পক্ষে
পক্ষে
অঙ্গদ মাইতি
এ পৃথিবী বড়ই অদ্ভুত! আর তার থেকেও বেশি অদ্ভুত এই মানবসভ্যতা। মানবসভ্যতার প্রথম থেকেই মানুষ অজানাকে জানতে আর অদেখাকে দেখতে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষ নীরবে সৌন্দর্যকে উপভোগ করেনি, করেছে অন্যায়! মানুষের পদচিহ্ন যত নীরব, ততই সে সুস্থ ও সুন্দর থাকে। কিন্তু আজ পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে যাচ্ছে গাড়ির হর্নে, তার গম্ভীর রূপ বদলে যাচ্ছে মানুষের ফেলে যাওয়া আবর্জনায়। সমুদ্রের গর্জন ঢেকে যাচ্ছে ডিজে নামক শব্দদানবের হুঙ্কারে! জলে প্রতিফলিত আকাশকে ম্লান করেছে ভাসমান প্লাস্টিক। পর্যটকের ভিড়ে স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সুষমা মুছে যাচ্ছে। প্রকৃতিকে অতিথিশালা নয়, মায়ের কোল মনে করলে তবেই তার সুফল আমরা পাব।
ছাত্র
সনৎ ঘোষ
যেখানে যত মানুষের আনাগোনা সেখানেই পরিবেশে পড়ে প্রভাব। কোথায় নেই মানুষ! ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির পর্যটনে উৎসবের আমেজ। কথাতেই তো আছে, পায়ের তলায় সর্ষে। পাহাড়ে জলে, জঙ্গলে মানুষের উপস্থিতি ভাঙছে নীরবতা, মানুষের ফেলা বর্জ্যে দূষণ হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। কাজেই মানুষ আছে বলেই এত দূষণ। অন্যদিকে পর্যটন একটা শিল্প সেটা বন্ধ হলেও আর্থিক ক্ষতি। এক একটা জায়গার অর্থনীতি পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। তাই এ যেন শাঁখের করাত! পর্যটন রেখে পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজন কঠোর বিধি ও সচেতনতা, সদিচ্ছা।
সরকারি কর্মচারী
নীলেশ নন্দী
বেড়াতে গিয়ে আমরা যেসব দ্রব্য ব্যবহার করি, তা থেকে পরিবেশের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়। যেমন কাপড় বা পাটের তৈরি ব্যাগের পরিবর্তে পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার ও তা যত্রতত্র ফেলে দেওয়া। এতেই মারাত্মক ক্ষতি হয়। প্লাস্টিক দূষণে বহু জলজ পাখি ও প্রাণী মারা যাচ্ছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে পর্যটন স্থানগুলিতে প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছে। ঘুরতে গিয়ে আমরা কীটনাশক হিসেবেও বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করি। এতেও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।
লেখক
কঙ্কনা বোস
মাত্রাতিরিক্ত পর্যটন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। অতিরিক্ত ভিড় শান্ত ও নির্মল প্রকৃতিকে করে তোলে কোলাহলপূর্ণ। অসচেতন ভ্রমণকারীদের আবর্জনা ফেলা, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ, বনভূমি দখল ও বন্যপ্রাণীর আশ্রয় নষ্ট—সবই প্রকৃতির সৌন্দর্য ম্লান করে। অনেকেই বসে খাওয়ার পর প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্লেট ও উচ্ছিষ্ট ফেলে বনের মাটি দূষিত করে। এতে বাতাস, জল ও উদ্ভিদ নষ্ট হয়, বাস্তুতন্ত্র দুর্বল হয়। তাই সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হয়ে প্রকৃতি রক্ষা করতে হবে।
স্নাতকোত্তর ছাত্রী
বিপক্ষে
সৌমিলি নাগ
প্রত্যেক বছর অগুনতি মানুষের সমাগম ঘটে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে। এই পর্যটন শিল্প যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা দেখা আমাদের আবশ্যিক প্রয়োজন। যদি আমরা কিছু সংখ্যক নিয়ম মেনে চলি তাহলেই পরিবেশ রক্ষা হয়। পর্যটন থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে সেখানকার প্রাকৃতিক উদ্যান রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়। জনপ্রিয় সব পর্যটনকেন্দ্রে আন্তর্জাতিক তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করার ব্যবস্থা হোক। পর্যটন একটি আকর্ষণীয় শিল্প যা রক্ষা করার দায়িত্ব শুধুমাত্র পর্যটনশিল্প সংলগ্ন আয়োজকদের নয়, ভ্রমণকারী ও স্থানীয়দেরও সমানভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে।
কলেজ পড়ুয়া
শ্বেতা চ্যাটার্জি
বেড়ানোর জায়গায় পর্যটক না গেলে পরিবেশ অনেকাংশে রক্ষা পাবে হয়তো। চারদিকে নোংরা আবর্জনা ইত্যাদি থেকে অনেকটা বাঁচলেও ক্ষতি হবে সেসব মানুষের, যাঁদের রুজিরুটি নির্ভর করে পর্যটকদের যাওয়া আসার উপরেই। যাঁরা সেখানে ব্যবসা করে নিজেদের পেট চালান এবং যাঁরা পর্যটনকেন্দ্রে ছোটখাটো শিল্প গড়ে তুলেছেন, তাঁদের অনেক অসুবিধায় পড়তে হবে। শহরে এসে কিছু করা বা দিনযাপন করা অনেকের জন্য অসম্ভব। অনেক মানুষের সংসার জড়িয়ে রয়েছে, যাঁদের হয়তো ওইটুকুই অবলম্বন। তাই পর্যটকদেরও অনেক সাবধান হতে হবে, যত্রতত্র নোংরা, প্লাস্টিক ফেলা যাবে না, পর্যটনকেন্দ্রের কোনও জিনিস নষ্ট যাতে নাহয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। তাই সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। স্নাতকোত্তর পড়ুয়া
সুপ্রিয়া সেন
একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ উন্মুক্ত প্রকৃতির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে শান্তি পেতে। তাই তো বেড়াতে যাওয়ার প্রতি আমাদের এত টান! বারবার প্রকৃতি হাতছানি দিয়ে ডাকে। গড়ে ওঠে পর্যটন ব্যবসা। স্থান নির্বাচন, গাড়ি, রিসর্ট, খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুরই ব্যবস্থা মজুত পর্যটন শিল্পে। পরিবেশকে সাজিয়েগুছিয়ে রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট না করার দিকেও নজর রাখা হয়। দলে দলে মানুষ যদি জঙ্গল, পাহাড়, ছোট ঝোরা, নদী, সমুদ্র, ঝর্ণাধারায় অবগাহন না করে, তবে ফের কাজের মধ্যে ডুব দেবে কেমন করে? তাই বেড়ানো বন্ধ করা কোনও সমাধান নয়। মানুষ তার সঞ্চয় ভেঙে এটুকু বিলাসিতা করবেই। বরং পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হয়ে বেড়ালে পরিবেশের ক্ষতি হবে না।
শিক্ষিকা
নীলাঞ্জন চৌধুরী
ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে পর্যটন থেকেই নিম্নবিত্ত মানুষের উপার্জনের পথ তৈরি হয়। অতিরিক্ত পর্যটন তাদের একটু সুখের মুখ দেখায়। করোনা বা ওড়িশার সাইক্লোনের পরের সময়টার পর্যটনবিমুখতার কথা কিছু মানুষ আর মনে করতে চান না। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে যত্রতত্র বর্জ্য পদার্থ ফেলে এবং উচ্চস্বরের প্রমোদে মেতে আমরা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলছি। কলেজ স্ট্রিটে এক বিদেশিকে দেখেছি, চা খাওয়ার পর ডাস্টবিন খুঁজে না পেয়ে, কাগজের কাপটি হাতে দীর্ঘ পথ হাঁটতে। সুতরাং পর্যটন কম নয়, বরং পরিবর্তন করতে হবে আমাদের মানসিকতা, অভ্যাস ও বৃদ্ধি করতে হবে পরিবেশ রক্ষার সচেনতা।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী