শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের দিনগুলি কেমন ছিল? লিখছেন বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী তথা গায়িকা পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়।
শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের দিনগুলি কেমন ছিল? লিখছেন বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী তথা গায়িকা পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়।
মার শৈশব কেটেছে আসানসোলে। চিত্তরঞ্জনে থাকতাম আমরা। সেই সময় দোলযাত্রা একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। মনে আছে, জলের মধ্যে বাঁদুড়ে রং মেশাতাম। পিচকিরিতে ভরে সেই রং ছুড়তাম লোকজনের গায়ে। বন্ধুরা মিলে হইহই করে, ভূত সেজে খেলা চলত। এখন সেই দিনের কথা ভাবলে মজা লাগে। হাসিও পায়।
উচ্চ মাধ্যমিকের পর বিশ্বভারতীতে ভর্তি হওয়া। দোলের অভিজ্ঞতা ১৮০ ডিগ্রি পাল্টে গেল। প্রথমেই যেটা অবাক করেছিল, ওখানে কোনো রঙের ব্যবহার হয় না। আবির খেলে সকলে। সেটাও প্রাকৃতিক আবির। আমি কখনো ভাবিনি বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করব। ভেবেছিলাম কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়ব। তবে আমার মা-বাবা গান নিয়ে পড়াশোনা করতে বলেছিলেন। এখন সেটাই আমার কেরিয়ার গড়ে দিয়েছে। এর জন্য মা-বাবার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। সেই সময় দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফর্ম তুলেছিলাম। বিশ্বভারতী আর রবীন্দ্রভারতী। বিশ্বভারতীতে পড়ার সুযোগ এল। ভর্তি হলাম।
বিশ্বভারতীতে দোল কাটানো প্রতেকটা মানুষের স্বপ্ন থাকে। আমারও ছিল। তবে ওখানে ছাত্রী হিসেবে বসন্তোৎসবের সাক্ষী থাকতে পারব, এই ভাবনাটাই স্বপ্নের মতো। সেই ভাবনাই পূরণ হল প্রথমবার। আজও মনের মধ্যে গেঁথে রয়েছে স্মৃতিগুলি। চিরজীবন থাকবে। আমরা কলাভবনের ছাত্রছাত্রীরা ফুলের রেণু দিয়ে আবির তৈরি করতাম। আমাদের সঙ্গে পাঠভবনের পড়ুয়ারাও থাকত। এখনও বোধহয় সেই রীতিটা রয়েছে। যদিও এখন কী হয়, সেটা বলতে পারব না। বহু বছর হয়ে গিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে গিয়েছি। তবে ওখানে কাটানো প্রতিটা দিন থেকে গিয়েছে আমার সঙ্গে। ছবির মতো। স্মৃতির কোলাজ উলটে দেখলে মনে হয় সময়টা কতখানি স্পেশাল ছিল।
বসন্তোৎসবের থেকেও আরও বেশি আকর্ষণীয় ছিল তার আগের মহড়াটা। আনন্দ পাঠশালার ছোটো ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে প্র্যাকটিস করত। ‘ওরে গৃহবাসী’ গানের কয়েক হাজার বার অনুশীলন হত। বাচ্চাগুলোর মহড়া দেখতে এত মিষ্টি লাগত। ওদের পর বড়োদের অনুশীলন শুরু হত। মহড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে কত গল্প করতাম! সমস্ত বসন্ত পর্যায়ের গান গাওয়া হত। মহড়া শুরু হত দিন পনেরো আগে। দোলের আগের দিন বৈতালিক হয়। তার জন্য আলাদা করে গান বাছতে হত। সকলে মিলে গাইতাম ‘আজি যত তারা তব আকাশে’। সকালবেলা মন্দিরে ঘণ্টা পড়ত। তারপর শুরু হত ‘ওরে গৃহবাসী’। ওইদিনটা সকলকে কী সুন্দর দেখাত! সৌন্দর্যের আলাদা করে কোনো মাপকাঠি রয়েছে বলে আমি মনে করি না। ওই একটা দিন সকলকে কী অপূর্ব দেখতে লাগত। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া, শিক্ষক, অধ্যাপকরাই নন, যাঁরা বাইরে থেকে আসতেন, তাঁদেরও খুব ভালো লাগত দেখতে। সুন্দর করে সেজে সকলে মিলে দোলের উদ্যাপন। শিমুল, পলাশের মাঝে মনোরম পরিবেশে রঙের উৎসবে মেতে উঠতেন সবাই। দেখে মনে হত, ‘একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’!
আমি গানের পাশাপাশি নাচের সুযোগও পেয়েছিলাম। যত দূর মনে পড়ছে, দু’বার। একবার ‘বসন্তে ফুল গাঁথল’, আরেকবার ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’। যতক্ষণ না অনুষ্ঠান শেষ হচ্ছে আমরা কেউ রং খেলতাম না। এটাই ওখানে নিয়ম। ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’ আমাদের শেষ গান। ওটার শেষে সকলে মিলে আকাশের দিকে রং ছুড়তাম। তারপর শুরু হত রং মাখানো। ওখানে অনুমতি না নিয়ে কাউকে রং মাখানো হয় না। কাউকে রং মাখানোর আগে জিজ্ঞাসা করতাম। তিনি অনুমতি দিলে, তবেই মাখাতাম। এবং সেটাও ভীষণ আলতোভাবে। কনসেন্ট বা অনুমতি যে কতখানি জরুরি বিষয়, আমরা তখন থেকেই শিখে গিয়েছিলাম।
আমরা যখন বিশ্বভারতীর ছাত্রী, তখন তো স্বর্ণালী সময়। বাইরের মানুষও বসন্তোৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতেন। তখনও দোলের সময় ঠান্ডা থাকত। ভোর তিনটে থেকে আমাদের হস্টেলের সামনে ভিড় জমতে শুরু করত। অত ভোরে হেঁটে হেঁটে আসতেন সবাই। মাঠের বাইরে জায়গা নিয়ে রাখতেন, যাতে সামনে থেকে অনুষ্ঠান দেখতে পান। ২০১৯ সালের পর থেকে আর এই দৃশ্যটা দেখা যায় না। সে বছরই শেষবার আশ্রম মাঠে বসন্তোৎসব হয়। আমরা সে বছর ছিলাম ওখানে। মনে আছে, প্রচণ্ড ভিড় হয়ে গিয়েছিল। গোটা শান্তিনিকেতন, বোলপুর ভিড়ে ঠাসা। আসলে ওই বছর প্রচুর মানুষের সমাগম হয় ওখানে। শহরটা খুব ছোটো। অত ভিড় সামলানো সম্ভব হয়নি। অনেক ঘটনাও ঘটে গিয়েছিল। অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ারও জায়গা ছিল না। তারপর করোনাকাল। সম্ভবত ২০২১ সাল থেকে বিশ্বভারতীর তৎকালীন উপাচার্য সিদ্ধান্ত নিলেন, দোলের দিন বসন্তোৎসব হবে না। তার পরিবর্তে অন্যদিন বসন্তোৎসবের আয়োজন করা হবে। আর এই উৎসবে কেবল বিশ্বভারতীর পড়ুয়া, শিক্ষকরাই অংশ নিতে পারবেন। বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আমার মনে হয় না, এই নিয়মটা শিথিল হওয়া উচিত। কারণ ওই ভয়াবহ পরিস্থিতির সাক্ষী আমরা। আর ছাত্রাবস্থাতেও দেখতাম, বসন্তোৎসবের পর গোটা এলাকা খুব নোংরা হয়। সকলে মিলে চাইলেই কিন্তু এই নোংরা হওয়াটা আটকানো সম্ভব। কিন্তু কে কার কথা ভাবেন! আমরা যখন পড়তাম, তখন আমাদের পরিষ্কার করতে হত। প্রতি বছর ১০ মার্চ বিশ্বভারতীতে গান্ধী পুণ্যাহ উদ্যাপিত হয়। ছাতিমতলা, উপাসনা গৃহ সংলগ্ন অঞ্চল পরিষ্কার করতে হত ঐতিহ্য মেনে। তাই পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব শিখে গিয়েছিলাম। ফলে বসন্তোৎসবের পরের দিন যখন দেখতাম, গোটা এলাকা নোংরা হয়ে রয়েছে, ভীষণ কষ্ট হত! সকলের উপর খুব চাপ পড়ত। আমি চাই না, যে অসুবিধাটা ভোগ করেছি, জুনিয়ররাও সেই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হোক।
তবে এই অসুবিধাগুলি কখনোই আমার ভালো স্মৃতিগুলিকে ছাপিয়ে যাবে না। ওই আনন্দ, খুশি, মজা আর শিল্পচর্চার মুহূর্তগুলিই মুখ্য। পাঁচটা বছর কেটেছে বিশ্বভারতীতে। আমি ভীষণ গর্ববোধ করি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে। বসন্ত উৎসবে অংশ নিতে পেরেছি বলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি ভীষণ গেছো ছিলাম। ফুল তুলতাম। মালা গেঁথে নিজেই পরে বসে থাকতাম। আমাদের তো গাছ থেকে ফুল তোলা নিষেধ ছিল। তাই মাটিতে পড়ে থাকা ফুল দিয়েই সাজতাম। আমার এমন একটা ছবি রয়েছে। দোলের সময়ই তোলা।
বিশ্বভারতীর অধ্যাপকদের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ রয়েছে। দেখলে প্রণাম করি। মাঝেমাঝে ভীষণ ইচ্ছে করে আবার ওই দিনগুলিতে ফিরে যাই আগের বন্ধুদের সঙ্গে। আবার মহড়া দেব বসন্ত উৎসবের। একসঙ্গে অনেক গল্প করব। সময় কাটাব।
এখন তো দোলের সময়টা দর্শককে আনন্দ দিতে দিতেই কেটে যায়। তবে আমি যখন স্টেজ করি, কথা বলি, আমার শিল্পীসত্তা, আমার কাজ, আমার প্রাপ্তির খুশি, না পাওয়ার যন্ত্রণা... সবকিছুই বাঁধা রয়েছে র শান্তিনিকেতনের মাটির তালে।
বসন্ত উৎসবের উদ্যাপনে।