শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম স্বামী মল্লিকার্জুন অবস্থান করেন শ্রীশৈলমে। কেমন সেই যাত্রাপথ?
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে বিমানে হায়দরাবাদ যেতে লাগে দু’ঘণ্টা। হায়দরাবাদ থেকে শ্রীশৈলমের দূরত্ব মোটামুটি দু’শো কুড়ি কিলোমিটার। গাড়িতে যাওয়া যায়।
আমরা ভাবি, সামনে যিনি আছেন তাঁর ভাষা না জানলে তাঁর সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান চলবে না। এটা ভুল ধারণা। ভাব বিনিময় অনেক ভাবে করা যায়। উদাহরণ দিয়ে বলি।
কিছুকাল আগে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে মল্লিকার্জুন দর্শন করতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন আমার পঁচাশি বছরের বৃদ্ধ বাবা। কলকাতা থেকে বিমানে হায়দরাবাদ যেতে লাগল দু’ঘণ্টা। বিমান থেকে নীচে তাকালে মহানদী, পাহাড়, জঙ্গল দেখা যায় অনেকক্ষণ। দূরে ভুবনেশ্বর শহর, মন্দির দেখা যায়। ক্রমশ দৃশ্য বদলে যায়। পাকা বাড়ি, ফ্ল্যাট বাড়ি— শহর দেখা যেতে লাগল। নির্দিষ্ট সময়ে বিমান নামল হায়দরাবাদ বিমানবন্দরে। আগে থেকে গাড়ি ঠিক করা ছিল। যাত্রা শুরু করলাম শ্রীশৈলমের উদ্দেশ্যে। সেখানেই শিবের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম স্বামী মল্লিকার্জুন অবস্থান করেন।
হায়দরাবাদ থেকে শ্রীশৈলমের দূরত্ব মোটামুটি দু’শো কুড়ি কিলোমিটার। আমরা বাঙালিরা দক্ষিণ ভারত গেলে অনেকেরই ভাষার সমস্যা হয়। আমাদের গাড়ির চালক বাংলা বোঝেন না। হিন্দি খুব অল্প বোঝেন। যাত্রা শুরু করার আধঘণ্টা পর তিনি একটা পেট্রল পাম্প দেখে গাড়ি ঢুকিয়ে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিলেন। দেরি করার কারণ হিসাবে টাকা মেটাতে দেরি হচ্ছে বললেও তাঁর মোবাইলে কথোপকথনের ভঙ্গি দেখে বোঝা গেল তিনি প্রেম করছেন। আবার যাত্রা শুরু হল।
দেড় ঘণ্টা পর এল প্রথম দর্শনীয় স্থান ডিনডি জলাধার। রাস্তার পাশে বিশাল জলাধারটি কৃষ্ণা নদীর জল জমিয়ে তৈরি। মল্লিকার্জুন যেতে গেলে মোটামুটি একশো কিলোমিটার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মাঝে মাঝে লোকালয় থাকলেও বাকি পুরোটাই ব্যাঘ্র প্রকল্পের আওতায়। যেতে যেতে দেখলাম রাস্তার দু’ধারে প্রচুর হনুমান। অনেক জায়গায় জঙ্গল পুড়িয়েছে। বেশ কিছুটা চলার পর এক জায়গায় গ্রাম দেখা গেল। রাস্তার পাশে একটা চা ও হালকা খাবারের দোকানও পাওয়া গেল। আমার তিনজন সঙ্গী কালো চা খাবে আর বাকি তিন জন দুধ চা। এখানে হল ভাষা বিভ্রাট। দোকানদারকে বোঝাতে সমস্যা হল কালো চা কাকে বলে। অবশেষে বলা হল নো সুগার নো মিল্ক। তিনি মাথা নেড়ে চলে গেলেন। একটু পরে ছ’টি কাগজের কাপে দিয়ে গেলেন তিনটি দুধ চা আর তিনটি দেশি গোরুর বিশুদ্ধ দুধ। আমার সঙ্গীদের চা খাওয়া আর হল না। কিন্তু আমরা দুধ আর চা দুটোই খেলাম।
এরপর আবার নতুন অভিজ্ঞতা। আমরা গিয়েছিলাম শিবরাত্রি উৎসবের সময়। যেতে যেতে দেখলাম প্রচুর পুরুষ ও মহিলা হেঁটে হেঁটে চলেছেন জঙ্গলের পথ ধরে। পুরুষদের মাথার দুই দিকে দুটো পুঁটুলি। পরে জেনেছিলাম, ওর একটি চালের আর একটি ডালের। মন্দিরে প্রণামী দেবে। জঙ্গলের রাস্তায় কোথাও কোথাও কাপড় দিয়ে ঘিরে অস্থায়ী চটি বানিয়েছে। যাত্রীরা সেখানেই বিশ্রাম নিচ্ছে ও খাওয়াদাওয়া করছে। হাজার হাজার মানুষ বাঘের ভয় না করে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছেন তাঁর দর্শন পাওয়ার জন্য।
শ্রীশৈলমের রাস্তায় প্রথমে পড়ে শ্রীশৈলম বাঁধ ও জলাধার। এরপর আরও কুড়ি কিলোমিটার গিয়ে পাহাড়ের উপর মল্লিকার্জুন মন্দির ও জনপদ। মন্দিরে উৎসবের মেজাজ। প্রচুর শামিয়ানা খাটানো হয়েছে জায়গায় জায়গায়। সারা মন্দির আলোর মালায় সজ্জিত। নানা নৃত্য-গীত পরিবেশন হচ্ছে। একটা বাচ্চা মেয়ে ভরতনাট্যম নাচ করছে। গানের ভাষা বা মানে জানি না। কিন্তু তার ভাব ভঙ্গিতে বুঝলাম শিব বন্দনা করছে। মুগ্ধ হয়ে দেখলাম কিছুক্ষণ। ভাষা বাধা হল না। প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক মানুষদের জন্য আলাদা দরজা আছে ঢোকার। আমাকে বাবার সঙ্গে থাকতে দিল। মন্দিরের ভিতর বাবাকে অনেক কম লাইন দিতে হল। কিছু জায়গায় দর্শনার্থী দক্ষিণ ভারতীয় ছেলেরা বাবাকে উঠতে নামতে সাহায্য করল। ভাষা সমস্যা হয়ে দাঁড়াল না।
স্বামী মল্লিকার্জুনকে দর্শন করার অনুভূতি অসামান্য। এরপর দর্শন করলাম ভ্রমরম্বা দেবীকে। এটি ভারতের অন্যতম শক্তিপীঠ। একই অঙ্গনে শিব ও শক্তির দর্শন হল। ফেরার সময় জুতো রাখার জায়গাটা খুঁজে পেলাম না। সে রাতে খালি পায়ে হোটেলে ফিরতে হল। পরের দিন অবশ্য যেখানে রেখেছিলাম সেখানেই সেটা পেলাম। বুঝলাম, এখানে জুতো চোরের অভাব।
আমরা ছিলাম অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের হোটেল হরিথায়। মন্দির থেকে হেঁটে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে। হোটেলে ফিরে শুনলাম, খাবার জায়গা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রাত এগারোটা নাগাদ খাবার খুঁজতে বেরলাম। খাবারের দোকান জমজমাট। একটা দোকানে গরম গরম ধোসা বানাচ্ছে। দোকানদার হিন্দি বোঝেন। পরদিন আবার মন্দিরে গিয়ে মল্লিকার্জুন দর্শন করলাম। মন্দির প্রাঙ্গণে গরম খিচুড়ি ভোগ বিতরণ করছিল। সেই ভোগও পেলাম। মন্দির প্রাঙ্গণে যেসব মহিলা মালা বিক্রি করেন তাঁরা মালার দামটা ইংরেজিতে বলতে পারেন। একজনকে ইশারায় বোঝালাম আমি মালা লাগাতে পারি না। তিনিও ইশারায় বোঝালেন যে মালা লাগিয়ে দেবেন। মালা কেনার পর সত্যি সত্যি তিনি আমার মাথায় মালাটা অনেক যত্নে ভালো ভাবে জড়িয়ে দিলেন। দু’জন দু’জনের ভাষা না জেনেও ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে একটা মধুর সম্পর্ক স্থাপিত হল।
এরপর দাঁড়ালাম প্রসাদ কেনার লাইনে। সেখানে তিনটি লাইন উঁচু তারের জাল দিয়ে আলাদা করা। এখানেই দেখলাম দক্ষিণ ভারতের মানুষের কেরামতি। অনেকেই অবলীলায় সেই উঁচু জাল বেয়ে উপরে উঠে উলটো দিকে নেমে পড়লেন। বাকিরা তাঁদের বাহবা দিতে লাগলেন। গুণীর কদর সব জায়গায়। এরপর প্রসাদ নেওয়ার জায়গায় পৌঁছে দেখলাম সেই কেরামতি দেখানো একজনকে। আমাকে সকলের মধ্যে বেমানান দেখে নিজের ভাষায় কিছু বললেন। বুঝলাম না কিছুই। আমাকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে ইশারায় আগে প্রসাদ কিনতে বললেন। এখানেও ভাব বিনিময় হল ভাষা না জেনেই।
শ্রীশৈলমে শিখরম নামে একটা জায়গা আছে যেখানে বেশ কিছু উঁচু সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সামনে পাহাড় ও উপত্যকা সহ মল্লিকার্জুন মন্দির ও পুরো শ্রীশৈলম দেখা যায়। বাবাকে নিয়ে উপরে উঠলাম। একজন অতিশয় বৃদ্ধ মানুষকে উপরে উঠতে দেখে সবাই অবাক। কেউ কেউ নিজের ভাষায় সাহস দিচ্ছিলেন। যদিও অনুভব করলাম বৃদ্ধদের জন্য এই সিঁড়ি ভেঙে ওঠাটা একেবারেই উচিত নয়। আগে বুঝতে পারলে বাবাকে নিয়ে উঠতাম না। অনেকে উঠতে নামতে বাবাকে সাহায্য করলেন। ভাষা বাধা হয়ে দাঁড়াল না।
উপরে উঠে নন্দীর দুই কানের মাঝখান দিয়ে মল্লিকার্জুন মন্দির দর্শন করতে হয়। এরপর গেলাম সাক্ষী গণপতি। সেখানে লম্বা লাইন। যারা হেঁটে আসছেন তাঁরা প্রথমে ওঁকে দর্শন করে তারপর মল্লিকার্জুন দর্শন করতে যাচ্ছেন। আমিও এগিয়ে গেলাম সেই সারির দিকে। একটা বিষয় লক্ষ করে অবাক হলাম। এত লোক আসছেন। বেশিরভাগ আদিবাসী বা আঞ্চলিক লোক। সবাই সারি দিয়ে দর্শন করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। বুঝলাম প্রকৃত শিক্ষা, ভদ্রতা বই পড়ে আর ডিগ্রি নিয়ে শেখা যায় না। এত লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র দশ মিনিট সময় লাগল দর্শন করতে।
এরপর পাতালগঙ্গা দেখতে গেলাম। রোপওয়ে করে নদীর তীরে নেমে আরও খানিকটা হেঁটে গেলে নদীর ঘাট। প্রচুর মানুষ স্নান করছেন। এরপর তাঁরা মন্দিরে যাবেন পুজো দিতে। সরকারি লঞ্চে কৃষ্ণা নদীতে ভ্রমণের ব্যবস্থা আছে। দূরে শ্রীশৈলম বাঁধ দেখা যাচ্ছে। সেই পর্যন্ত লঞ্চ গেল। দুই ধারে পাহাড় ও জঙ্গল। অপূর্ব দৃশ্য। দুপুরে যে খাবারের দোকানে খেতে গেলাম সেখানে দক্ষিণ ভারতের থালি চেয়েছি। সারাদিন ঘুরে হাত নোংরা হয়েছিল তাই যিনি পরিবেশন করছিলেন তাঁকে ইংরেজিতে চামচ দিতে বললাম। খানিকক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে থেকে চলে গেলেন। আর একজন এলেন। ইনি ইংরেজি বোঝেন। চামচ এনে দিলেন। মল্লিকার্জুনে আগত তীর্থযাত্রীদের নব্বই শতাংশ দক্ষিণ ভারতের মানুষ। দশ শতাংশ বাঙালি আর অন্য প্রদেশের। দক্ষিণ ভারতীয় থালিতে ভাতের সঙ্গে কয়েক রকম সবজি, দই, পায়েস ইত্যাদি থাকে। খেতে ভালোই লাগে। বিকেলবেলা স্থানীয় দোকান থেকে টুকিটাকি কিছু কেনা হল।
পরেরদিন ভোরে অনেকক্ষণ একা একা মন্দির চত্বরে ঘুরে বেড়ালাম। শিবরাত্রি উপলক্ষ্যে মেলা বসেছে। কতরকম জিনিস বিক্রি হচ্ছে। বহু মানুষ ফুটপাথে চাদর পেতে অস্থায়ী আস্তানা বানিয়েছেন। শ্রীশৈলম জায়গাটায় একটা অদ্ভুত আকর্ষণ আছে। বিশাল মন্দির ঘিরে একটা ছোট্ট জনপদ। চারদিকে পাহাড় ও জঙ্গল ঘেরা। ওখানকার আকাশ, বাতাস, পরিবেশ দূষণমুক্ত। চতুর্দিক শিবময়। অদ্ভুত মানসিক শান্তি পাওয়া যায়।
এরপর আমরা বেরলাম আদিবাসী জাদুঘর দেখতে। গুগল পথ দেখাতে গিয়ে একটা বাড়ির ছাদের উপর দিয়ে পথ দেখাল। বাধ্য হয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হলাম। ম্যানেজার অল্প ইংরেজি জানেন। বললেন দুটো বাড়ির মাঝে একটা গলিপথ আছে। ওটা দিয়ে যেতে হবে। জাদুঘরটা পুতুল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো।
দুপুরে মল্লিকার্জুনকে বিদায় জানিয়ে শ্রীশৈলম থেকে রওনা হলাম হায়দরাবাদের উদ্দেশ্যে। দক্ষিণ ভারতের ভাষা না জেনেও তিনদিন নানা মানুষের সঙ্গে নানারকম ভাবে ভাব বিনিময় হল। অনুভব করলাম মানুষের মন, অভিসন্ধি যদি ভালো হয় তাহলে ভাষা বাধা হয় না। কলকাতা ফেরার বিমান ছিল রাত দশটা নাগাদ। ওপর থেকে রাতের আলো ঝলমলে শহরটা দারুণ লাগছিল। ষাট ঘণ্টার এই ভ্রমণ মনের গভীরে সারা জীবনের জন্য স্থায়ী জায়গা করে নিল।
বৈশাখী



