কৌশিক মজুমদার
• ‘পৃথিবীতে বড়ো বয়সের বন্ধু বলে কিছু হয় না। বন্ধু হয়, সেই ছোটবেলায় স্কুল কলেজে পড়বার সময়। তার পর হয় এনিমি বা নন-এনিমি। এই নন-এনিমি দেরই আমরা বন্ধু বলে ধরি।’ বলেছেন শিবরাম। ব্যতিক্রম শুধু প্রেমেন। কারণ, ‘প্রেমেনের মতো মিত্র হয় না।’ সেই প্রেমেন্দ্র একবার খুব অনটনে পড়েছেন। এমন অবস্থায় একটা পোস্টকার্ড পেলেন, ‘কলকাতা এসো, তোমার চাকরি হয়ে গেছে।’ পোস্টকার্ড পাঠিয়েছেন শিবরাম চক্রবর্তী। কিন্তু কীভাবে হবে? প্রেমেন্দ্র তো ইন্টারভিউ দেননি! অফিসের ঠিকানায় পৌঁছে প্রেমেন্দ্র শুনলেন অফিসার বলছেন, ‘আরে মশাই, পাবলিসিটি অফিসারের পদে বেছেবুছে লোক ডেকে বললাম, কাল থেকে জয়েন করো। যাকে আমরা নিলাম সে ছেলে বলছে, ‘আমি তো জয়েন করব না! করবে আমার বন্ধু, প্রেমেন! তাহলে তুমি কে? আমি শিবরাম চক্রবর্তী!’ সেই আপিসে বেশ কিছুদিন চাকরিও করেছেন প্রেমেন। আর শিবরাম? আত্মজীবনীতে স্পষ্ট লিখেছেন, অচিন্ত্য আর শৈলজার মধ্যে লেখক হিসাবে প্রেমেনই বড়ো।
আমাদের বেড়ে ওঠার মফস্বলে অবশ্য বিকেলে সূর্য ঢলে গেলেই বাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ত ক্রিকেট ব্যাট, স্ট্যান্ডার্ড নাইনটি নাইন বল আর আধলা ইঁট দেওয়া উইকেট। যার ব্যাট, সে আউট হলেই খেলা শেষ। ইস্কুলে পৌঁছেই সবার আগে পাশের মাঠে। সেই ধু ধু মাঠটা যেন তেপান্তর। তাতে দৌড়াদৌড়ি, হাওয়াই চটির গোলপোস্টের চটিতে লাগলে গোল হবে কি হবে না-র ঝগড়া করতে করতেই স্কুলের থার্ড বেল বেজে যেত। বাংলা স্যারের প্রথম ক্লাস কেমন ঘোরলাগা ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকা শব্দ হয়ে ভেসে যেত গোটা ক্লাসে।
আর একটু বড়ো হতেই নতুন এক শব্দ আমাদের ডিকশনারিতে ঢুকল। ‘প্রেম’। সে শব্দ বলতে নেই। বললেও ফিসফিস করে বলতে হয়। যারা একটু ডেঁপো, তারা বলত লাইন মারা। ওমুক দিদি তমুক দাদাকে লাইন মারছে। কিন্তু এসব নেহাত পরজীবী কোনো অজ্ঞাত লুতাতন্তু ভেবে নিজেকে নির্বোধের মতো আশ্বস্ত করতাম। বুঝিনি কি মহা সমারোহে একদিন আমাদের বন্ধু-বন্ধুনীরাও সেই জালে জড়িয়ে যাবে।
আমার ছোট্টবেলার এক বন্ধুনী খুব শালিক পাখি মানত। এক চোখে হাত দেওয়া যাবে না, এক শালিক দেখা যাবে না... দুই শালিক দেখলেই পেন্নাম ঠুকে বলতে হবে ‘দুই শালিক নমস্কার/ পা দুটো পরিষ্কার/ মাথাটা কালো/ দিনটা যাবে ভাল।’ সেই ছড়া শুনে আমরা হাসতাম। আমাদের হাসি দেখে সে বলত, ‘হাসছিস তো! পরে টের পাবি। এসমস্ত শাস্ত্রে লেখা আছে। শাস্ত্রের লেখা ভুল হয় না।’ আমি ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে এক চোখ চুলকাতাম। ও দৌড়ে এসে আর এক চোখ টিপে বলত, ‘বলেছি না...!!’ একবার রথের মেলা থেকে পাঁচ টাকা দিয়ে একজোড়া মাটির শালিক কিনল। তারের পা। পরিষ্কার। পরদিন সকালে গিয়ে দেখি তাদের জায়গা হয়েছে ঠাকুরের কুলুঙ্গিতে... বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়া চলছে। আমি দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে ‘মাথাটা ভালো, দিনটা যাবে কালো’ বলেই দে দৌড়। সেও পিছে পিছে তাড়া করেছিল অনেকটা। মায়ের কাছে নালিশও হয়েছিল। মনে আছে।
একটু বড়ো হতেই সেইসব শালিক পাখির দিন, দাড়িয়াবান্ধা, লুকান্তিসচোর, কিতকিত আর লেঙড়ি খেলার বিকেলগুলো হারিয়ে যেতে যেতে একেবারে মিলিয়েই গেল। আমি ছেলেদের খেলা খেলতে শুরু করলাম। ক্রিকেট আর ফুটবল। নিতান্ত নিয়মের নিগড়ে বাঁধা। কিন্তু ‘চল একটা খেলা বানাই’ বলে যে অদ্ভুত খেলা কোন এক ভুলে যাওয়া সন্ধ্যা অবধি আমাদের ব্যস্ত রাখত, হালকা শিমুল তুলোর মতো তারা কোথায় উড়ে উড়ে চলে গেল, জানি না। মেয়ে বন্ধুরা একসঙ্গে বসে গল্প করত। মেয়েদের গল্প। আমরা ঢুকতে গেলেই ‘অ্যাই তোরা যা তো! মেয়েদের কথা শুনতে নেই’ বলে ধমকে তাড়িয়ে দেওয়া হত। পাশেই ইট সাজিয়ে উইকেট বানিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। মন পড়ে থাকত একটু দূরে গোল হয়ে ঘিরে বসা সভার উচ্চকিত হাসিতে। মেয়েদের কী এমন কথা! কেন সেখানে যেতে নেই? উত্তর পেতাম না। এক অজানা নিষিদ্ধ জগত তৈরি হত চোখের সামনেই। কোনোমতে একটা বল সেখানে গেলেই হল। কী সাধ্যসাধনাই না করতে হত! ‘বল দেব না, যা ভাগ! এমন করে বল মারিস কেন, এখানে আসে!’
আমরা কেড়ে নিতে যেতাম। একদিন জানতে পারলাম মেয়েদের সঙ্গে মারামারি করতে নেই। আমরা নাকি বড়ো হচ্ছি। লোকে খারাপ বলে। এ আবার কি কথা! দু’দিন আগেই তো ফ্লাইং ডিস্কটা নিয়ে দু’জনে চুলোচুলি করলাম। তখন কি বড়ো হইনি? কবে বড়ো হলাম? অদ্ভুত অদ্ভুত সব প্রশ্ন জাগত মাথায়। শালিক পাখিরা আসত। চলে যেত। কিন্তু হাত ধরে ‘কিরে প্রণাম কর বলছি’ বলার মানুষগুলি থেকেও ছিল না।
অনেক বছর পরে। সেদিন সেই বন্ধুনীর সঙ্গে দেখা। বাংলার বাইরে ছিল বহুদিন। দু’টি মেয়ে। স্বামী মারা গিয়েছেন আচমকা। সব দিক থেকে সংকটে। কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এখনও দুই শালিক দেখলে প্রণাম করিস?’
‘না রে! পাখি কি আর আমার দিন ভালো-খারাপ করতে পারবে? বেচারাদের দায়ী করে কী লাভ?’ আমার কিন্তু স্বভাবটা বদলায়নি। এখনও দুই শালিক দেখলে অজান্তেই বলে উঠি, ‘দুই শালিক নমস্কার...।’
কিশোরবেলা শেষ হতে না হতে হস্টেলে গিয়ে একঝাঁক বন্ধুর মধ্যে পড়লাম। কত নতুন নতুন জায়গার নাম শুনলাম। সেখান থেকে এসেছে তাঁরা। আর কী সুন্দর সেসব নাম। পাত্রসায়র, নন্দকুমার, কুমারগঞ্জ, বেলপাহাড়ি। আর সেই প্রথম চব্বিশ ঘণ্টা একসঙ্গে কাটানো।
এইটুকু লিখেছি, আচমকা আমার ‘ন্যাকড়া’র গল্পটা মনে পড়ল। প্রথমেই বলে রাখি, ছেলেদের ‘লেডিস’ বলে ডাকা অবশ্যই বুলিং, যদি তা ছেলেটির ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়। কিন্তু অন্যরকম ঘটনাও ঘটে।
হস্টেলে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে আমাদের এক বন্ধু সুদীপকে সবাই ‘লেডিস’ নামে ডাকা শুরু করল। কিছু কিছু জিনিসের কোনো কারণ থাকে না। থাকলেও বোঝা যায় না। দু’হাজার টাকার নোট কেনই বা এল, আর কেনই বা গেল, আজ অবধি যেমন বুঝতে পারিনি, তেমন বুঝিনি সুদীপের মতো সা-জোয়ান অ্যাথলিট আচমকা কেন এই নাম পেল। যে সব চেনা কারণের জন্য একটা ছেলেকে ‘লেডিস’ নামে ডাকা হতে পারে, তার একটাও ওর মধ্যে ছিল না। ফলে সুদীপকে এই নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাতে দেখিনি।
তবে নামটা নিয়ে ওর আপত্তি ছিল। ও সিঙ্গুলার নম্বর। ওকে ‘লেডিস’ কেন ডাকা হবে? তাই কিছুদিন বাদে ওর ইচ্ছানুসারে নাম রাখা হল ‘লেডি সুদীপ’। আরও কিছুদিন পর জানা গেল, সুদীপ দারুণ ক্রিকেট খেলে। ফাস্ট বোলার, ব্যাট-ও ভালো করে। ‘লেডি সুদীপ’ নামটা বদলে সবাই তখন ওকে ‘মহিলা জয়বর্ধনে’ বলে ডাকত। এই নামে ও বেশ খুশিও ছিল। ও বল করলে পাশ থেকে কমেন্ট্রিতে যখন বলা হতো, ‘এবার লেডিস হস্টেলের প্রান্ত থেকে বল করতে আসছেন সেকেন্ড ইয়ারের ফাস্ট বোলার মহিলা-আ-আ-আ-আ জয়বর্ধনে-এ-এ...।’ তখন ওর হাবেভাবে আলাদা আনন্দ দেখতে পেতাম।
মুশকিল হল থার্ড ইয়ারে উঠে। এত বড়ো নাম ধরে ডাকার সমস্যা হওয়াতে কেউ প্রস্তাব করল, ওর একটা সহজ নাম রাখতে হবে। জানি না ওর শাড়ি নামটা কে রেখেছিল, কিন্তু এই নামটা সুদীপের একদম পছন্দ হয়নি। ও বারবার বলেছিল এটা বদলাতে। আমরা ওকে আশ্বাস দিয়েছিলাম, ‘এক বছর অপেক্ষা কর। তোর তো বছর বছর নাম বদলায়। দেখিস সামনের বছর...।’ কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। ফোর্থ ইয়ারে সবাই অল ইন্ডিয়া পরীক্ষা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বেচারা সুদীপের নামের কথা আর কারও মনে রইল না। সে একদিন আমাদের জিএসের কাছে একটা দরবার করল। বলল, ‘দেখ ভাই, এখনও সবাই আমায় শাড়ি শাড়ি বলে ডাকে। কিন্তু শাড়ি নাম তো পুরানো হয়ে গিয়েছে।’
জিএস নিজেও ব্যস্ত ছিল। কাটিয়ে দেবার জন্য সে আশ্বাস দিল, ‘ঠিক আছে। শাড়ি পুরানো হয়ে ন্যাকড়া হয়েছে। তাই তো? আমি সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছি।’ বেচারাকে এই ‘ন্যাকড়া’ নাম নিয়ে আরও বছর দুই কাটাতে হয়। পিএইচডি’র শেষ দিকে ‘ন্যাকড়া’ বদলে ‘নেকড়ো’, ‘নেকড়ে’, ‘নেকো’ অবধি হয়েছিল জানতাম।
এত কথা বলার একটাই কারণ। সুদীপ এখন প্রফেসর। সেদিন আমাদের এক জুনিয়র দেখি এক লিস্টি বানাতে গিয়ে মাঝে নাম লিখেছে, এন কে মিত্র। এই নামে কাউকে চিনলাম না। পরে শুনি চাকরিতে ঢোকার পরও সবাই সুদীপকে এন কে স্যার অথবা এন কে দা নামেই ডাকে। আর ও নাকি দিব্যি সাড়াও দেয়!
তবে হস্টেলের সব বন্ধু যে ঠিক বন্ধু নয়, তার জন্য একটা উদাহরণ-ই যথেষ্ট। শুনে যেমন মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আদপেই তেমন না। একটু খুলে বলা যাক। এই গল্পে অবশ্য প্রেমের ভূমিকাও কম নয়। আমাদের এক বন্ধুর প্রেম করার খুব ইচ্ছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও মেয়ে জুটছে না। ছেলেটি দেখতে শুনতে মন্দ না, চেহারাও ভালো, পড়াশুনোতে নেহাত খারাপ বলা চলে না। তবে প্রেম হচ্ছে না কেন?
একদিন অনেক ভেবেচিন্তে সে একটা সিদ্ধান্তে এল। প্রেম না হবার কারণ নাকি একটা নয়, তিন-তিনটে। প্রথমত, সে খুব একটা বড়োলোক ঘরের ছেলে না। দ্বিতীয়ত, মাথায় আবার চুলের অভাব (যদিও দেহের বাকি অংশে প্রয়োজনের তুলনায় বেশিই আছে, এমনটাই তার দাবি। চাক্ষুষ প্রমাণ দেখা হয়নি)। তৃতীয়ত, তার পদবি।
এইখানে বলি, তার পদবি ছিল মিস্ত্রি। এই পদবিতে আদৌ লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। একই পদবিধারী আরও তিন-চারজন হস্টেলে ছিল। তাদের বান্ধবীও ছিল (কখনও কখনও আবার একাধিকও বিদ্যমান)। কিন্তু তৃতীয় পয়েন্ট নিয়ে মিস্ত্রি পদবিধারী আর এক বন্ধু খুব সিরিয়াস হয়ে গেল।
‘তুই বললেই হল পদবিতে সমস্যা? কই, আমার তো কোন সমস্যা হচ্ছে না!’
‘তাও বটে। তবে কি করা যায় বল দেখি?’
‘শোন। এই মুহূর্তে বড়োলোক হওয়া সম্ভব না। চুলের যা অবস্থা, চুলও বাড়বে না। আমার মনে হচ্ছে সমস্যা তোর নামে। এই সলিল নামটা বড্ড সেকেলে। তুই নতুন নাম নিয়ে দেখ।’
‘নতুন নাম নেবার কী পদ্ধতি আছে?’
‘সে সব অনেক ঝামেলা। আইন আদালত করতে হয়। আপাতত মেয়েরা ফোন করলে অন্য নাম বলবি। নতুন ধরনের নাম। ট্রেন্ডি’
‘যেমন?’
‘যেমন ধর দিলওয়ালে দুলহনিয়ার শাহরুখ খান। রাজ নাম নিয়েছিল। সলমান খানের স্ক্রিন নাম প্রেম। এমন ধরনের সব।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ। কী যে উপকার করলি...।’
এর জাস্ট চারদিন পরের ঘটনা। তখন ইয়াহু মেসেঞ্জার নামে একটা চ্যাটবক্স খুব জনপ্রিয় ছিল। সেখান থেকে এক মেয়ের নম্বর জোগাড় করেছে সে। দু’-একবার চ্যাট হয়েছে। এবার আসল কাজ। কথা বলা। ছেলেটির হাতে ফোন। চারিদিকে ঘিরে আছে আরও চার-পাঁচটা মাথা। কথা যেমন হল...
‘হ্যালো’
‘হ্যাঁ, বলুন’
‘ভাল আছ?’
‘হ্যাঁ’
‘চ্যাট বক্সে তো তোমার নাম রিয়া ২০০১। আসল নাম কী?’
‘প্রিয়াঙ্কা। প্রিয়াঙ্কা মন্ডল। আপনার?’
‘রাজ’
‘রাজ কী?’
‘রাজ মিস্ত্রি’
যখন সে ভুল বুঝতে পারল, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। হাতের তীর বেরিয়ে গিয়েছে আগেই। মেয়েটি ফিক করে হেসে ফোন কেটে দিয়েছে।
তারপর কত চন্দ্রভুক অমাবস্যা কেটেছে। বন্ধুতা এখন শুধু ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপের শুভ বিজয়াতে সীমিত। মুঠোফোনে সবার ফোন নম্বর। তবু ডায়াল করে কেউ বলি না, ‘বন্ধু কি খবর বল? কতদিন দেখা হয়নি।’ বুঝতে পারি, বুড়ো হয়েছি, বড়ো হতে পারিনি। অক্লেশে বন্ধু বলে ডাকার আগে কতবার মনে মনে ভাবি। মাঝে মাঝে হাহাকারের মতো সংবাদ আসে। কুন্তল ছেড়ে গিয়েছে। বাবুইসোনাও। সেদিন সবাই সবাইকে ফোন করি। বলি, সাবধানে থাকিস। মাঝে মাঝে চেক-আপ করাস। আর ভয়ে ভয়ে থাকি, এই বুঝি আমার পালা এল।
তারপর সবকিছু আবার আগের মতো। চোখের সামনে দৃশ্য ভেসে যায়। পুরানো অ্যালবাম খুলে সেই ধূসর বা সেপিয়া টোনের ছবিগুলো যেন চেনা চেনা। কোন বিস্মৃত অতীতে আমি এর অংশ ছিলাম। কিন্তু সেই আমি আর আজকের আমিতে বিস্তর প্রভেদ। মানতে চাই না। সব ভুলিয়ে দেওয়া, সর্বরোগহর নস্টালজিয়াতে নিজেকে ডুবিয়ে দিতে চাই। বোঝাতে চাই, আমি ওটাই... এখন বদলেছি হয়তো। চাইলেই ঠিক আগের মতো হয়ে যেতে পারব। কিন্তু বদলে যাওয়ার এই নিত্যতা যে নেহাত রাসায়নিক পরিবর্তন আর সর্বদাই একমুখী তা অস্বীকার করি প্রতি মূহূর্তে...।
অ্যালবামের ছবি আমাদের এক কল্পজগতে নিয়ে যায়... সেখানে সবাই খুশি। সবাই ভালো। এই তো কুন্তল, এই তো বাবুইসোনা, দু’জনে দু’জনের কেমন গলা জড়িয়ে হাসছে... যেন চিরটাকাল এইভাবেই কাটবে। সময়ের নিয়ম মেনেই মানুষগুলি চলে গেছে। সম্পর্কের ইতি ঘটেছে... রয়ে গেছে আমাদের সবার আত্মার কিছু কিছু অংশ। ছবি সেই মৃত আত্মাদের মিউজিয়াম। এ জাদুঘরের অলিতে গলিতে ফেলে আসা সুখেরা ঘুরে বেড়ায়। লম্বা ডোরিয়ান থামের আড়ালে অপেক্ষা করে বিষাদ। অলস ভাবনারা আটপেয়ে বিশাল কালো মাকড়শার মতো আবেগের তন্তু দিয়ে জাল বুনে চলে। অদ্ভুত এক বায়োস্কোপের মতো যে আমিকে এককালে আমি চিনতাম, তাঁর অনেকদিন আগে ভুলে যাওয়া, মনের গভীরে পুঁতে রাখা স্মৃতির বীজ চারাগাছ হয়ে চোখের সামনে ডালপালা মেলতে থাকে...
অ্যালবামের শেষ পৃষ্ঠা এলে কালবৈশাখীর ঠিক আগে উড়তে থাকা শুকনো বকুল পাতার মতো খড়খড় করে আমার এতদিনের ফুরিয়ে যাওয়া জীবন, কুড়িয়ে নেওয়া জীবনের সঙ্গী সব অপার্থিব চরিত্ররা বাস্তবের তীব্র হাওয়াতে উড়ে যেতে থাকে। হাত বাড়াই। যদি এদের একটা দুটোকে আটকে রাখা যায়... বৃষ্টি নামে। আমার করতল ভেসে যায় সংলাপে সংলাপে। সেই সব সংলাপ, যা এককালে আমার জন্য রচিত হয়েছিল। সেই সব সংলাপ, যা আর শুনতে পাব না কোনোদিন। আমি হাত মুঠো করি। তাঁরা আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে গলে পড়তে থাকে বিস্মৃতির শ্যাওলামাখা কাদাজমিতে... আমি সেই সব বন্ধুদের গালে হাত বুলাই। রাতে ঘুমানোর
আগে বালিশের পাশে রাখি। যেন বন্ধুরা ফিরে এসেছে
কতকাল বাদে...



