এশিয়াডে পদক জিতেছেন দেশের সোনার মেয়েরা। প্রচলিত খেলার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা কন্যেরা। স্পনসরশিপ, অর্থ ও পরিস্থিতি যাঁদের বিপরীতে। এই সাফল্যে প্রাণ জুড়ায়। কিন্তু তুলে দেয় বহু প্রশ্ন।
রেশন দোকানের সামনে লম্বা লাইন। হঠাৎ জোরে বেজে উঠল হাতের ভাঙা কি-প্যাড ফোন। এক হাতে ধরা বিপিএল কার্ড। অন্য হাতে রেশনের ব্যাগ। সুদেশ দেবী বেশ বিরক্ত ফোনটা আসতে। কোনোক্রমে ভিড় সামলে ফোনটা কানে চাপলেন।
‘নীরু গোল্ড জিতি হ্যায়, এশিয়াড মেঁ।’
রেশন দোকানের চিৎকার, যানবাহনের আওয়াজ। ভালো করে শোনাও যাচ্ছে না কী বলছে ফোনে। ভালো করে শুনতে পেলেন শুধু তিনটি শব্দ। নীরু, এশিয়াড ও গোল্ড। দরিদ্র জননী তখন চাল-গমের লাইনে। তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরে সাংবাদিকদের দেখেও তাঁর ঘোর কাটে না। সত্যিই তাঁর নীরু সোনা জিতেছে! জানতে পারেন, শুধু সোনাই নয়, নীরু ভেঙে দিয়েছেন আগের এশিয়ান রেকর্ডের ২৪-এর নজির। ব্যক্তিগত ট্র্যাপে সোনার পাশাপাশি মহিলাদের দলগত ট্র্যাপে রুপোও জেতেন তিনি। পরে মিক্সড দলগত ট্র্যাপেও সোনা আসে নীরুর ঝুলিতে। চোখে মুখে বিস্ময়, সন্দেহ ও আনন্দের সমাবেশ সুদেশের। কর্তা সুরেশ ধান্দা ও তিনি মিলে তাঁদের আদরের দুলালিকে তৈরি করছিলেন। কত বাঁকা চোখ, সঙ্গতপুরা গ্রামের খাপ পঞ্চায়েতের তির্যক মন্তব্য, বিকৃত মনোভাব পেরিয়ে যেতে হয় রোজ, তার হিসেব কে রাখে! মেয়ের নেশা ছিল বন্দুকে। সেই রসদ জোগাতে, ট্রেনিং ও কার্তুজের খরচ সামলাতে মোষের দুধ বিক্রিও করেছেন দু’জন মিলে। হাজার হাজার মাইল দূরে নাগোয়ায় আজ তাঁদের মেয়েই সোনা জিতেছে শ্যুটিংয়ে! ‘আমার নীরু সোনা জিতেছে? সত্যিই...?’ সাংবাদিকদের দিকে প্রশ্ন ছুড়েই অঝোরে কাঁদতে লাগলেন সুদেশ। যে কান্নায় রোদের আলো পড়ে চিকচিক করছে মায়ের জেদ, মেয়ের ঘাম আর বাবার উদ্বেগ।
উদ্বেগ তখন ছড়িয়ে পড়ছে গোটা ভারত জুড়ে। এশিয়ান গেমসের ফাইনালে তখন ম্যাচ গড়িয়েছে শ্যুট অফে। দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়েজিনের চোখে-মুখে প্রত্যয়। রিকার্ভ আর্চারির ইভেন্টে এমন প্রাণঘাতী টেনশন নতুন নয়। তুলনায় চেহারায় পিছিয়ে ইয়েজিনের প্রতিপক্ষ কুমকুম। খানিকটা আন্ডারএস্টিমেট করলেন কি তাই? স্নায়ুর চাপ সামলে মারলেন ৮-এ। ফাইনাল ম্যাচে যা মোটেই হেলাফেলার নয়। এবার পালা মহারাষ্ট্রের অমরাবতীর কুমকুমের। টেনশনকে আরও উসকে দিয়ে কুমকুম এসে দাঁড়ালেন নিজের জায়গায়। হাতে যেন গাণ্ডীব! আর কানে কানে তাঁর দ্রোণ যেন জিজ্ঞেস করছেন, ‘কী দেখো?’ আকাশ -বাতাস অবাক করে যেন কুমকুম বলছে, ‘শুধু পাখির চোখ দেখি স্যার, শুধুই পাখির চোখ।’
তির ছুড়লেন ১৭ বছরের কিশোরী কুমকুম মোহাড। নিমেষে তির গিয়ে বিঁধল ১০-এর ঘরে!
১০! শুধু যুদ্ধজয়ের পারফেক্ট নম্বরই নয়, এই দশ যেন অযুত নিযুত জোছনা পেরনো আপামর ভারতবাসীর নিশান। এই জয়ের সুবাদে ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকের কোটাও নিশ্চিত করল ভারত। মহারাষ্ট্রের অমরাবতী তখন ভাসছে আনন্দের জোয়ারে। বাবা অনিল মোহাড মিষ্টির দোকানের জন্য কার্ডবোর্ডের বাক্স বানাতেন। মেয়ের হাতে নতুন একটা ধনুকও তুলে দিতে পারেননি। ২০১৮ সালে ঠাকুমা কুসুমের দেওয়া ৩,০০০ টাকা সম্বল করে প্রথম কাঠের ধনুক কিনেছিলেন কুমকুম। পরে বাবা অনিল সেকেন্ড হ্যান্ড ধনুক কিনে দিতে পেরেছিলেন। তাতে কী? সেই পুরানো ধনুকেই ছিলা টান করে এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত রিকার্ভে ভারতের প্রথম সোনা এনে দিয়েছেন এই কিশোরী।
যাঁদের সঙ্গে দলগত বিভাগ খেলেছেন, সংগ্রামের ইতিহাস লিখতে বসলে তাঁরাও এক একজন ঐতিহাসিক চরিত্র হয়ে উঠতেই পারেন। যেমন ধরুন, কীর্তি শর্মা। হরিয়ানার এই মেয়েও ছোটো থেকে অভাব চেখেই বড়ো হয়েছেন। এতই দুর্বল ছিলেন যে একসময় কোচরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘তিরন্দাজি তোমার জন্য নয়।’ জাপানের ওকাজাকি সেন্ট্রাল পার্কের তিরন্দাজি রেঞ্জে ১৯ বছর বয়সি কীর্তি যেন রিকার্ভ ধনুক থেকে শেষ তিরটি ছুড়ে খানখান করে দিলেন সেই উপসংহার। সংহারই যার একমাত্র জবাব।
শুধু তিরন্দাজিই কেন? কিরণ পাহালের কথাই বা ভুলি কী করে? অ্যাথলেটিক্সে আসার পথ মসৃণ ছিল না; সোনপতের গ্রামে মেয়ের দৌড়ানো মেনে নিতে পারেননি অনেকেই। অনেকের বিরোধিতার মুখে পড়েছে পরিবার। তবু, জীবনের প্রথম এশিয়ান গেমসেই কিরণ ছিনিয়ে নিলেন দু’টি পদক। মহিলা ৪×৪০০ মিটার রিলেতে সোনা এবং মিক্সড ৪×৪০০ মিটার রিলেতে রুপো! যাঁরা একসময় কটূক্তি করত, তারাই বিমানবন্দরে এসে বরণ করে গ্রামে নিয়ে যেতে চাইছিলেন।
মণিপুরের উশু খেলোয়াড় রোশিবিনা দেবীর গল্পও অনেকটা এক। প্রশিক্ষণ ও যাতায়াতের খরচ তুলতে বাবা দামু সিং জমি বিক্রি করেছিলেন। ২০১৮-র এশিয়াডে ব্রোঞ্জ, ২০২২-এ রুপোর পর ২০২৬-এও রুপো— তিনটি এশিয়াড পদকজয় তাঁর অনুশীলন ও জেদের প্রমাণ।
এ বছর এশিয়াডে মেয়েদের পদকগুলি বারবার মনে করিয়েছে প্রতিভা যতটা জরুরি, তাকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা ততটাই প্রয়োজনীয়। যাতায়াত, আবাসন, পুষ্টি, কোচিং ও ফিজিওথেরাপি সবই নিয়মিত খরচ। ফুটবল-ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় খেলায় যে পরিমাণ বাণিজ্যিকরণ, সম্প্রচার, কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে, অ্যাথলেটিক, শ্যুটিং, তিরন্দাজি বা উশুর মতো ব্যক্তিগত খেলায় তার পরিমাণ তুলনায় অনেক কম।
তাবলে কি সরকারি আনুকূল্য একেবারেই নেই? কুমকুম ও নীরুর মতো খেলোয়াড়রা কেরিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে খেলো ইন্ডিয়া, স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার সহায়তা পেয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, প্রতিভা চিহ্নিত হওয়ার আগেই কতজনের কাছে এই সহায়তা পৌঁছায়? প্রশিক্ষণ, মানসম্মত সরঞ্জাম, যাতায়াত, পুষ্টি, নিরাপদ আবাসন, চোটের চিকিৎসা এবং সময়মতো বৃত্তি— এসবের নিশ্চয়তা ছাড়া কেবল প্রতিভা দিয়ে দীর্ঘ পথ চলা যায় না। তাই এই মেয়েদের সাফল্য উদযাপন মানে শুধু জাতীয় নিশান উড়তে দেখা নয়। পদকের আগে যে দিনগুলি অদৃশ্য থেকে যায়, সামাজিক বাধা, স্পনসরের দরজায় অপেক্ষা, অনিশ্চিত প্রশিক্ষণ, সেগুলিকেও স্বীকার করা। কুমকুমের তির, নীরুর নিশানা, কিরণের দৌড় যেন এই চাহিদাগুলোরই মুষ্টিবদ্ধ রূপ। ভারতের কন্যেদের লড়াই ও প্রতিবাদের প্রতীক।
মনীষা মুখোপাধ্যায়



