ইন্দ্রজিৎ কর্মকার, কান্দি: রোজগারের রাস্তা দেখিয়ে কান্দির ষাটোর্ধ্ব মল্লিকা জেঠিমা অনেকের কাছেই ‘ঊমা জেঠিমা’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। স্বামী ও শ্বশুরের কাছে প্রতিমা তৈরির শিক্ষা নিয়ে এলাকার শতাধিক যুবককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। নিজের হাতেও তৈরি করেছেন হাজারের বেশি দুর্গা প্রতিমা। তাই কান্দির মৃৎশিল্পী জগতের আইকন ষাটোর্ধ্ব মহিলা মৃৎশিল্পী মল্লিকা পাল। কান্দি নেতাজি বাস টার্মিনাসের পিছনেই এক নাগাড়ে প্রায় ৩৮ বছর ধরে প্রতিমা তৈরি করে চলেছেন ওই বৃদ্ধা। এবছরও ৩০টি প্রতিমা তৈরি করছেন তিনি।
তবে শুরুটা মোটেই সুখের ছিল না মল্লিকা দেবীর। তাঁর বাপের বাড়ি বেলডাঙা থানার মোহনা গ্রামে। বাপের বাড়ির লোকজন মাটির হাঁড়ি তৈরি করলেও প্রতিমা তৈরির রেওয়াজ ছিল না। যা কিছু শেখা সবই শ্বশুর ও স্বামীর কাছে। প্রায় ৩৮ বছর ধরে এক নাগাড়ে শ্বশুরবাড়িতে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন তিনি। মাত্র ২৪ বছর বয়সে সংসারের অনটন ঘোচাতে তাঁকে প্রতিমা তৈরি শিখতে হয়েছিল বলে দাবি। তিনি বলেন, কোলে ছোট ছোট দুই ছেলে। স্বামীর তেমন রোজগারও ছিল না, শ্বশুর মশাইয়ের শরীরও ভালো যাচ্ছিল না। এমন অবস্থায় স্বামীর জেদের বশে আমি প্রতিমা তৈরির কাজ শিখতে শুরু করি। ধীরে ধীরে রপ্তও করে ফেলি। এরপর আর থেমে থাকিনি। নিজে শেখার পর অন্যদেরও শেখাতে শুরু করি। আমার থেকে শিখে শতাধিক মৃৎশিল্পী মহকুমার বিভিন্ন এলাকায় মূর্তি বানাচ্ছে। যারা আমাকে মল্লিকা জেঠিমা বলে ডাকে।
তবে মল্লিকা জেঠিমা অনেকের কাছেই ‘ঊমা জেঠিমা’। ধোপঘাট গ্রামের মৃৎশিল্পী রাজকুমার দাস বলেন, আমার কাছে উনি ঊমা জেঠিমা। রোজগারের রাস্তা দেখিয়ে দেবী দুর্গার মতো আমার সংসার ভরিয়ে দিয়েছেন। আমার মতো অনেকেই ওঁকে ভালোবেসে ঊমা জেঠিমা বলেন। প্রায় একই বক্তব্য হরিপুর গ্রামের সুকুমার কোনাইয়ের। তিনি বলেন, আমার মতো প্রচুর ছেলেকে উনি হাতেকলমে প্রতিমা তৈরি করা শিখিয়েছেন। কাজেই উনি আমাদের কাছে কোনও অংশে দেবী দুর্গার চেয়ে কম নন।
মল্লিকা দেবীর দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে সুমন্ত প্রতিবন্ধী। তবে বড় ছেলে গৌরাঙ্গর তৈরি প্রতিমা এলাকায় প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারুকার্য ফুটে উঠে তাঁর তৈরি প্রতিমায়। তিনি বলেন, মা খুব কষ্ট করে প্রতিমার কাজ শিখেছেন বলে জেনেছি। এক হাতে সংসার সামলে প্রতিমার কাজ শেখা মোটেই সহজ নয়। এমন মায়ের জন্য আমরা গর্ববোধ করি।
মল্লিকা দেবী এ পর্যন্ত হাজারের বেশি দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেছেন বলে দাবি। তাঁর তৈরি প্রতিমা কান্দি মহকুমার বিভিন্ন গ্রামে পূজিত হয়েছে। মহিষার, হরিপুর, পুরন্দরপুর, ভরতপুর, জজান, গয়েশপুর সহ কান্দি শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে তাঁর তৈরি প্রতিমা পুজো হয়েছে। এবছরও প্রায় ৩০টি প্রতিমা তৈরি করছেন। তবে আগের মতো আর শরীরে কুলোয় না। তাই নিজে অভিভাবক হয়ে তাঁর প্রশিক্ষিত মৃৎশিল্পীদের নিয়ে প্রতিমা তৈরি করছেন। মল্লিকা দেবী বলেন, আর চোখে তেমন দেখতে পাই না। তাছাড়া শরীরেও কুলোয় না। কিন্তু মন সয় না, তাই প্রতিটি প্রতিমাতে হাত লাগাতেই হয়। -নিজস্ব চিত্র