Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ইয়াঙ্গুন নদীর রাত

কালবেলা আমার পথপ্রদর্শক বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে ছিলাম রেঙ্গুন বা ইয়াঙ্গুনের প্যাগোডা বা বুদ্ধ মন্দিরগুলো দেখতে। সে কাজ শেষ

ইয়াঙ্গুন নদীর রাত
  • ১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: কালবেলা আমার পথপ্রদর্শক বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে ছিলাম রেঙ্গুন বা ইয়াঙ্গুনের প্যাগোডা বা বুদ্ধ মন্দিরগুলো দেখতে। সে কাজ শেষ। শেষ দুপুরে তখন আমার হোটেলে ফেরার পালা। আমাকে তিনি সোয়েডান প্যাগোডা দর্শন করিয়ে রওনা হয়েছিলেন হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। গাড়ি নিয়ে যে পথে তিনি আমাকে হোটেলে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন সে পথে ঘর-বাড়ি গাছপালার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে ইয়াঙ্গুন নদী। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে স্টিমার-নৌকা ভাসছে সেখানে। সকালবেলা প্রথমে গিয়েছিলাম বোটাডাং প্যাগোডা দেখতে। কিছুক্ষণের জন্য গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম ইয়াঙ্গুন নদীর তীরে। নদী আমাকে বরাবরই আকর্ষণ করে। তার বুকে ভেসে পড়তে ইচ্ছা হয়। তা দেশ বা বিদেশের যেকোনও নদ বা নদী হোক না কেন। ফেরার পথে ইয়াঙ্গুন নদী দেখে সে ইচ্ছা আবার আমাকে পেয়ে বসল। যদিও গরমের মধ্যে নানা প্যাগোডাতে ঘুরে বেড়াবার কারণে শরীর খানিকটা ক্লান্ত তবুও সে ইচ্ছা মনের মধ্যে উঁকি দিতে শুরু করল। তাছাড়া, আর একটা কথাও মনে হল, হোটেলে ফিরেই বা কী করব? তার চেয়ে যদি আরও কয়েকটা জায়গা ঘুরে নেওয়া যায় তবে মন্দ কী? আমার সঙ্গীকে কথাটা জানাতেই তিনি বললেন, ওখানে যাত্রী পারাপারের জন্য অনেক ঘাট আছে বটে কিন্তু বিদেশি ট্যুরিস্টদের বোটে বা স্টিমারে তোলা হয় না সামরিক সরকারের নিষেধাজ্ঞার জন্য।

Advertisement

প্রথমে তাঁর এই কথা শুনে আমি খানিকটা বিমর্ষ হলাম। এই একই কারণে মেকং নদীতে আমি নৌকা ভ্রমণ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম।
কিন্তু এরপরই আমার সঙ্গী বললেন, ‘তবে একটা জায়গায় গেলে আপনার ইচ্ছা পূরণ হতে পারে। এ জায়গা থেকে কিছুটা দূরে ইয়াঙ্গুন নদীর বুকে ‘ইয়ে লে’ নামের একটা প্যাগোডা আছে। নৌকা চেপে সেখানে যেতে হয়। বিদেশি পর্যটকদেরও সেখানে যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাকে তো ফিরতে হবে। তবে আমি অন্য একটা গাড়ির বন্দোবস্ত করার চেষ্টা করতে পারি।’
রেঙ্গুন বা ইয়াঙ্গুনের রাস্তায় গাড়ি চালকদের জন্য আইন বেশ কড়া। ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে শুধু জরিমানা দিয়ে মুক্ত হওয়া যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনদিনের হাজতবাস করতে হয় সামরিক আইনে। গাড়ি চালাতে চালাতে মোবাইল ফোনে কথা বলাও নিষিদ্ধ। সাদা পোশাকের সামরিক কর্মচারীরা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে খেয়াল রাখে কেউ আইন ভঙ্গ করছে কি না। এ কথা আমার সঙ্গী আমাকে জানিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘একটা ভাড়ার গাড়ি পাওয়া গিয়েছে। আমি আপনাকে ‘ইয়ে লে’ ঘাটে পৌঁছে দিচ্ছি। গাড়ি ও ড্রাইভার সেখানেই আছে। আপনার ইয়াঙ্গুন নদী ভ্রমণ আর প্যাগোডা দেখা শেষ হলে ওই গাড়ি আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দেবে।’
বেশ খানিকটা সময় পর আমরা যখন নদী পাড়ে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন বিকেল হয়ে গিয়েছে। গাড়ি থেকে নামলাম দু’জনেই। নদী এখানে বেশ প্রশস্ত। তার বুকে মধ্যবর্তী স্থানে বেশ বড় একটা চর। সেখানে নারকেল গাছে ঘেরা একটা বুদ্ধ মন্দির বা প্যাগোডা দাঁড়িয়ে আছে। বেশ বড় একটা বিদেশি পর্যটক দলও আছে প্যাগোডাতে যাওয়ার জন্য। তাদের গলায় ঝোলানো কার্ড দেখে বুঝলাম কোরিয়া থেকে এসেছেন তাঁরা কোনও এক ট্যুরিজম সংস্থার সঙ্গে। স্থানীয় বার্মিজরাও আছে। আর আছে হাতে পাখির খাঁচা নিয়ে বিবর্ণ পোশাকের কিছু ছোট ছেলেমেয়ে। যাদের আমি আগেও দেখেছি বোটাডাং প্যাগোডার কাছে। যাদের কাছ থেকে পাখি কিনে অনেকে উড়িয়ে দেন পুণ্য লাভের জন্য।
আমার সঙ্গী ফোন করতেই এক গাড়ির চালক এসে হাজির হল। সে আমাকে বলল, ‘আমার চিন্তার কোনও কারণ নেই। সে আমার জন্য এ জায়গাতেই অপেক্ষা করবে। আমি ফিরে এলে আমাকে হোটেলে পৌঁছে দেবে।’
আমার সারা দিনের সফর সঙ্গী এরপর বিদায় নিলেন। বিদায়কালে আমার মনটা খানিক বিষণ্ণ হয়ে গেল। ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর আমি ফেরি ঘাট সংলগ্ন টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কিনলাম। কিন্তু নৌকায় ওঠার জন্য প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হল। কারণ দুটো মাত্র নৌকা যাওয়া-আসা করছে প্যাগোডাতে। নৌকার প্যাগোডাতে যেতে বা আসতে সময় লাগছে দশ-পনেরো মিনিটের মতো। টিকিটের গায়ে লেখা সিরিয়াল নম্বর দেখে যাত্রী তোলা হয় নৌকাতে। এই অবসরে আমি অবশ্য মোবাইল ফোনে সার্চ ইঞ্জিন ঘেটে কিছু তথ্য সংগ্রহ করে নিলাম। ইয়াঙ্গুন নদী আর ‘ইয়া লে’ প্যাগোডা সম্পর্কে।
একটা সময় নৌকাতে ওঠার পালা এল আমার। মাঝারি আকৃতির ছই বিহীন যন্ত্র চালিত নৌকা বা ভুটভুটি নৌকা। ভেসে পড়লাম ইয়াঙ্গুন নদীতে। এ নদী পেগু ও মাইতামাকা নামের দু’টি নদীর সঙ্গমস্থল থেকে উৎপন্ন হয়ে আন্দামান সাগরের মার্তাবন উপসাগরে মিলিত হয়েছে। বলাবাহুল্য এ নদীর নাম অনুসারেই শহরের নাম ইয়াঙ্গুন বা সাবেক রেঙ্গুন। মায়ানমারের সমতল ভূমির সেচের কাজে ক্যানেলের মাধ্যমে এ নদীর জল ব্যবহার করা হয়। বহু মৎস্যজীবীও জীবিকা নির্বাহ করেন এই নদীর ওপর নির্ভর করে। মাছ, বিশেষত শুঁটকি মাছ বার্মিজদের অত্যন্ত প্রিয় খাবার। এ জায়গাতে নদীর জল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। শান্তভাবে বয়ে চলেছে ইয়াঙ্গুন নদী। তার দু’পাড়ে যতদূর চোখ যায় সবুজের সমারোহ। কিছু দূর দূর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে যাত্রীবাহী লঞ্চ বা নৌকা।
এসব দেখতে দেখতেই একসময় নদীর মাঝখানে ইয়ে লে প্যাগোডাতে পৌঁছে গেল আমাদের তরী। কয়েকটা সিঁড়ি ভেঙে প্যাগোডাতে উঠতে হয়। এ প্যাগোডার পুরো নাম ‘কেউকেতান ইয়ে লে’ প্যাগোডা। থেরবাদী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এই প্রাচীন প্যাগোডাটি তৃতীয় শতকে তৎকালীন রাজা বাওগায়েনা ইয়াঙ্গুন নদীর বুকে নির্মাণ করান। ইয়াঙ্গুনের সব প্যাগোডার মতোই এই প্যাগোডাও সোনালি চূড়া মণ্ডিত। উঠে এলাম প্যাগোডা চত্বরে। সেই চত্বর ঘিরে চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু মন্দির। দিন শেষের আলো মন্দির শিখরগুলোকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। নানা স্থানে রয়েছে বুদ্ধ মূর্তি, দেওয়ালের গায়ে আঁকা উজ্জ্বল বর্ণের নানা ছবি ফ্রেস্কো। তবে এ মন্দিরের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ— ছাদ বা অন্য জায়গা থেকে নেমে আসা দরজার মাথার ওপর অপরূপ কারুকাজ মণ্ডিত তাকগুলো। বার্মা কাষ্ঠ শিল্পের জন্য বিখ্যাত। সেই শিল্পের আশ্চর্য সব সুন্দর নিদর্শন ছড়িয়ে আছে ইয়ে লে মন্দিরের নানান জায়গায়। কাঠের প্যানেলের সূক্ষ্ম সব কারুকাজের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হয়। এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে একসময় মন্দিরের পিছনের অংশে এসে উপস্থিত হলাম। এ জায়গাতে ট্যুরিস্টদের ভিড় নেই। সূর্য এবার ঢলতে শুরু করেছে ইয়াঙ্গুন নদীর বুকে। জায়গাটা শান্ত নির্জন। শান বাঁধানো সিঁড়ির ধাপ নেমে গিয়েছে জলের মধ্যে। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে দাঁড়ালাম। অজস্র মাছ এসে হাজির হয়েছে সিঁড়ির সামনে। সন্ন্যাসী তাদের মুড়ি খাওয়াচ্ছেন। মন্দিরের এই পিছনের অংশ থেকে ইয়াঙ্গুন নদীর অপর পাড়টা দেখা যায়। জায়গাটা গ্রামীণ অঞ্চল বলেই মনে হল। সন্ন্যাসীকে সে জায়গার নাম জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু তিনি আমার ভাষা বুঝতে না পেরে শুধু হাসলেন। মাছদের খাওয়ানো শেষ করে তিনি মন্দিরের ওপরে উঠে গেলেন। আমি একলাই দাঁড়িয়ে রইলাম জায়গাটাতে। নদীর বুকে রাঙা আলো ছড়িয়ে ডুবতে বসেছে সূর্য। মৃদু-মন্দ বাতাসও বইতে শুরু করেছে। সেই বাতাসে তিরতির করে কাঁপছে দ্বীপের মতো জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছের পাতাগুলো। আমার সারাদিনের ক্লান্তি যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে সেই বাতাসে। কুমিরের পিঠের মতো এক ফালি লম্বাটে জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই প্যাগোডা নাকি কোনও দিন জলে ডোবেনি। বর্ষা ঋতুতে কোন কোনও সময় ইয়াঙ্গুন নদীর জল তার দু’পাড়ে উঠে এলেও নাকি কখনওই এই চরে ওঠে না। ব্যাপারটা হয়তো ভগবান বুদ্ধর কৃপা অথবা প্রকৃতির কোনও অদ্ভুত খেয়ালে হয়ে থাকে। সংবিৎ ফিরল হুইসেলের শব্দে। নৌকা ডাকছে যাত্রীদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। লোকজনের ব্যবহারে অনুমান করলাম যাত্রীদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এদিনের মতো এটাই শেষ খেয়া। নদীর ওপাড়ে যেখান থেকে ইয়ে লে প্যাগোডাতে যাওয়ার জন্য যাত্রা শুরু করেছিলাম সে জায়গায় নাম বিয়াটবিতান টাউনশিপ। কথামতো আমার ড্রাইভার অপেক্ষা করছিল। তার সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে উঠে বসলাম গাড়িতে। চলতে শুরু করল গাড়ি। সন্ধ্যা নামছে, ধীরে ধীরে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে শহরের আলো। ড্রাইভার হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘সোজা হোটেলেই যাবেন? নাকি তার আগে অন্য কিছু দেখতে যাবেন?’
আমি জবাব দিলাম, ‘প্যাগোডাগুলো তো দেখা হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া এই সন্ধেবেলা দেখার মতো আর কী আছে?’
সে জবাব দিল, ‘এখানে একটা চায়না টাউন আছে। আপনার হোটেল থেকে সে জায়গা বেশি দূর নয়। অনেক ট্যুরিস্টই চায়না টাউনের নাইট লাইফ দেখতে যায়। যে জায়গাটা বেশ অদ্ভুত!’
ড্রাইভারের কথা শুনে জায়গাটার প্রতি আকর্ষণ জন্মাল মনে। সম্ভব হলে সেখান থেকেই রাতের খাওয়া সেরে হোটেল ফেরা যেতে পারে। ইতিপূর্বে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনেরে চায়না টাউনে নাইট লাইফ দেখতে গিয়েছিলাম। সেই জায়গাটা বিদেশি পর্যটকদের ক্ষেত্রে নিরাপদ ছিল না। তাই ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সেখানে গেলে কোনও সমস্যায় পড়তে হবে না তো।’
সে বলল, ‘আমি আপনাকে সঙ্গে করে জায়গাটা ঘুরিয়ে দেখাব। কোনও অসুবিধা হবে না আপনার। শুধু অচেনা কারও ডাকে সাড়া না দিলেই হল।’
আমি সম্মত হলাম তাঁর প্রস্তাবে। এগিয়ে চলল গাড়ি। একসময় আমার হোটেলটাও চোখে পড়ল। তারপর মিনিট দশেকের মধ্যেই একটি হাসপাতালের সামনের পার্কিং লটে এসে দাঁড়াল গাড়ি। ড্রাইভার বলল, ‘মিনিট পাঁচেক পথ আমাদের হেঁটে যেতে হবে।’ ততক্ষণে অন্ধকার নেমে গিয়েছে ইয়াঙ্গুন নদীর পাড়ে। রাস্তায় আলো ঝলমল করছে। পথেও বেশ ট্রাফিক আছে। আলো ঝলমলে রাস্তা ধরে গিয়ে আমরা উপস্থিত হলাম চায়না টাউনের প্রবেশ মুখে। সে জায়গাটা একটা ছোট বাজার মতো। বহু মানুষের জটলা সেখানে। চেহারা দেখেই বোঝা যায় চীনা তারা। কিছু বার্মিজও আছে। বাজারে উজ্জ্বল আলোর নীচে পসরা সাজিয়ে বসে আছে অস্থায়ী দোকানের বিক্রেতারা। প্রধানত খাদ্যদ্রব্যই বিক্রি করছে তারা। অদ্ভুত রকমের সব খাদ্যদ্রব্য। কোথাও পাত্রে রাখা দুধের মধ্যে কিলবিল করছে জ্যান্ত রেশম পোকা! কোথাও বিক্রি হচ্ছে ভাজা রেশম পোকা, আরশোলা, কাঁকড়া বিছে বা গঙ্গা ফড়িং। কোনও কিয়স্কে দড়ি থেকে ঝুলছে ব্যাঙের রোস্ট। বেশ কয়েক জায়গাতে জ্যান্ত ব্যাঙও বিক্রি হচ্ছে। লোকেরা কিনছেও সে সব। পরিচিত খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে নুডুলস, মুরগি বা শুকরের রোস্টও আছে। জায়গাটা ভালো করে দেখার পর ড্রাইভার ভদ্রলোক আমাকে নিয়ে প্রবেশ করল চায়না টাউনের ভিতর।
ছোট গলি রাস্তা। তার দু’পাশে ঢালু ছাদ ঘর-বাড়ি-রেস্তরাঁ। কোথাও দরজার সামনে রাখা আছে ড্রাগনের প্রতিকৃতি, কোথাও ঝুলছে শিল্পের তৈরি চীনা লণ্ঠন। তবে কোনও উজ্জ্বল আলো নেই রাস্তায়। কেমন যেন আলো-আঁধারি পরিবেশ। রাস্তার পাশেই টেবিল-চেয়ার পেতে কোনও কোনও জায়গাতে খাবারের ব্যবস্থা। কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ ট্যুরিস্টকে দেখলাম সেখানে বসে ধূমপান-মদ্যপান করছে। ধূমপান ব্যাপারটা অবশ্য এখানে বেশ চালু। ভাজা মাংসের গন্ধ, অদ্ভুত সব খাবারের গন্ধ। পানীয় আর তামাকের ধোঁয়ার গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত গন্ধ বাতাসে ভাসছে। এ যেন এক অন্য পৃথিবী। মায়ানমারের কঠিন সামরিক আইন সম্ভবত এই চীনা পাড়ায় প্রবেশ করে না। অন্তত চারপাশ দেখতে দেখতে আমার তেমনই মনে হল। হোটেল-রেস্তরাঁ-পার্লারের সাইন বোর্ড সব চীনা ভাষায় লেখা। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গাতে একটা বাড়ির সামনে দেখলাম একদল লোক টাকার তোড়া হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন বিদেশি পর্যটককে দেখলাম তাদের কাছ থেকে ডলার নিয়ে বাড়িটার ভিতর প্রবেশ করতে। আমার সঙ্গীর কাছে জানতে চাইলাম, ‘ওই বাড়িটার ভিতর কী আছে?’
সে বলল, ‘চলুন আপনাকে বাড়িটার ভিতর থেকে একবার ঘুরিয়ে আসি।’ দু’পাশে ড্রাগনের মূর্তি রাখা আছে কাচের দরজার গায়ে। একজন চীনা গেটম্যানও আছে। ড্রাইভার লোকটি তার সঙ্গে কথা বলে আমাকে নিয়ে প্রবেশ করল ভিতরে। বেশ বড় একটা হল ঘরের মতো জায়গা। মাথার ওপর সার সার লাল চীনা লণ্ঠন ঝুলছে। এখানের পরিবেশও অনেকটা আলো-আঁধারি, আর তামাকের ধোঁয়াতে আচ্ছন্ন। নারী-পুরুষ প্রায় সবার হাতেই জ্বলন্ত সিগারেট। কয়েকটা টেবিল ঘিরে লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। আমরা একটা টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বুঝতে পারলাম সেটা জুয়ার আড্ডা। টেবিলের ওপর থরে থরে সাজানো আছে ক্যারামের ঘুঁটির মতো গোল ঘুঁটি আর টাকার বান্ডিল। কোনও টেবিলে আবার তাসের জুয়া চলছে। কয়েকজন লোককে আবার দেখলাম ঘরের এক কোণে বসে গড়গড়ার নলের মতো নল মুখে দিয়ে ঝিমাচ্ছে আর মাঝে মাঝে ধোঁয়া ছাড়ছে। শরৎবাবুর পথের দাবী উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘সব্যসাচী’ সিনেমাতেও এমনই এক জুয়ার আড্ডার দৃশ্য ছিল। যাইহোক, এই জায়গাটাতে বেশিক্ষণ থাকতে ভরসা হল না।
বাইরে বেরিয়ে ঠিক করলাম এখান থেকে খাওয়া সেরেই ফিরব। রাস্তার গায়েই এক উন্মুক্ত স্থানের রেস্তরাঁতে তুলনামূলক নিরাপদ খাবার চাউমিনের অর্ডার দিলাম। নানা জিনিসের সঙ্গে ছোট ছোট মাংসর কুচিও আছে চাউমিনে। খেতে মন্দ নয়। খাওয়া শেষে জানতে পারলাম সেগুলো আসলে ব্যাঙের মাংস!
এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা নিয়ে রেঙ্গুনের চীনা পাড়া থেকে বাইরে বেরবার সময় বুঝতে পারলাম রাত যত বাড়ে এ পাড়ায় ভিড় তত বাড়ে। যখন হোটেলে ফেরার জন্য গাড়িতে উঠে বসলাম তখন দূরে আকাশের বুকে ঝলমল করছে শ্রেনডং প্যাগোডার চূড়ার আলোকমেলা। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ