনেকগুলো রেঞ্জই দেখা যাচ্ছে। তার শরীরে তখনও অরুণ আলোর রেণু লাগেনি। সে তখন তুষারশুভ্র ধ্যানমগ্ন কোনও ঋষি। তারপর পূব আকাশে লাল রঙের ছিটে লাগল। সেই রং গিয়ে পড়ল কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর। সেই মুহূর্তের রূপ বর্ণনা করা অসম্ভব। একের পর এক চূড়াগুলো রূপোর মুকুট খুলে সোনার মুকুট পরছে। তারপর দিগন্ত আলোকিত করে সেই সবুজ পাহাড়ের কোল থেকে সূর্যোদয় হল। প্রকৃতির এই রূপ দেখে সকলেরই মন ভরে গেল।
প্রাতরাশ সেরেই আমরা বেরিয়ে গেলাম গোল পাহাড়ের উদ্দেশে। মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটাপথ। তারপরেই প্রকৃতির অনন্ত স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ। চারদিকে উঁচু-নিচু গোল গোল চা-পাহাড়। আর তার মাঝে মাঝে বেশ কয়েকটা পাইন গাছের সারি। মাথার ওপর ঝকঝকে নীল আকাশ। গোল পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেকে মনে হবে, সেই অনন্ত সবুজ সাম্রাজ্যের অধীশ্বর।
বিকেলে সামনের সেই মনাস্ট্রিতে গেলাম। সেখানে এক তরুণ বৌদ্ধ ভিক্ষুর সঙ্গে পরিচয় হল। ছেলেটির বয়স আঠারো। এই বয়সেই ছেলেটির যা জীবনদর্শন, তার কাছে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। এবার ফেরার পালা। মন ভারাক্রান্ত। তাও খুব সকালে উঠে ছাদে গেলাম। ভোরবেলায় চা-বাগান দেখতে দারুণ লাগছিল। ভাবছিলাম আরও কিছুদিন এই হিমালয়ে মনোজজি বাংলোয় থাকলে মন্দ হয় না। জীবনের এক এক বাঁকে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয় যাদের ভোলা যায় না।
ডঃ অন্তরা চৌধুরি