


এই মন্দির কোনারকের সূর্য মন্দিরের চেয়েও পুরনো। তবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। একাকী রহস্যময় এক অস্তিত্ব নিয়ে বিরাজ করছে যুগ যুগ ধরে।
লালমাটির পথ ধরে যেখানে পৌঁছলাম সেটা অজ পাড়া। চারদিকে চাষের জমি, সবুজ ধানের খেত। মাঝে মধ্যে সবুজ গাছপালায় ঘেরা ছোটো গ্রাম। আমার খুব রাগ হল। এই ধানজমিতে পুরাকীর্তি কোথায়? মাটির নীচে? খামোখা ভরদুপুরে উজিয়ে এলাম এত দূর।
সঙ্গে আসা ছোকরা বেশ তালেবর। একমুখ পানের পিক বিশ্রীভাবে মাটিতে ফেলে বলল, উই পানেটুকু লজর দিন বটে, উই উই দেখতে লারছেন?
গাছপালার আড়ালে দেখলাম উঁকি দিচ্ছে লাল ইটের মন্দিরচূড়ো। সেখানে পৌঁছনোর কোনো পাকা রাস্তা নেই, কাঁচা মাটির পথ। ভাগ্যিস বর্ষাকাল নয়, তাহলে এ পথে চলা দুষ্কর হত। মাটির আলপথ পেরিয়ে যখন কাছে গেলাম, টিয়াপাখির ঝাঁক মানুষের শব্দ পেয়ে টি টি ডাক ছেড়ে আকাশে সবুজ ডানা মেলল মন্দিরচূড়ো থেকে। একনজরে পুরনো ইটের দাঁত বের করা নোনাধরা মান্ধাতা আমলের মন্দির মনে হল। হালিশহরে গঙ্গার ধারে এমন পুরনো মন্দির দেখেছি।
মনে মনে ভাবছি, তালেবর ছোকরা এখুনি না বলে বসে, এখানে বনবাসে থাকার সময় রামচন্দ্র নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করেছিল! সেপথে না গিয়ে সে মন্দিরের দিকে আঙুল তুলে বলল, উয়া সোনাতপল সূর্য মন্দির বটে।
নাম শুনেছিলাম বাঁকুড়ার সোনাতপল সূর্য মন্দিরের। বাঁকুড়া-বেলিয়াতোড় মূল সড়ক থেকে অনেকটাই ভিতরে একেবারেই গ্রাম্য পরিবেশে এই মন্দিরের অবস্থান। বাঁকুড়া শহর থেকে ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে দ্বারকেশ্বর নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত সোনাতপল সূর্য মন্দির। তা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক এবং কিছুটা রহস্যময়।
একটি বাঁধানো বেদি বা চত্বরের ওপর মন্দিরটি রয়েছে। মূল মন্দিরের সঙ্গে আরও কিছু মন্দির ছিল কি না বোঝা যায় না। আগাছা জঙ্গলে পরিপূর্ণ হয়েছে এই মন্দির প্রাঙ্গণ। ধুলোমাখা কাঁচা পথ যেখানে মন্দির প্রাঙ্গণে মিশেছে সেখানে সরকারি নীল বোর্ডে লেখা সূর্য মন্দির, সোনাতপল। মন্দিরের সামনে অপর একটি নীল বোর্ডে লেখা আছে, এই মন্দিরটিকে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের জাতীয় সম্পদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে। ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের লাগানো বোর্ডে মন্দিরটিকে সূর্য মন্দির বলে উল্লেখ করা। এটি রাজ্যের একমাত্র প্রাচীন সূর্য মন্দির। গর্ভগৃহে বর্তমানে কোনো মূর্তি নেই, একটি শিবের ত্রিশূল মেঝেতে স্থাপন করা হয়েছে। আনুমানিক খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে তৈরি ইটের দেউলটি বাঁকুড়া জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরাকীর্তি।
সূর্য মন্দির বললেই সবার মাথায় প্রথম যে মন্দিরের কথা আসে তা হল কোনারকের সূর্য মন্দির। ভারতে এখনও পর্যন্ত মাত্র ১৪টি জায়গায় সূর্য মন্দিরের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে বলে জানা যায়। সোনাতপলের এই সূর্য মন্দিরটি কিন্তু কোনারকের সূর্য মন্দিরের থেকেও প্রাচীন। প্রাক-মুসলিম যুগের গুটিকয়েক মন্দিরের অন্যতম, হাজার বছরের প্রাচীন বাঁকুড়ার সোনাতপলের মন্দির। তবে এটি জৈন মন্দির না বৌদ্ধ মন্দির, শিব মন্দির না সূর্য মন্দির তা নিয়ে নানা মতভেদ আছে। কারণ এর প্রকৃত ইতিহাস হারিয়ে গিয়েছে কালের গর্ভে। নির্মাণকাল কত, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। কারা এই স্থাপত্যগুলি গড়েছিলেন, তার উত্তর এখনও অজানা। বিগ্রহহীন মন্দিরে কোন দেবতা পূজিত হতেন তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে।
অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাঁকুড়া জেলার পুরাকীর্তি গ্রন্থে বলেছেন, অনেকে মনে করেন এটি সূর্যমন্দির, কারণ এটি পুবমুখী। কিছুদিন আগে মন্দিরের কাছাকাছি এক সূর্যমূর্তি পাওয়া গেছিল। আর অদূরেই বীরসিংহপুর-রাজহাট অঞ্চলে বহুকাল থেকে সূর্য-উপাসক ব্রাহ্মণদের বসবাস রয়েছে।
দেউল শব্দটা এসেছে দেবালয় থেকে। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে বাংলায় দেউল স্থাপত্যরীতির উন্মেষ ঘটেছিল। তারপর তুর্ক-আফগান যুগে এই রীতি আরও সমৃদ্ধ হতে থাকে। দেউল রীতির আবার চার রকমের শৈলী আছে, শিখর দেউল, পীর দেউল, স্তূপযুক্ত পীর দেউল আর শিখরযুক্ত পীর দেউল।
কথিত আছে, পালযুগের রাজা শালিবাহন এই দেউল নির্মাণ করেছিলেন। ইতিহাসবিদ তরুণদেব ভট্টাচার্য তাঁর বাঁকুড়া গ্রন্থে লিখেছেন, সোনাতপল গ্রামের প্রাচীন নাম হামিরডাঙা। মন্দিরটির নির্মাণকাল এগারো শতক। জনশ্রুতি, শালিবাহন নামের কোনো এক রাজা এই মন্দিরটি স্থাপন করেছিলেন। তৎকালীন হামিরডাঙায় ব্রাহ্মণদের বাস ছিল। তাঁরা সূর্যের উপাসনা করতেন। সুপ্রাচীন মন্দিরটির আশপাশে কয়েকটি ঢিবি দেখা যায় এবং সেখান থেকে বেশকিছু প্রাচীন ইটও পাওয়া গিয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, তৎকালীন সময়ে এই মন্দির শালিবাহন রাজার দ্বারা নির্মিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট ঢিবিগুলি রাজার গড়ের ভগ্নাবশেষ। সোনাতপল মন্দিরে আদিতে কোন দেবতা পূজিত হতেন তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে অতীতে মন্দিরের কাছে যে একটি সূর্যদেবের বিগ্রহ উদ্ধার করা হয়েছিল সেকথা ঠিক। এছাড়াও মন্দিরটি পূর্বমুখী হওয়ায় অনেকে মনে করেন এটি একটি সূর্য মন্দির।
মন্দিরটির ভিত পঞ্চরত্ন আলেখ্যে তৈরি। এর বিশেষত্ব হচ্ছে বিশাল বাঁকানো সুউচ্চ ধনুকাকৃতি গেট। প্রবেশদ্বারের উপরে, বাইরের দেওয়ালে রয়েছে সুন্দর কারুকার্যখচিত চৈত্য-জানালা। এই সূর্য মন্দিরের গায়ে ভাস্কর্যশিল্পের কারুকার্য খুবই আকর্ষণীয়, নিখুঁত।
মন্দিরের পূজারি ষষ্ঠী মল্ল ও তাঁর মা নিত্যপুজো করলেও এই মন্দিরে পর্যটকের আনাগোনা বেশ কম। মূলত স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়া পুজো দেওয়ার লোক বিশেষ আসেন না। মন্দির দেখতে জমির আলপথ মাড়িয়ে যেতে হয়। সে কারণেও অনেকে দূর থেকেই মন্দির দেখে ফিরে যান। আগে দোলের সময় মন্দির ঘিরে মেলা বসত, কিন্তু কয়েক বছর হল তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হাজার বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আজ নিভৃত যাপনে মগ্ন বাঁকুড়ার সোনাতপল মন্দির।
সুব্রত মুখোপাধ্যায়