Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ডুয়ার্সের অচিন গ্রাম ডামডিম

গা ছমছমে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, নিঝুম রাতে দূরে কোথাও মাদলের শব্দ দমকা হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে কানে আসছে। মশালের আলোগুলো টিমটিম করে জ্বলছে।

ডুয়ার্সের অচিন গ্রাম ডামডিম
  • ১৪ মার্চ, ২০২৬ ১৫:০৩
Prefer us on Google

গা ছমছমে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, নিঝুম রাতে দূরে কোথাও মাদলের শব্দ দমকা হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে কানে আসছে। মশালের আলোগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। বৃষ্টিভেজা পাতাঝরা বনে কোনো বন্য প্রাণীর ধীর লয়ে চলাফেরার শব্দ পাচ্ছি যেন। সত্যি ডুয়ার্সের জঙ্গলে নিশুতি রাতে প্রহর গোনা যে কী অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা তা বলে বোঝানো যায় না। পশ্চিম ডামডিমের চেল ও কালিখোলা নদীর পাশে ডুয়ার্সের এই অল্পচেনা গ্রামের সন্ধান পেতেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। ছোট্ট ছুটি খুঁজে চলে এলাম পশ্চিম ডামডিম। জলাভূমি, চা বাগানে ঘেরা বিস্তৃত প্রান্তর, নির্জনতা এখানে এক অদৃশ্য সঙ্গী।

Advertisement

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে ডুয়ার্সের অসম্ভব বন্ধুত্ব। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা প্রতিটি ঋতুতেই ডুয়ার্সও সেজে ওঠে বিভিন্ন রূপে। শীতে ডুয়ার্সের শিশিরভেজা জঙ্গলে ভোরের প্রথম কিরণ লেগে ঠিকরে যায়। গ্রীষ্মে আবার রুক্ষ তার সবুজ প্রাণ, শুষ্ক তার নদ-নদী। বর্ষায় সে যেন ফিরে পায় নতুন প্রাণ, যত দূর চোখ যায় শুধুই সবুজে জড়ানো প্রশান্তি। ডুয়ার্সের অন্দরে জঙ্গল ও চা বাগানের বিস্তীর্ণ প্রান্তর মাঝে একক আবাসনগুলোয় কয়েকবার থেকেছি। তবে একত্রে পাহাড়, জঙ্গল ও নদীর সান্নিধ্যে আগে কখনো থাকা হয়নি। পশ্চিম ডামডিমের চেল ও কালিখোলা নদীর পাশে ডুয়ার্সের এই গ্রাম। এখানে এসে দেখলাম পাহাড়ের ঘেরাটোপে এক টুকরো প্রকৃতি যেন রং-তুলির ছোঁয়ায় আঁকা ছবি।
মালবাজার থানার অন্তর্ভুক্ত একটি গ্রাম পশ্চিম ডামডিম। নিউ মাল জংশন থেকে ১৪ কিমি ও নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গাজোলডোবা হয়ে ওদলাবাড়ি ও সেখান থেকে ডামডিম মোড় হয়ে পশ্চিম ডামডিম গাড়িতে ৫৫ কিলোমিটার পথ। আমরা অবশ্য শিলিগুড়ি হয়ে এসেছিলাম। করোনেশন ব্রিজ হয়ে মালবাজার যাওয়ার রাস্তায় পড়বে গোরুবাথান মোড়। মোড়ের দক্ষিণ দিকে ডামডিম রেল স্টেশনের পাশ দিয়ে, ডামডিম হাটের উপর দিয়ে অল্প সময়েই পৌঁছে গেলাম জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখা দ্বারা তৈরি পশ্চিম ডামডিম পর্যটক আবাসনে।
পশ্চিম ডামডিমের আবাসনটি অসাধারণ সুন্দর। দূরে পাহাড়, চারপাশে জঙ্গল ও তার কিছুটা দুরে আপন মনে বয়ে চলা চেল ও কালিখোলা নদীর উন্মুক্ত পরিবেশ ও সঙ্গে মন মাতাল করা পাগলা হাওয়া। সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি আবাসনটির বৈশিষ্ট্য হল এর সব ঘর দোতালায়। নীচে গাড়ি রাখার জায়গা।
কটেজের সামনের রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা যেখানে বসে দূরের ঝাপসা পাহাড়, কাছের জলাভূমি, চা বাগানে ঘেরা বিস্তৃত প্রান্তর ও নাম না-জানা পাখিদের গান শুনে দু’দিন যে কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। প্রকৃতির মাঝে নির্জনতাকে যে এত কাছ থেকে উপলব্ধি করা যায়, এখানে না আসলে বোধহয় বুঝতেই পারতাম না। রিসর্টের পাশেই ডামডিম হাট, বিকেলে সবাই চলে এলাম হাটে। খুব বড়ো নয়। তবে বর্ণময়। শিশুবাড়ি, সাইলি, কুমলাই, বেতবাড়ি প্রভৃতি আশপাশের চা বাগানের শ্রমিকরা হাটের প্রধান ক্রেতা। সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে এলাম রিসর্টে। রাত হতেই জ্যোৎস্নার আলোয় চারদিক হল আলোকময়। শীতের রাতে কান, মুখ চাদরে জড়িয়ে উঠে পড়লাম রিসর্টের ওয়াচ টাওয়ারে মহাকাল দর্শনের আশায়। চেল ও কালিখোলা নদীর মাঝের উর্বর জমিতে ধান ও বিভিন্ন ফসলের চাষ হয় । হাতির পাল খাবারের খোঁজে প্রায়ই চলে আসে চেল ও কালিঝোরা নদীর ধারে। বন্য প্রাণীর অবাধ বিচরণ রুখতে রিসর্টের সীমানা তাই কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ওয়াচ টাওয়ারে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম মহাকাল দর্শনের আশায়। ডুয়ার্সে নিশুতি রাতের এমন সীমাহীন নীরবতা এর আগে কখনো উপভোগ করিনি তাই প্রচণ্ড শীতেও ওয়াচ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে ছিলাম মায়াবী রাতের নিস্তব্ধতার হাত ধরে। কটেজে যাওয়ার জন্য ওয়াচ টাওয়ার থেকে যেই না নামতে যাব, কানে এল মাদলের আওয়াজ। 
আদিবাসী অঞ্চলে সাধারণত বিবাহ কিংবা বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে মাদল বাজে। এছাড়া হাতি অথবা হিংস্র বন্য প্রাণীদের গ্রাম থেকে দূরে তাড়ানোর জন্য মাদল বাজানো হয়। তাই আবার দাঁড়িয়ে পড়লাম। দূরে মশালের আলো ও বাতাসে ভেসে আসা মাদলের শব্দে বেশ বুঝতে পারলাম গ্রামে মহাকালের আবির্ভাব হয়েছে। রাত অনেক গভীর, ছমছমে, তাই আর দেরি না করে রিসর্টে ফিরে শয্যার আশ্রয় নিলাম। রাতে অনেকবার ঘুম ভেঙে গেল কুকুরের ডাকে। জ্যোৎস্না রাত হলেও জানলা দিয়ে বাইরে কিছুই দেখতে পেলাম না। অগত্যা সবাই নিদ্রামগ্ন হলাম। ভোরে উঠে শুনলাম চিতাবাঘের পায়ের ছাপ দেখা গিয়েছে, তাই দর্শন করে এলাম। 
রিসর্টে ফিরে ব্ল্যাক টি-তে গলা ভিজিয়ে চললাম চেল নদীর উদ্দেশ্যে। প্রথমে পড়বে কালিখোলা, এরপর মাঠ ও মাঠ পেরিয়ে চেল নদী। নদীর ধারে বাঁশ, ত্রিপল দিয়ে ঘর করা আছে। তার মধ্যে শোওয়ার ব্যবস্থা। আসলে ধান পাকলে পাহারা দিতে হয়। রাতে তাদের থাকার জন্যই এই ব্যবস্থা। চলে এলাম চেল নদীর ধারে। শীতকাল, তাই নদীর বক্ষমাঝেই গতিধারা। নদীর ধারে ছড়ানো ছোটো-বড়ো পাথরে কিছুক্ষণ বসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। ওপারে যতদূর চোখ যায় আপালচাঁদ ফরেস্ট গাজোলডোবা হয়ে তিস্তার ধার পর্যন্ত চলে গিয়েছে। শীতে পরিযায়ী পাখিদেরও দেখতে পাওয়া যায় জলাভূমিতে। প্রাতরাশের সময় হয়ে এল, ফিরে এলাম রিসর্টে। এখানে এগারোটায় চেক আউট। তাই দেরি না করে জলখাবার সেরে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে। শুধু পিছনে ফেলে এলাম এক টুকরো ভালো লাগার জায়গাকে। যেখানে পাহাড়ের ডাকে কলকলে শান্ত নদী, গভীর রাত যেন ফিসফিস করে কথা বলে। প্রকৃতির মায়াজালে আপ্লুত মন রচনা করে এক রূপকথা।
     তপন মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ