ঘটনা ১: মেয়েটিকে মাত্র এক বছর বয়সে দাদু-দিদার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল বাবা মা। ভাই হবে বলে। কিন্তু দাদুর কাছে অত্যাচারের শেষ ছিল না মেয়েটির। গায়ে হাত তুলতে ছাড়তেন না দাদামশাই, দিদিমা। মামারাও চড় থাপ্পড় মারত যখন তখন। মারধর অসহ্য হয়ে উঠলে বাবার কাছে ফিরিয়ে আনা হয় মেয়েকে। কিন্তু তার ভয় কাটতে সময় লেগেছিল বহু বছর।
ঘটনা ২: তারা ছিল চার বোন। সবাই বাবার হাতে মার খেয়েছে যখন তখন। এই নিয়ে প্রতিবাদ করলে প্রহারের মাত্রা বেড়েছে দ্বিগুণ। বাবার ভয়ে মাও ছিলেন চুপচাপ। বাবার অবর্তমানে বাচ্চাদের শুশ্রূষা করা ছাড়া আর কোনও প্রতিকার তিনি করতে পারেননি। একটু বড় হওয়ার পর বাড়ি থেকে পালিয়ে বেঁচেছিল সকলেই।
ঘটনা ৩: বিয়ের আগে মেয়ের গায়ে কেউ হাত তোলেনি কখনও। বাবা মায়ের পছন্দে বিয়ে হল মেয়েটির। তারপর স্বামীর হাতে অত্যাচার। স্বামী শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে লাঞ্ছিত কন্যা যখন বেরিয়ে আসতে চাইল তখনই অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন বাবা। মারধর করে মেয়েকে বাধ্য করলেন শ্বশুরবাড়ি ফিরে যেতে। সে অবশ্য বেছে নিল স্বনির্ভরতার পথ। এগুলো কোনওটাই বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া রোজকার ঘটনা। এখানে যাদের কথা বলা হয়েছে, নাম প্রকাশে সকলেই অনিচ্ছুক। কিন্তু তারা সকলেই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। জীবনের লাগাম নিজের হাতে নিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এমনটা যে সব সময় ঘটে, তাও তো নয়। অত্যাচারিত মেয়েরা সমাজের গভীর অন্তরালে জীবন জলাঞ্জলি দেয় প্রতিনিয়ত। এই অত্যাচার ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কথায় সরব সেচ্ছাসেবী সংস্থা স্বয়ম।
পারিবারিক হিংসা বিষয়ে আলোচনা হলে মূলত মেয়েদের বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচার, স্বামীর কাছে অত্যাচার ইত্যাদিই উঠে আসে। কিন্তু সেটাই সম্পূর্ণ চিত্র নয়। বাপের বাড়িতে, আত্মীয়র কাছে, বাবা মায়ের কাছেও কন্যাসন্তান অত্যাচারিত হয়। আমরা লোকলজ্জার ভয়ে তা বলতে পারি না। এমনই কিছু মহিলা যাঁরা এই ধরনের অত্যাচারের শিকার হয়েছেন তাঁদের নিয়েই এই কর্মশালার আয়োজন করেছিল স্বয়ম। সংস্থার তরফে বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানসিক শক্তি মেয়েদের এক বিরাট গুণ। শান্ত স্বভাবের ভেতরেও যে আগুন জ্বলতে পারে তা মেয়েরা তাদের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে চলেছে। প্রতিবাদ থামিয়ে দিলে চলবে না। সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। নাহলে সমাজ আমাদের পেয়ে বসবে। সবচেয়ে বড় প্রতিকার অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা। সমীক্ষার মাধ্যমে দেখা গিয়েছে, যেসব মহিলা অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর তাদের মনের জোরও বেশি। ফলে সামান্য হলেও, নিজের পায়ে দাঁড়ানো, স্বাবলম্বী হওয়া খুবই জরুরি।