সুমন তেওয়ারি , আসানসোল: মোদি সরকারের বেসরকারিকরণ নীতির অভিঘাত! এই প্রথম কুলটির চিনাকুড়িতে ফিকে হতে চলেছে পুজোর আনন্দ। গতবছরও এখানে ধুমধাম করে উমার আরাধনার মাততেন বাসিন্দারা। নতুন নতুন জামা-কাপড় সবার গায়ে। বড় বড় প্যাণ্ডেল। কোথায় থিম...কোথাও সাবেকিয়ানা। টানা চারদিন হইহুল্লোড়। পুজো দেখা। কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া-দাওয়া। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ছবিটা বদলে গিয়েছে সম্পূর্ণভাবে। এবছর আর পুজোর সেই জৌলুস থাকছে না। মনমরা সকলেই।
কোলিয়ারি বেসরকারিকরণ হলে খনি অঞ্চলের অর্থনীতি শুকিয়ে যাবে। এমনটাই দাবি ছিল বিজেপি বিরোধীদের। কিন্তু, বেসরকারিকরণে একবগ্গা ছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। একের পর এক কয়লা খনি বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়। তালিকায় ছিল চিনাকুড়ির একাধিক কোলিয়ারি। মোটা মাইনের স্থায়ী শ্রমিকরা অন্যত্র স্থানান্তর হয়ে যান। তাঁদের একদিনের মজুরিতেই ঘটা করে হতো চিনাকুড়ির সব পুজো। এবার বাইরে থেকে চাঁদা তুলে পুজো টিকিয়ে রাখাই চ্যালেঞ্জ উদ্যোক্তাদের।
এক সময়ে চিনাকুড়ি অন্যতম সমৃদ্ধশালী খনি অঞ্চল হিসেবে নামডাক ছিল। এশিয়ার গভীরতম কয়লা খনি ছিল এখানেই। দামোদরের নদের তলদেশ দিয়ে ভূগর্ভস্থ খনির সূড়ঙ্গ গিয়েছে। ইসিএলের সোদপুর এরিয়ার অন্তর্গত চিনাকুড়ি ১, ২ ও ৩ এবং দুধেশ্বরী খনি থেকে হতো বিপুল কয়লার উত্তোলন। মোটা মাইনের শ্রমিকদের বসবাসে এলাকা ছিল জমজমাট। চাঙ্গা ছিল অর্থনীতি। চিনাকুড়ি ১, ২ নম্বর কোলিয়ারি এবং চিনাকুড়ি ৩ নম্বর কোলিয়ারির অদূরে মাঠে বড় করে দুর্গাপুজোর আয়োজন শুরু হয়েছিল। বাজেট নিয়ে ভাবনা ছিল না উদ্যোক্তাদের। খনি শ্রমিকরা একদিনের মজুরি দিয়ে দিতেন উৎসবে। ইসিএলের স্থায়ী শ্রমিকদের এক একজনের দৈনিক মজুরি ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। মুক্তহস্তে সবাই দান করতেন। লক্ষ লক্ষ টাকার প্যান্ডেল হতো। এবার সবকিছু থমকে থেমেছে। সৌজন্যে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত। চিনাকুড়ি ১,২ ও চিনাকুড়ি ৩ এই দুটি কোলিয়ারি ও দুধেশ্বরী কোলিয়ারি বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী শ্রমিকদের অন্যত্র বদলি করে দেওয়া হয়েছে।
চিনাকুড়ি ১, ২ নম্বর কোলিয়ারির ৩০০ জন স্থায়ী শ্রমিক নিজেদের একদিনের মজুরি পুজোর জন্য দিতেন। গড়ে তিন হাজার টাকা করে মজুরি পুজোর কোষাগারে জমা পড়লে পরিমাণটা অনেক। তাতেই বিগ বাজেটের পুজো করতে অসুবিধা হতো না উদ্যোক্তাদের। সেভাবে কারও কাছে চাঁদা চাইতে যেতে হতো না।
এবার পরিস্থিতি অন্যরকম। পুজোকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে চাঁদা আদায় ছাড়া উপায় নেই। পুজো উদ্যোক্তা তথা আইএনটিটিইউসির নেতা রামাশিস যাদব বলেন, ‘পুজো করা নিয়ে এবার বেশ বিপাকে পড়েছি। বিজেপি সরকারের বেসরকারিকরণ নীতির জেরে দুর্গাপুজো বন্ধ হওয়ার জোগাড়। আমরা স্থানীয়দের কাছ থেকে অর্থসাহায্য নিয়ে কোনওরকমে পুজো করছি।’
চিনাকুড়ি ৩ নম্বর মাঠের দুর্গাপুজো খনি অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। নানা থিমের মণ্ডপ হতো। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন পুজোর চারদিন। এবার তাঁরাও মহা বিপদে। এই কোলিয়ারির ৫০০ জন স্থায়ী শ্রমিকই বদলি হয়ে গিয়েছেন। তাঁদের একদিনের মজুরি মিলবে না। সিটু নেতা তথা পুজো কমিটির কর্তা নিশীথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘কোলিয়ারি বেসরকারিকরণে শুধু পুজোতেই সঙ্কট তৈরি হয়নি। গোটা এলাকার অর্থনীতিও ভেঙে পড়েছে।’