Bartaman Logo
৭ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

তুতেনখামেনের অভিশাপ!

মিশরের ফারাও তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারে নতুন তথ্য উঠে এসেছে। হাওয়ার্ড কার্টারের গবেষণা ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত। বিস্তারিত পড়ুন।

তুতেনখামেনের অভিশাপ!
  • ৭ জুন, ২০২৬ ০৪:০০

মিশরের ফারাও তুতেনখামেনের নাম ইতিহাস ভুলতে বসেছিল। ভুলেই যেত, যদি না ইংরেজ মিশরবিদ হাওয়ার্ড কার্টার তাঁর সমাধি আবিষ্কার করতেন, তাঁকে বিখ্যাত করে না তুলতেন। মিশরের প্রতি টান তাঁর গড়ে উঠেছিল ছোটো থেকেই। বাবা ছিলেন চিত্রশিল্পী। সেখান থেকেই আঁকায় হাতেখড়ি হাওয়ার্ডের। এটা সেই সময়ের কথা, যখন ব্রিটিশরা সবে মিশর দখল করেছে। সেখানকার ইতিহাস, প্রাচীন ধন-দৌলত সমস্ত কিছুর খবর উঠে আসছে সামনে। বিশেষ করে প্রাচীন মিশরের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব গবেষণা নিয়েই উৎসাহ সব মহলে। হাওয়ার্ডও উৎসাহিত, মিশর নিয়ে আরও পড়াশোনা শুরু হল। ১৭ বছর বয়সে মিশরে পা দিলেন তিনি। নিজের তাগিদেই কাজ শিখতে লাগলেন। তরুণ এই ছেলের কাজে অবাক সবাই। স্বাধীনভাবে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে চাইছিলেন। একসময় সেই সুযোগ এল। বলা ভালো, জীবনের মোড় ঘোরানো প্রস্তাব।

Advertisement

ব্রিটিশ ধনকুবের লর্ড কার্নারভন একটি অভিযানের পরিকল্পনা করছিলেন। তখনও পর্যন্ত একটি বিশেষ মমির খোঁজ পাননি ঐতিহাসিকরা। যাঁর মমি, তাঁর সম্পর্কে রহস্যের কোনো শেষ নেই। ফারাও তুতেনখামেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে যিনি মিশরের সিংহাসনে বসেছিলেন। মারাও গিয়েছিলেন অল্প বয়সেই, মাত্র ১৯ বছর বয়সে। মিশরের এই মমি খুঁজতেই নিয়োগ করা হল হাওয়ার্ড কার্টারকে। ১৯১৪ সালে লর্ড কার্নারভন ও কার্টার খননের পারমিট পেলেও, সে বছরই শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। খননের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১৯১৭ সালের ডিসেম্বরে আবার শুরু হয়েছিল কিশোর ফারাওয়ের সমাধি খোঁজার কাজ। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও সমাধির কাছে পৌঁছনোর মূল ফটকটি পাওয়া যাচ্ছিল না।
এ যেন খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতো অবস্থা! বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে, সঙ্গে এতগুলি লোকের পরিশ্রম, অর্থ। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। মমির কাছে পৌঁছনোর দরজা কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছে না। সকলেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন। এদিকে, ফান্ড তুলে নেওয়ার কথা বলছেন প্রধান পৃষ্ঠপোষক বাকিংহামশায়ারের হাইক্লেরে কাসল-এর মালিক লর্ড কার্নারভন। কিন্তু হাওয়ার্ড কার্টার নাছোড়বান্দা। এত বছর কাজ করছেন, মিশর নিয়ে এত পড়াশোনা করেছেন। কার্টার নিশ্চিত ছিলেন, লাক্সরের বালিতে তুতেনখামেনের অবশেষ চাপা পড়ে আছে। তাঁর বিশ্বাস, ঠিক খুঁজে পাবেন তিনি। 
১৯২২ সালের ৪ নভেম্বরের ঘটনা। তখন তিনি কাজ করছেন। হঠাৎই হুসেন আবদুল রসুল নামে অল্পবয়সি এক ছেলে দৌড়ে আসে তাঁর কাছে। ছেলেটি রোজ গাধার পিঠে জলপাত্র চাপিয়ে নিয়ে যেত। মাটিতে পাত্র বসানোর জন্য গর্ত খুঁড়তে গিয়ে একটা পাথরে ধাক্কা লাগে। পরে দেখা যায়, সেটা কতগুলো সিঁড়ির উপরের দিক। খোঁড়াখুঁড়িতে বেরয় একটা করিডর, দ্বিতীয় একটা বন্ধ দরজা। ভিতরে অপেক্ষা করছে অনন্ত বিস্ময়। কার্টার তক্ষুনি কার্নারভনকে জানান, দুর্দান্ত একটা জিনিস আবিষ্কার করেছি! অভিজ্ঞ কার্টার বুঝতে পারলেন, এটাই সেই সময়। এটাই রহস্যে পৌঁছনোর রাস্তা। সস্ত্রীক লর্ড কার্নারভনও চলে আসেন মিশরে। ২৬ নভেম্বর কার্টার উঁকি দেন মাত্র ১১০ বর্গফুট আয়তনের সমাধিটিতে। আবিষ্কৃত হয় বিখ্যাত স্যাক্রোফেগাস আর মমি, তিন হাজার বছর ধরে শয়ান। সঙ্গে অগুনতি সোনাদানা, হিরে-জহরত। তুতেনখামেনের সমাধিস্থল আবিষ্কারের পর এর ঐশ্বর্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক হাওয়ার্ড কার্টার। বলে উঠেছিলেন, ‘ওয়ান্ডারফুল থিংস!’ ১৪ বছর পরে ১৯৩৬ সালে বিবিসি রেডিওর একটি টক শো-তে বলেছিলেন, ‘আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম, সেই মেঝেতে শেষবার মানুষের পা পড়েছিল তেত্রিশ শতাব্দী আগে। অথচ দেখে মনে হচ্ছিল যেন সদ্য কেউ সেখান থেকে বেরিয়েছে।’ নব্বই বছর পরও হাওয়ার্ড কার্টারের সেই কাটা-কাটা ইংরেজি কণ্ঠস্বর শুনলে আজও শিহরন জাগে।
একটা ছোটো ছেনি দিয়ে প্রবেশপথের দরজায় ফুটো করে মোমবাতি ধরে অন্ধকারে উঁকি দিয়েছিলেন কার্টার। দেখেছিলেন অদ্ভুত সব পশুর মূর্তি আর সোনা। তাঁর ভাষায় ‘সব জায়গায় শুধু সোনার ঝিলিক।’ তুত–আনখ–আমেন–এর সোনার কফিনটির ওজন ছিল ১১০ কেজি ৪০০ গ্রাম। তাঁর মরদেহের মুখে যে সোনার ‘ডেথ মাস্ক’ বসানো হয়েছিল, সেটাই ছিল ১০ কেজির উপরে। গবেষকরা জানিয়েছেন, ওই সমাধিক্ষেত্র থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কেজি সোনা পাওয়া গিয়েছে। আজকের হিসেবে এর মূল্য দেড় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। 
তুতেনখামেন মিশরের ফারাও হিসেবে ধর্তব্যের মধ্যে আসেননি। ছিলেন পুরোহিততন্ত্রের হাতের পুতুল। তবুও প্রচারের সব আলো তুতেনখামেনের উপরেই মাত্র একটি কারণে। তাঁর সমাধি থেকে উদ্ধার হওয়া অতুল ঐশ্বর্যের জন্য। মিশরের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোটো এই সমাধির মধ্যে পাওয়া গিয়েছে ৫ হাজার ৩৯৮টি অপরূপ সামগ্রী। সোনার মুকুট, সোনার শবাধার, তুতেনখামেনের মমি একটির ভিতর আর একটি, এভাবে তিনটি সোনার আধারের মধ্যে রাখা ছিল। বহুমূল্য রত্নরাজি ছাড়াও পাওয়া গিয়েছে উল্কাপিণ্ডের লোহা দিয়ে নির্মিত সুদৃশ্য ছোরা, হাতির দাঁতের হাতলের সঙ্গে উটপাখির পালকের হাতপাখা ইত্যাদি। এছাড়াও ছিল অপূর্ব সুন্দর কারুকাজ করা কাঠের মূর্তি। আর একটি অদ্ভুত কাঠের জানোয়ারের মূর্তি উদ্ধার হয়— যার শরীর ও পা বেড়ালের, মুখটা ঘোড়ার, মুখে গজদন্ত দ্বারা নির্মিত বিড়ালের মতো তীক্ষ্ণ শ্বদন্ত। তিন হাজার বছর সারকোফ্যাগাসে থাকার পর তুতেনখামেনের মমিকে প্রকাশ্যে আনা হয় ১৯২৩ সালের এপ্রিলে। অবশ্য শুধু মমিই নয়, সেই সঙ্গে উঠে আসে বহু মিথ, গল্পকথা আর ‘অভিশাপ’। উঠে আসে মৃত্যুও...।
এরপরই শুরু হয় তুতেনখামেনের মমিকে নিয়ে একের পর এক কাহিনি। কথিত আছে, প্রায় তিন হাজার বছর আগের ওই মমির শবাধার খুলতেই ‘অভিশাপ’ ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত মিশরের পুরানো মমির ঘরগুলি অক্ষত ছিল না। ডাকাতের দল ভিতরের সোনাদানা লুট করে চলে গিয়েছে। কিন্তু সেইদিক থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ছিল তুতেনখামেনের কক্ষ। একটিও ধনরত্ন খোয়া যায়নি। কেউ খুঁজেও পায়নি, পেলেও হাত লাগায়নি। কিন্তু কেন, এটাই প্রশ্ন ছিল হাওয়ার্ড কার্টারের। তখনই সামনে আসে হায়রোগ্লিফিকে লেখা কিছু কথা। ‘তুতেনখামেনের সমাধিতে যদি কেউ প্রবেশ করে, তবে তার জীবনে নেমে আসবে অভিশাপ।’
ওই ঐতিহাসিক ঘটনার ঠিক ছ’মাস পর কায়রোতে আচমকা মারা যান লর্ড কার্নারভন। দাড়ি কাটতে গিয়ে খুরে গাল কেটে যাওয়া কিছু আশ্চর্য নয়। কিন্তু প্রজেক্টের পৃষ্ঠপোষক লর্ড কার্নারভনের ক্ষেত্রে তা হয়ে দাঁড়ায় সেপ্টিসেমিয়া। তখন ওষুধপত্র তত উন্নত ছিল না, তাই ১৯২৩ সালের ৫ এপ্রিল কায়রোতে ওঁর মৃত্যু ঘটে। আবার কাকতালীয়ভাবে ওই দিন সকালেই নাকি লন্ডনে তাঁর পোষা কুকুরটিও মারা যায়। পর পর এই দুই মৃত্যু ঘিরেই জন্ম হয় ‘অভিশাপ’ তত্ত্বের। বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোম্‌সের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েলও এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন। তিনিও বলেছিলেন, মমির ‘অভিশাপে’ই মৃত্যু হয়েছে কার্নারভনের। কী আশ্চর্য, লর্ড কার্নারভনের এক ভাই হঠাৎ অন্ধ হয়ে মারা যান! এরপর একের পর এক মৃত্যু...
তুতেনখামেনের সমাধির ভিতরের ছবি তুলেছিলেন মিশরের যুবরাজ আলি কামেল ফাহমি। ১৯২৩ সালে স্ত্রীর হাতে খুন হন কার্টারের দলের সেই সদস্য। এই অভিযানের আরও এক পৃষ্ঠপোষক জর্জ হঠাৎই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ইভলিন হোয়াইট, যিনি সমাধির খননকাজে যুক্ত ছিলেন, তাঁর দেখা দেয় মানসিক বিষণ্ণতা। আত্মহত্যা করেন তিনি। ওই মমির এক্স-রে যিনি করেছিলেন, সেই ডগলাস রিড মারা যান এক অজানা রোগে। কার্টারের সচিব রিচার্ড বেথেল ১৯২৯ সালে ঘুমের মধ্যেই মারা গিয়েছিলেন। তুতেনখামেনের সমাধিতে প্রবেশ করেছিলেন আমেরিকার ধনকুবের জর্জ গোল্ড। তিনিও অজানা জ্বরে ভুগে মারা গিয়েছিলেন কয়েক মাসের মধ্যে। সমাধিতে প্রবেশ করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ধনী ব্যবসায়ী ওলফ জোয়েল। কয়েকমাসের মধ্যে তাঁকে হত্যা করেছিল অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা। ১৯২৪ সালে সমাধিটি দেখার কয়েকদিনের মধ্যেই কায়রো শহরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল সুদানের গভর্নর জেনারেল স্যার লি স্ট্যাককে। সবই নাকি মমির অভিশাপের ফল। হাওয়ার্ড কার্টার নিজে কখনোই এই ‘অভিশাপের তত্ত্ব’ মানেননি। তিনি বার বার দাবি করেছিলেন, এই মৃত্যুর সঙ্গে ‘মমির অভিশাপে’র কোনো যোগ নেই। তাঁর কোনো ক্ষতিও হয়নি। তুতেনখামেনের সমাধির ভিতর তিনি নির্ভয়ে নিজের কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন ১৯৩২ সাল পর্যন্ত। কাজের শেষে ফিরে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। শুধু পরে ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। সেই রোগেই ১৯৩৯ সালের ২ মার্চ মারা যান কার্টার। বয়স ছিল ৬৪ বছর। অনেকেই বলেন, হাওয়ার্ড কার্টারই সমাধি আবিষ্কার করে তুতেনখামেনকে বিশ্ববিখ্যাত করে দিয়েছিলেন। তাই হয়তো কার্টারকে ক্ষমা করে দিয়েছিল তুতেনখামেনের আত্মা। সত্যিই কি তাই? না নেহাতই কাকতালীয় তুতেনখামেনের অভিশাপ!

সম্পর্কিত সংবাদ