সংবাদদাতা, রামপুরহাট: ছোটবেলায় বাংলার দুর্ধর্ষ ডাকাতদের গল্প নিশ্চয় অনেকেই শুনেছেন। কেউ কেউ হয়ত বইতে পড়েছেনও। শক্ত সমর্থ পেশিবহুল চেহাড়া, ইয়া বড় গোঁফ, কপালে লাল তিলক, হাতে বল্লম বা লাঠিধারী সেই সব ডাকাতদের কাহিনী শুনলে আজও যেন শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। ডাকাত কথার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে বিষয়টি তা হল কালীপুজো। শোনা যায়, সেই সময় ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে শক্তির আরাধনা হিসাবে কালী পুজো করত তারা। ডাকাতির করে ফিরে সমস্ত লুট করার সামগ্রী অর্পণ করত মায়ের চরণে। ডাকাতদের পূজিতা সেইসব কালীই পরবর্তীকালে ডাকাত কালী নামে পরিচতি হয়ে উঠেছে। যেমনটা নলহাটি শহরের কামারপাড়ার ডাকাতকালী। ডাকাতরা আগে মশাল জ্বালিয়ে পুজোয় বসত। তাই আজও পুজোর শুরু থেকে বিসর্জন পর্যন্ত জ্বলে মশাল। সোমবার নিশিরাতে বহু মানুষ সেই পুজো দেখতে ভিড় জমান।
একটা সময় জঙ্গলময় ছিল কামারপাড়া। পাশেই রয়েছে জঙ্গলে ঘেরা পুকুর। যা বর্তমানে ডাকাতিপুকুর নামে পরিচিত। কথিত আছে, ডাকাতদের গোপন আস্তানা ছিল সেই জঙ্গল। আনুমানিক ১২২৯ সালে শক্তির আরাধনা করতে তালপাতার ছাউনি গড়ে মৃন্ময়ী কালীপুজো শুরু করে ডাকাতরা। কথিত আছে, ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে তারা গভীর রাত পর্যন্ত কালীর সামনে পুজোয় বসতেন। দিত ছাগবলি। এরপর তারা ডাকাতির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ত। সূর্যের আলো ওঠার আগেই তারা ফিরে আসত মন্দিরে। সমস্ত লুট করার সামগ্রী অর্পণ করত মায়ের চরণে। ডাকাতদের পূজিতা এই কালীই এখন ডাকাতকালী নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে জঙ্গল কেটে ধীরে ধীরে বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে এই কামারপাড়া নলহাটি পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অর্ন্তগত।
এলাকার বাসিন্দা অংশুমান দাস বলেন, ডাকাতদের অবলুপ্তির পর এই পুজোর দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন স্থানীয় উমা দত্ত, পঞ্চানন দাস, কাশীরাম মিত্র সহ কয়েকজন। প্রথমে সামিয়ানা টাঙিয়ে পুজো হয়ে আসত। পরবর্তী সময়ে এলাকার বাসিন্দা শ্যামপ্রসাদ দত্ত, রামশংকর দত্ত, মায়ের বেদী ও পাকা মন্দির নির্মাণ করে দেন। বর্তমানে মন্দিরে বসেছে মার্বেল, নির্মিত হয়েছে ভোগঘর। বর্তমানে শহরের প্রাচীন এই পুজো এলাকাবাসীর কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে হয়ে আসছে। এখানে প্রাচীন প্রথা মেনে পুজো শুরুর আগে মন্দিরে মশাল জ্বালানো হয়। যা বিসর্জন পর্যন্ত জ্বলে। নিশিরাতে পুজোয় প্রচুর ছাগ বলিদান হয়। পরে পাঁঠার মাংস দিয়ে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়। সারারাত জেগে কয়েকশো পুজো দেখেন। আজ সকালে এলাকার মানুষকে খিচুরি ভোগ খাওয়ানো হবে।
পুজো কমিটির সহ সভাপতি প্রণব ফুলমালি বলেন, দেবী এখানে খুবই জাগ্রত। কাউকে নিরাশ করেন না। তাইতো পুজোর রাতে শহর ও লাগোয়া গ্রাম থেকে বহু মানুষের ঠিকানা হয়ে ওঠে এই মন্দির চত্বর। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী আজ দেবীকে কাঁধে চাপিয়ে নাচাতে নাচাতে শহর প্রদক্ষিণ করানো হবে। প্রতিবারই প্রচুর মানুষ সেই নিরঞ্জন যাত্রা দেখতে শহরের রাস্তার দুধারে ভিড় জমান। গভীর রাতে ডাকাতিপুকুরে দেবীমূর্তি বিসর্জন দেওয়া হবে।