‘এক যে ছিল গাছ
সন্ধে হলেই দু’হাত তুলে জুড়ত ভূতের নাচ।’
‘মায়াতরু’— অশোকবিজয় রাহা
‘এক যে ছিল গাছ
সন্ধে হলেই দু’হাত তুলে জুড়ত ভূতের নাচ।’
‘মায়াতরু’— অশোকবিজয় রাহা
এ তো না হয় কবিতার কথা। বাস্তবেও কি মায়াতরু থাকতে পারে! তরু মানে গাছ। ছোট্ট বন্ধুরা, ধর, বাড়িতে টবে একটা ছোটো গাছ লাগিয়েছ। কিন্তু বেশ কিছুদিন কোনো কারণে তাতে জল দাওনি। তাতে কী হবে? কিছু দিন পর গাছ শুকিয়ে একেবারে ধূসর হয়ে যাবে। কিন্তু যদি এমন হত, সেই মরা গাছে জল দিলেই সেটি আবার সবুজ পাতা মেলে দিল। সত্যি এমন হলে দারুণ মজার হত, তাই না? এটা কিন্তু কোনো কল্পনা নয়। প্রকৃতিতে সত্যিই এমন ঘটে। এগুলিকে বলা হয় রেজারেকশন প্ল্যান্ট বা পুনরুত্থিত উদ্ভিদ। এগুলি বেশ কয়েক মাস শুকনো অবস্থাতেই বেঁচে থাকতে পারে। গাছের শিকড়, ডালপালায় জলের জোগান শূন্য হয়ে পড়লেও এই উদ্ভিদগুলি নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারে। তারপর জল পেলেই আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মনে কর, শুকিয়ে খসখসে হয়ে গিয়েছে কোনো একটা গাছের ডালপালা। ধূসর রঙের শুকিয়ে যাওয়া ঘাসের দলার মতো। কিন্তু ভেতরে অদ্ভুত এক জাদু। তীব্র গরম ও রোদে যখন মাটি ঝলসে ফুটিফাটা হয়ে পড়ে, তখন ওই গাছ নিজেকে গুটিয়ে একটি বলের মতো করে ফেলে। আর বাতাসে গড়াগড়ি খায়। এক জায়গা থেকে বাতাসের ঝাপটায় উড়ে যায় অন্য জায়গায়তেও। তারপর আকাশজুড়ে মেঘ। আর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। আর সেই জলের ছোঁয়াতেই অবাককাণ্ড। শুকনো ঘাসের দলাটায় হঠাৎ একটু একটু করে সবুজের ছোঁয়া লাগে। বেরয় কচি কচি পাতা। আর ঝকঝকে হাসির মতো ফুলও ফোটে। যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসে ওই মায়াতরু। এগুলি এমন বিশেষ প্রজাতির উদ্ভিদ, যারা বছরের পর বছর খরা বা প্রতিকূল পরিবেশে সম্পূর্ণ শুকিয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। আমরা সবাই জানি, সারা পৃথিবীর সামনে বড়ো বিপদ জলবায়ু পরিবর্তন। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো অনাবৃষ্টি-খরা। এর প্রভাব পড়ছে কৃষিকাজে। এই পরিস্থিতিতে এই রেজারেকশন প্লান্টের জেনেটিক কোড নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। জেনেটিক কোড হল— শরীরে থাকা জীবনের মূল নকশা বা গোপন সংকেত। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই উদ্ভিদের জিনগত বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতে খরা বা অনাবৃষ্টির প্রকোপ এড়িয়ে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। ফলে খাদ্য শস্যের জোগান অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে এই গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় ২ লক্ষ ৯৫ হাজার ৪০০টি সপুষ্পক উদ্ভিদের প্রজাতির মধ্যে মাত্র ১৩৫টি প্রজাতি হল রেজারেকশন প্লান্ট। বিশ্বের বিভিন্ন মরুভূমি ও শুষ্ক অঞ্চলে এদের দেখা মেলে। এখন ক্যাকটাসের কথা মনে হতে পারে। কিন্তু রেজারেকশন প্লান্টের সঙ্গে ক্যাকটাসের তফাত রয়েছে। ক্যাকটাস প্রবল জলশূন্যতা সহ্য করতে পারে না। এগুলি জলশূন্যতা প্রতিরোধ করতে পারে। বেশিরভাগ উদ্ভিদই ১০ থেকে ৩০ শতাংশ জলশূন্য হয়ে পড়লে মারা যায়। কিন্তু রেজারেকশন উদ্ভিদ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত জলশূন্যতা সহ্য করেও টিকে থাকতে পারে। এই ম্যাজিকের রহস্য কী? মাটি জলশূন্য হয়ে পড়লে গাছের শিকড় পাতায় বার্তা পাঠিয়ে দেয়। পাতা হল গাছের রান্না ঘর। সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে গাছ নিজেদের খাবার গ্লুকোজ বা শর্করা তৈরি করে পাতার মধ্যে। শরীরে ৯০ শতাংশ জল হারিয়ে ফেললে এই গাছ বিপাকীয় কাজ বন্ধ করে দেয়। পাতাগুলো কুঁকড়ে যায়। সেইসঙ্গে বিশেষ ধরনের রক্ষাকবচ তৈরি হয়। গাছের ভেতরে ট্রেহালোজ ও সুক্রোজ নামের বিশেষ শর্করা এক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী ভূমিকা নেয়। গাছ জলশূন্য হয়ে পড়লে এই বিশেষ ধরনের শর্করা কোষের অন্দরে আঠার মতো জমাট বেঁধে যায়। কোষের নরম অংশগুলো যাতে ভেঙে বা ফেটে না যায়, সেজন্যই এই সুরক্ষা বর্ম। অনেকটা ঠিক কাচের গ্লাস, কাপ বা অন্যান্য সামগ্রীকে যেভাবে বাবল র্যাপে মুড়ে রাখা হয়, এটা ঠিক তেমন ব্যাপার। আবার জলশূন্য অবস্থায় রাসায়নিক বিক্রিয়া এড়াতে পাতার ক্লোরোফিলও ভেঙে যায়। এধরনের আরও কিছু বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের টিকিয়ে রাখে রেজারেকশন গাছ।