সংবাদদাতা, রামপুরহাট: চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে রামপুরহাটের দেখুরিয়া গ্রামে জগদ্ধাত্রীর আরাধনা হয়ে আসছে। চন্দনগর, কৃষ্ণনগর ছাড়াও এই গ্রামের প্রাচীন জগদ্ধাত্রী পুজোয় আনন্দে মেতেছেন বাসিন্দারা। বেশ কয়েক বছর ধরে মণ্ডপ, আলো আর প্রতিমার অভিনবত্বে রামপুরহাট সহ আশপাশের শতাধিক গ্রামের মানুষজন ছুটে আসেন এই গ্রামে। মেলাও বসে। এবারই প্রথম গ্রামের মেয়েরা শোভাযাত্রা সহকারে ডান্ডিয়া নাচের মধ্য দিয়ে দেবীর উত্তর বাহিনী দ্বারকা নদ থেকে ঘট ভরে নিয়ে আসবেন।
দেখুরিয়া গ্রামে মা জগদ্ধাত্রী ইষ্টদেবী। তাই ইষ্টদেবীর আরাধনায় সেজে উঠছে গ্রাম। এই পুজো ঘিরে দেখুরিয়া সহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা উন্মাদনায় মাতেন। কথিত আছে, দেখুরিয়া গ্রামে অধিকাংশ ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের বসবাস। এই গ্রামে কাপালিক শতঞ্জীব ভট্টাচার্যের প্রতিষ্ঠিত কালী পুজো এখনও হয়ে আসছে। এই গ্রামের একটা অংশ কালী মন্ত্রে, আরেকটা অংশ জগদ্ধাত্রী মন্ত্রে দীক্ষিত। কথিত আছে, প্রায় চারশো বছর আগে দক্ষিণাকালী পুজোর সঙ্গে জগদ্ধাত্রী মায়ের আরাধনা শুরু হয়। প্রথমদিকে গ্রামের মঙ্গল কামনায় তাল পাতা দিয়ে ঘেরা জায়গায় অস্থায়ী বেদি বানিয়ে তন্ত্রমতে দেবীর আরাধনা শুরু হয়। বর্তমানে স্থায়ী বেদি নির্মাণ হয়েছে। প্রধান পুরোহিত রতন ভট্টাচার্য বলেন, গ্রামের সকলের মঙ্গল কামনায় এই পুজোর প্রচলন হয়েছিল। এখানে দক্ষিণাকালী গ্রাম্য দেবতা। আর জগদ্ধাত্রী মা ইষ্টদেবী।
পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাস মুখোপাধ্যায়, সায়ন ভট্টাচার্য বলেন, মা এখানে খুবই জাগ্রত। আগে পুজো উপলক্ষ্যে প্রতিটি বাড়ি থেকে চাল সংগ্রহ করা হতো। সেই চাল বিক্রির টাকায় মায়ের আরাধনা হতো। এখন গ্রামের সকলের আর্থিক সাহায্যে এই পুজো হয়। মায়ের পুজোর জায়গায় এলাকার বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় একটি সাংস্কৃতিক মঞ্চ বানিয়ে দিয়েছেন। সেখানেই মণ্ডপ গড়ে পুজোর আয়োজন হয়ে আসছে। এছাড়া ২০১৭ সালে ৩১ লক্ষ টাকায় মন্দির চত্বর সাজিয়ে তোলে টিআরডিএ।
বর্তমানে এই পুজোয় আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। পুজোর বাজেটও বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে জৌলুস ও জাঁকজমক বেড়েছে। এবার ১০ফুট উচ্চতার প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জা করা হয়েছে। থাকছে নানা আলোকসজ্জা। এলাকার মানুষের কাছে দুর্গাপুজোর থেকেও এই জগদ্ধাত্রী পুজোর উন্মাদনা অনেক বেশি। উৎসবের দিনগুলিতে এলাকা গমগম করে। বিয়ে বা কর্মসূত্রে অন্যত্র চলে যাওয়া সকলেই নিজের গ্রামে ফিরে আসেন।
এই পুজোয় নবমীর দিনেই একসঙ্গে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর পুজো হয়। বৃহস্পতিবার গ্রামের মহিলা ও কুমারীরা শঙ্খ ও উলুধ্বনি দিয়ে এক কিলোমিটার দূরের দ্বারকা নদ থেকে ঘট ভরে নিয়ে আসবেন। থাকবে গ্রামের মহিলাদের ডাণ্ডিয়া নাচ, প্রচুর ঢাক সহ নানা বাজনা। ওইদিন চারটি ছাগ বলি হবে। রাতে হাজার পাঁচেক মানুষকে পাত পেড়ে ভোগ খাওয়ানো হবে। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী, পরেরদিন সন্ধ্যায় গ্রাম প্রদক্ষিণ করিয়ে দেবীকে নিরঞ্জন দেওয়া হয়। বহু মানুষ নিরঞ্জন যাত্রায় অংশ নেন। থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গ্রামের স্কুল পড়ুয়াদের নিয়ে জগদ্ধাত্রী নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। পুজোর আর এক উদ্যোক্তা অমিতাভ চট্টোপাধ্যায় বলেন, পুজোর দু’দিন মিলনক্ষেত্রে পরিণত হবে এই
গ্রাম। -নিজস্ব চিত্র