Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

সন্তানকে স্বাধীনতা দিন

শিশুকে বড়ো করে তোলার নিয়মগুলো এখন অনেকটা বদলে গিয়েছে। চাইল্ড সাইকোলজিস্টরা বলেন শিশুকে নাকি ছোটো থেকেই স্বাধীনতা দেওয়া দরকার। তাতে তার ব্যক্তিত্ব বিকশিত হবে। তবে এই স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই প্রশ্রয়ের আকার ধারণ না করে সেটাও দেখা দরকার। কতটা স্বাধীনতা দেবেন বাচ্চাকে? জানালেন মনোবিদ শ্রেয়সী চট্টোপাধ্যায়।

সন্তানকে স্বাধীনতা দিন
  • ১৪ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শিশুকে বড়ো করে তোলার নিয়মগুলো এখন অনেকটা বদলে গিয়েছে। চাইল্ড সাইকোলজিস্টরা বলেন শিশুকে নাকি ছোটো থেকেই স্বাধীনতা দেওয়া দরকার। তাতে তার ব্যক্তিত্ব বিকশিত হবে। তবে এই স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই প্রশ্রয়ের আকার ধারণ না করে সেটাও দেখা দরকার। কতটা স্বাধীনতা দেবেন বাচ্চাকে? জানালেন মনোবিদ শ্রেয়সী চট্টোপাধ্যায়। 

Advertisement

 ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলুন 
ছোটো বয়স থেকেই শিশুর ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা দরকার। সে নিজের ইচ্ছেগুলোকে একটু একটু করে প্রয়োগ করতে শিখুক। তখন তার নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে। তাতে শিশুর মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোষগুলো কাজ করতে শুরু করবে। মোটামুটি বছর তিনেক বয়স থেকেই শিশুর দৈনন্দিন বিষয়গুলো নিয়ে তার মতামত নিন। একটা উদাহরণ দিলেন মনোবিদ, ‘ধরুন কোথাও বেড়াতে যাবেন। বাচ্চার সামনে দু’টি রঙের দুই ধরনের পোশাক নিয়ে এসে তাকে বেছে নিতে দিন নিজের পছন্দসই পোশাকটি। একইসঙ্গে তাকে এটাও বুঝিয়ে দিন যে ওই দু’টি পোশাকের মধ্যে থেকেই তাকে একটা পছন্দ করে নিতে হবে। একইভাবে শিশুর খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে দু’ থেকে তিন রকমের খাবার দিয়ে তাকে নিজের পছন্দসই খাবারটি বেছে নিতে বলুন। এতে শিশু নিজেকে পরিবারের সদস্য হিসেবে ভাবতে শিখবে এবং নিজের মতামতের একটা গুরুত্ব আছে জানলে সে একটু ভেবেচিন্তে মত দেবে।’ এর মাধ্যমে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়বে। তাতে শিশু আর একটু বড়ো হলে তার মধ্যে একটা সহজাত সমস্যা নিবারণ বা প্রবলেম সলভিং স্কিল তৈরি হবে। 

 কতটা স্বাধীনতা দেবেন?
শিশুর স্বাধীনতার মাপকাঠি ঠিক কী হবে সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করলেন শ্রেয়সী। তাঁর মতে, শিশুর বয়সের উপর নির্ভর করবে তাকে কতটা স্বাধীনতা দেওয়া হবে। বয়সের উপর মানসিক ম্যাচিওরিটি নির্ভর করে। এবং সেই অনুযায়ী তাকে স্বাধীনতা দিতে হবে। অর্থাৎ স্বাধীনতা যখন দিচ্ছেন তখন তার কাজে কী ফল হতে পারে সেটাও তার সঙ্গে আলোচনা করে নিন। প্রতিটি কাজেরই যে একটা ফল থাকে সেটা বুঝিয়ে দিন। বাচ্চার মস্তিষ্কের ক্ষমতা যেমন বাড়বে তার স্বাধীনতার মাত্রাও তেমন হারেই বাড়াতে হবে। শ্রেয়সী বললেন, ‘সন্তানের যখন বারো বছর বয়স, তখন সে যদি বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও যেতে চায়, তাহলে তাকে যেতে দিন। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু নিয়মও বেঁধে দিন। যেমন বাড়ি ফেরার সময় নির্দিষ্ট করে দিন। একা কোথাও চলে যেন না যায় সেটা বুঝিয়ে দিন। এবং এই সবই যে একটা কারণে করছেন সেটাও জানিয়ে দিন।’ একই সঙ্গে সন্তান যখন অন্যায্য কিছু চাইবে তখন তাকে বারণ করলেও কারণটা তাকে বুঝিয়ে দিন। একটা আলোচনার মাধ্যমে তাকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নিতে দিন। তাহলেই দেখবেন আপনার শিশু নিজের গণ্ডি সম্পর্কে সচেতন হয়ে যাবে। সন্তানকে স্বাধীনতা দিলে তাকে একইসঙ্গে বুঝিয়ে দেবেন যে সেই স্বাধীনতাগুলোর পাশাপাশি কিছু দায়িত্বও তার উপর বর্তায়। একটা উদাহরণ দিলেন মনোবিদ। ‘ধরুন রোদ থেকে ফিরেই ঠান্ডা জল খেতে চাইছে আপনার সন্তান। তাহলে তাকে বকে বারণ করার চেয়ে বরং তাকে বলুন যে খেতেই পারে, কিন্তু তাতে গলা ব্যথা ও জ্বরের সম্ভাবনা প্রবল। দেখবেন সে নিজেই তখন আর সেই কাজটা করবে না। হয়তো স্কুলের কোনো বন্ধুর পেনসিল বা রবার নিয়ে এল আপনার সন্তান। তখনও তাকে বুঝিয়ে দিন এই কাজটা ঠিক নয়। অন্যের জিনিস না বলে নিলে সেটা চুরি করা হয়। এই ছোটো জিনিসগুলো অল্প অল্প করে আপনার সন্তানকে বোঝাতে থাকুন। তাহলেই দেখবেন সে নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো ভেবেচিন্তে নিচ্ছে। এবং স্বাধীনতার অপব্যবহার করছে না।’

 দায়িত্ব দিন সন্তানকে
স্বাধীনতার পাশাপাশি সন্তানকে কিছু দায়িত্বও দিতে হবে। এবং কোন বয়সে কী দায়িত্ব সন্তানকে দেবেন সেটাও বাবা মাকেই ঠিক করতে হবে। যেমন সন্তান যখন খেলনা নিয়ে খেলছে, সারা ঘর ছড়াচ্ছে তখন তাকে বলুন খেলা হয়ে গেলে গুছিয়ে রাখার দায়িত্বও তারই। যদি সে গুছিয়ে না রাখে এবং খেলনা হারিয়ে যায় তাহলে তাকে না বকে বরং বোঝান কেন খেলনা হারাল? একইভাবে বই খাতার যত্নও তাকে অল্প বয়স থেকেই নিতে শেখান। এইভাবে সে যেমন স্বাধীনতাও পাচ্ছে, পাশাপাশি দায়িত্ববোধও জন্মাচ্ছে তার মধ্যে। সন্তানের বেখেয়ালে যদি খেলনা হারিয়ে যায় তাহলে সেই খেলনার জন্য বায়না করলেও আর একটা কিনে দেবেন না। তবেই সে খেলনার গুরুত্ব বুঝবে, নিজের মধ্যে তা রক্ষণাবেক্ষণ করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে জন্মাবে। এই ধরনের ব্যবহারগত শিক্ষাগুলো যদি প্রথম থে঩কেই বাচ্চাকে দেওয়া যায় তাহলে আর তার আচরণ হাতের বাইরে চলে যাবে না। বরং বাবা মা ও সন্তানের মধ্যে একটা বোঝাপড়া তৈরি হবে। বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে।

 প্রসঙ্গ টিনএজ
বয়ঃসন্ধির সময় বাচ্চাদের একটা হরমোনাল চেঞ্জ হয়। সেই কারণেই তাদের ব্যবহারগত কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। অনেক সন্তান এই সময় অতিরিক্ত বেপরোয়া আচরণ করতে থাকে। বাবা মা বিরক্ত হয়ে তাকে শাসন করেন, বকেন কিন্তু বিশেষ লাভ হয় না। বাচ্চাকে যদি ছোটো থেকেই কিছু স্বাধীনতা দিয়ে বড়ো করা যায় তাহলে এই সমস্যাগুলো অনেক কম তৈরি হয়। সন্তানকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে বাবা মা তার প্রতিপক্ষ নয়। বরং তার জীবনের যে লক্ষ্য তাতে পৌঁছনোর জন্য বাবা মা-ই তাকে সাহায্য করবে। ফলে তাকে বাবা মায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং সঙ্গে কাজ করতে হবে। সে যদি বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে চায়, করুক। কিন্তু পাশাপাশি তার পড়াশোনাও তাকেই করতে হবে। সে যদি একা বেড়াতে যেতে চায় যাক, কিন্তু একটা সময়ের মধ্যে তাকে বাড়ি ফিরতে হবে। রাত করে বাড়ি ফেরার সমস্যাগুলো তার সঙ্গে আলোচনা করুন। এইভাবে বাবা মা ও সন্তানের মধ্যে একে অপরকে সমর্থন করার প্রবণতা বাড়বে। অযথা শাসন করে লাভ হয় না। বরং বোঝালে পরিস্থিতি সহজে সামলানো যায়। কিছু নিয়ম থাক, পাশাপাশি কিছু স্বাধীনতাও দিন সন্তানকে। দেখবেন আপনার সন্তান নিজের স্বাধীনতার সঠিকভাবে প্রয়োগ করে ব্যক্তিত্বপূর্ণ তারুণ্যে পৌঁছে যাবে। 
কমলিনী চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ