Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

রেস্তরাঁ ব্যবসায় মেয়েরা

যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। রান্নার প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাই বেশ কিছু মহিলা শুরু করেছেন রেস্তরাঁর ব্যবসা। কেমন তাঁদের অভিজ্ঞতা? সঙ্গে রইল তাঁদের পছন্দের রেসিপি।

রেস্তরাঁ ব্যবসায় মেয়েরা
  • ১৪ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। রান্নার প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাই বেশ কিছু মহিলা শুরু করেছেন রেস্তরাঁর ব্যবসা। কেমন তাঁদের অভিজ্ঞতা? সঙ্গে রইল তাঁদের পছন্দের রেসিপি।

Advertisement

সাহেবপাড়ায় বাঙালি খাবার নিয়ে ইলিশ ট্রুলি বং: লোপামুদ্রা কামিল্লা

ইলিশ ট্রুলি বং। সাহেব পাড়া পার্ক স্ট্রিটের বুকে বাঙালি রেস্তরাঁ। কর্ণধার লোপামুদ্রা কামিল্লা। হঠাৎ এমন সাধ হল কেন? বললেন, ‘পৃথিবীর সব শহরেই প্রায় আঞ্চলিক খাবারের রেস্তরাঁ রয়েছে মূল ফুড স্ট্রিটে। কলকাতায় তেমনটা ছিল না। সেই অভাবই পূরণ করতেই এই ভেঞ্চার। কিন্তু রেস্তরাঁ খোলা তো মুখের কথা নয়। প্রচুর পড়াশোনা ও গবেষণার ফসল এই রেস্তরাঁ।’ তবে এই ব্যবসায় আসার অন্যতম কারণ রান্নার প্রতি ভালোবাসা। সন্তানের ও পারিবারিক সমর্থনও খুবই কাজে লেগেছিল। বললেন, ‘কোভিডের ঠিক আগে রেস্তরাঁটা খুলেছিলাম। তারপর লকডাউনে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হই। কিন্তু তারও মধ্যে নিজের ব্যবসা কীভাবে চালু রাখা যায়, উন্নত করা যায় এই নিয়ে ভেবেছি। এবং ব্যবসাটাকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছি।’ মহিলা হিসেবে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন লোপামুদ্রা। হোমমেকার থেকে ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার পথটা সুগম ছিল না। অতিথিরা এসে নানারকম আজগুবি কথা বলতেন। তেল ছাড়া তেল কই বা মশলাবিহীন ইলিশ ভাপা খেতে চাইতেন। তাঁদের হাসিমুখে বোঝানো এবং খাইয়ে তৃপ্ত করাই ছিল লোপামুদ্রার উদ্দেশ্য। তিনি বিশ্বাস করেন নিজের ১০০ শতাংশ দিয়ে, খেটে কোনো কাজ করলে তা সফল হবেই।

তেল কই

উপকরণ: কই মাছ ১টা, কোরানো পেঁয়াজ ১ টেবিল চামচ, শুকনো লংকা ও রশুন বাটা ৩ টেবিল চামচ, জিরে ও ধনে বাটা (৩:১ পরিমাণে) ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, হলুদ গুঁড়ো পরিমাণ মতো, কাঁচালংকা স্বাদ অনুযায়ী, কালোজিরে  চা চামচ, সরষের তেল প্রয়োজন অনুযায়ী।

প্রণালী: মাছ ধুয়ে নুন হলুদ মাখিয়ে নিন। কড়াইতে তেল গরম করে মাছ ভেজে তুলে রাখুন। এবার বাকি তেলে আর একটু তেল যোগ করে তাতে কালোজিরে, কাঁচালংকা ফোড়ন দিন। তারপর রশুন ও শুকনো লংকা বাটা দিয়ে ভাজুন। তারপর কোরানো পেঁয়াজ দিয়ে কষতে থাকুন। এরপর বাকি মশলা একসঙ্গে অল্প জলে গুলে দিয়ে দিন। সবটা একসঙ্গে কষিয়ে নিন। গ্রেভি ফুটে উঠলে ভাজা মাছ দিয়ে দিন। মাঝারি আঁচে চাপা দিয়ে রান্না করুন। দশ মিনিট পর ঢাকা খুলে উপর থেকে এক চামচ সরষের তেল ছড়িয়ে দিন। খানিকক্ষণ রেখে নামিয়ে নিন। সাদা ভাত সহযোগে পরিবেশন করুন।

গন্ধরাজ  ভাপা ভেটকি

উপকরণ: ভেটকি মাছের ফিলে ১০০ গ্রাম, গন্ধরাজ লেবুর রস ১ চা চামচ, গন্ধরাজ লেবু পাতলা স্লাইস করে কাটা ১ পিস, নুন স্বাদমতো, ভালো করে ফেটানো টক দই ১ টেবিল চামচ, হলুদ সামান্য, কাঁচালংকা স্বাদমতো।

প্রণালী: ভেটকি মাছের ফিলে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। তারপর তাতে সব উপকরণ মাখিয়ে রেখে দিন। মাছের উপর গন্ধরাজ লেবুর স্লাইসটা বসিয়ে দিন। এবার একটা টিফিন বক্সে ম্যারিনেট করা মাছটা রেখে তার মুখ বন্ধ করে দিন। এরপর কড়াইতে জল গরম করে মাছটা স্টিমে বসিয়ে রান্না করে নিন। মোটামুটি কুড়ি মিনিট ভাপিয়ে নিয়ে খানিকক্ষণ রেস্টে রেখে টিফিনবক্স খুলে পরিবেশন করুন। স্ন্যাক্স হিসেবে এই পদটি খুবই ভালো।

 

বাঙালিয়ানা আর বনেদিয়ানায় ভরা বাবু কালচার: মৃদুলা মজুমদার

নিজস্ব কিছু করার তাগিদেই ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন মৃদুলা মজুমদার। রেস্তরাঁর ব্যবসাই যে করবেন সেটা কিন্তু প্রথমে ভাবেননি। বললেন, ‘রেস্তরাঁর সঙ্গে আমার অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। সম্বন্ধ করে বিয়ে হলে যেমন ক্রমশ ভালোবাসা তৈরি হয়, তেমনই আমারও একটু একটু করে রেস্তরাঁর ব্যবসার প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে। তবে খাওয়াতে ভালোবাসি বরাবর। আমার হাতের রান্না খেয়ে কেউ প্রশংসা করলে মন ভরে যায়। সেই থেকেই এই ব্যবসায় এসেছিলাম। তাই বলে এর খুঁটিনাটি সব জেনে এসেছি বললে ভুল হবে।’ ব্যবসা করার আসল চ্যালেঞ্জটা কী? মৃদুলা বললেন, সঠিক লোকের উপর ঠিক কাজের দায়িত্ব দেওয়াই আসল কথা। রেস্তরাঁ ব্যবসার মেরুদণ্ড শেফ। তাঁর রসনায় অতিথিরা তৃপ্ত হয়ে ফিরে ফিরে আসেন। ফলে ভালো শেফ খুঁজে বার করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও হসপিটালিটি বিজনেসে আপ্যায়নের একটা ব্যাপার থাকে। এখানে যাঁরা আসেন তাঁদের তৃপ্তির দিকটা দেখা দরকার। এগুলোই খেয়াল রেখে চলেছেন তিনি প্রথম থেকে। বাঙালিয়ানার অনুভূতি আর বনেদি আমলের অনুভব মিলে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে বাবু কালচার।  

ঘি রোস্ট মাটন 

উপকরণ: পাঁঠার মাংস ১ কেজি, সরষের তেল  কাপ, ঘি ৪ টেবিল চামচ, গোটা গরমমশলা ১ চামচ, পেঁয়াজ বাটা ৪০০ গ্রাম, বেবি পেঁয়াজ ২০০ গ্রাম গোটা রাখুন। ম্যারিনেশনের মশলা: আদা-রশুন বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচালংকা বাটা ১ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, সরষের তেল ১ চামচ, ভাজা পেঁয়াজ ১ টেবিল চামচ, টক দই  কাপ।

প্রণালী: প্রথমে ম্যারিনেশনের সব মশলা দিয়ে মাংস ম্যারিনেট করে রেখে দিন সারা রাত। এরপর একটা প্রেশার কুকার বা তামার হাঁড়িতে তেল ও ঘি একসঙ্গে গরম করে নিতে হবে। তাতে গরমমশলা ফোড়ন দিন। ফোড়নের সুগন্ধ উঠলে পেঁয়াজ বাটা দিয়ে কষিয়ে নিন। তাতে ম্যারিনেট করা মাংস দিয়ে কষাতে থাকুন। ঢিমে আঁচে কষতে কষতে তেল ছেড়ে এলে পরিমাণ মতো নুন দিন। তারপর বেবি পেঁয়াজগুলো অর্ধেক করে কেটে দিয়ে দিন। একসঙ্গে কষতে থাকুন। এরপর অল্প একটু গরমমশলা গুঁড়ো করে দিন। তারপর আরও একটু ঘি উপর থেকে ছড়িয়ে প্রেশারে দিয়ে রান্না করুন বা হাঁড়ির মুখ বন্ধ করে ঢিমে আঁচে রাঁধুন। মাংস সেদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত রাঁধুন। গরম ভাত বা রুটি সহযোগে পরিবেশন করুন।

দুংগার  চিকেন

উপকরণ: চিকেন লেগ পিস ৮-১০টা, 
ফার্স্ট ম্যারিনেশনের জন্য: আদা রশুন বাটা ২ টেবিল চামচ, ১টা পাতিলেবুর রস, সরষের তেল ২ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, সেকেন্ড ম‌্যারিনেশনের জন্য: জল ঝরানো টক দই ২ চামচ, ক্রিম  কাপ, চিজ ১ কিউব, কসুরি মেথি গুঁড়ো  চামচ, মাখন ২ টেবিল চামচ কোটিংয়ের জন্য: ক্রিম  কাপ, মাখন ১ চামচ, অলিভ অয়েল ১ চামচ, চাট মশলা ২ চামচ, কাঠকয়লা ১ টুকরো।

প্রণালী: প্রথমে চিকেন লেগপিসগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। তারপর প্রথম ম্যারিনেশনের মশলাগুলো দিয়ে চিকেন ম্যারিনেট করে রেখে দিন ২ ঘণ্টা। তারপর তাতে সেকেন্ড ম্যারিনেশনের মশলাগুলো মাখিয়ে আরও ১ ঘণ্টা রেখে দিন। এরপর তা তন্দুর আভেনে দিয়ে তন্দুর করে নিন। ইতিমধ্যে একটা কোটিং বানান। কোটিংয়ের সব মশলা একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। তা দিয়ে তন্দুর করা চিকেন লেগ কোট করুন। ইতিমধ্যে একটা বাটিতে কাঠকয়লায় ঘি মাখিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে নিন। ওই ধোঁয়া ওঠা বাটিটা চিকেন লেগের মাঝে রেখে তা ঢাকা দিয়ে দিন। স্মোকি ফ্লেভার এলে কাঠকয়লার বাটি সরিয়ে রেখে চিকেন পরিবেশন করুন।   

ভালোলাগা আর ভালোবাসার মিলমিশে ইছামতী: মিতাশ্রী চৌধুরি

কেরিয়ারের গোড়ার দিকে খাবারের ছবি তুলতেন মিতাশ্রী চৌধুরি। সেই থেকে নিজের রেস্তরাঁ খোলার ইচ্ছে হয়েছিল মনে। তিনি বাঙাল তাই বাংলাদেশি কুইজিনের উপর রেস্তরাঁ খোলার সাধ জাগল, শুরু হল ইছামতী। বাজার করা, মেনু ঠিক করা, খাবারের মান ভালো রাখা, একইরকম স্বাদে প্রতিদিন রান্না করা, এগুলো সবই এক একটা চ্যালেঞ্জ। রোজকার বাজার থেকে রান্না, প্লেটিং, এসবই শিখেছেন এবং কর্মচারীদের শিখিয়েছেন মিতাশ্রী। বললেন, ‘দুটো জিনিস মাথায় রেখেছি। প্রথমত ভালো জিনিস খাওয়াব, দ্বিতীয়ত অতিথিদের যেন তৃপ্ত করতে পারি।’ ঘরোয়া রান্নার মধ্যেও স্বাদ ধরে রাখাই তাঁর রেস্তরাঁর বিশেষত্ব। রেস্তরাঁর প্রচুর হিট আইটেম আছে। তারই মধ্যে অন্যতম চিকেন ডাকবাংলো। আর মাছের প্রাধান্য রয়েছে মেনুতে। ভালোলাগা আর ভালোবাসার মিলমিশে গড়ে উঠেছে ইছামতী। 

ধনেপাতা পাবদা

উপকরণ: পাবদা মাছ ৪-৫টি, ধনেপাতা বাটা ১ কাপ (এক আঁটি ধনেপাতা ৪-৫টি কাঁচালংকা দিয়ে মিহি করে বাটা), কালো জিরে  চা চামচ (ফোড়নের জন্য), চেরা কাঁচালংকা ৩-৪টি, হলুদ গুঁড়ো  চা চামচ, নুন স্বাদমতো, সরষের তেল পরিমাণ মতো।

প্রণালী: মাছগুলো ধুয়ে নুন ও সামান্য হলুদ দিয়ে মাখিয়ে রাখুন। কড়াইতে সরষের তেল গরম করে মাছ হালকা ভেজে তুলে নিন। মাছ ভাজা তেলেই কালো জিরে এবং ২-৩টি চেরা কাঁচালংকা ফোড়ন দিন। এবার সামান্য জল দিয়ে তাতে হলুদ গুঁড়ো ও স্বাদমতো নুন গুলে কড়াইতে দিন। সামান্য নাড়াচাড়া করুন। ধনেপাতা বাটা দিয়ে দিন। ঢিমে আঁচে ১-২ মিনিট কষিয়ে নিন। খুব বেশি কষাবেন না, তাহলে ধনেপাতার সুন্দর সবুজ রং কালচে হয়ে যাবে। এবার পরিমাণমতো জল দিয়ে ফুটতে দিন। ঝোল ফুটে উঠলে ভাজা মাছগুলো দিন। ৩-৪ মিনিট মাঝারি আঁচে ঢাকা দিয়ে রান্না করুন। কয়েকটা চেরা কাঁচালংকা ও এক চামচ সরষের তেল ছড়িয়ে নামান।

চিকেন ডাকবাংলো

উপকরণ: চিকেন ৫০০-৬০০ গ্রাম, নুন ও হলুদ দিয়ে ভেজে নেওয়া সেদ্ধ ডিম ২-৩টি, মিহি করে কাটা পেঁয়াজ কুচি ২ কাপ, আদা-রশুন বাটা ২ বড়ো চামচ, টম্যাটো কুচি ১টি বড়ো, টকদই  কাপ, শুকনো লংকা গুঁড়ো ১ চা চামচ, কাশ্মীরি লংকা গুঁড়ো ১ চা চামচ, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, সরষের তেল  কাপ, নুন ও চিনি স্বাদমতো। ডাকবাংলো স্পেশাল ভাজা মশলার জন্য: গোটা ধনে ১ চামচ, গোটা জিরে ১ চামচ, শুকনো লংকা ২-৩টি, ছোটো এলাচ ৪টি, লবঙ্গ ৪-৫টি, দারচিনি ১ টুকরো, জৈত্রী সামান্য, গোটা গোলমরিচ ৮-১০টি শুকনো খোলায় ভেজে গুঁড়ো করে নেওয়া। 

প্রণালী: চিকেনে টক দই, আদা-রশুন বাটা, সামান্য হলুদ, লংকা গুঁড়ো এবং এক চামচ সরষের তেল দিয়ে ১ ঘণ্টা মাখিয়ে রাখুন। কড়াইতে সরষের তেল গরম করে তাতে তেজপাতা, গোটা গরমমশলা আর সামান্য চিনি ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ কুচি দিয়ে একদম লালচে করে ভাজুন। পেঁয়াজ যত ভালো ভাজা হবে, ঝোলের রং তত সুন্দর হবে। তারপর ম্যারিনেট করা চিকেনটা দিয়ে দিন। মাঝারি আঁচে ১০-১৫ মিনিট কষাতে থাকুন। চিকেন থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে টম্যাটো কুচি আর নুন দিয়ে দিন। যখন চিকেনটা কষে হাড় থেকে ছেড়ে আসবে, তখন শুকনো খোলায় ভাজা ডাকবাংলো স্পেশাল মশলা দিয়ে ভালো করে মেশান। এবার গরম জল দিন। ঢাকা দিয়ে মাংস নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। মাংস প্রায় সেদ্ধ হলে ডিম দিন। ওপর থেকে সামান্য শাহি গরমমশলা এবং এক চামচ ঘি ছড়িয়ে আঁচ বন্ধ করে ১০ মিনিট ঢাকা দিন। তারপর পরিবেশন করুন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ