ফুলবাড়ির অহংকার
  • ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মান্না দে শিলিগুড়িতে এলে তাঁর পাতে ফুলবাড়ির লালমোহন থাকা চাই-ই। শুধু দোকানে বসে খাওয়া নয়, বেশ কয়েকবার মুম্বইয়েও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছেন এই মিষ্টি। লালমোহনের পাশাপাশি সুখ্যাতি রয়েছে এখানকার ছানার জিলিপিরও। সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, বাজারে এসেছে নানা ধরনের মিষ্টি। কিন্তু ফুলবাড়ির লালমোহনের প্রতি মানুষের টান আজও অটুট।
১৯৫৬ সালে ফুলবাড়ির বাসিন্দা মণীন্দ্রনাথ ঘোষ ছানা ও ক্ষীর সহযোগে ছানার জিলিপি তৈরি করতে গিয়ে অনেকটা খেলার ছলেই তৈরি করেছিলেন লালমোহন। সেই শুরু। ১৯৭২ সালের পর থেকে লতা মঙ্গেশকর, উত্তম কুমার, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ঊষা উত্থুপ, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির মতো বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির পদধূলি পড়েছে এই সাধারণ মিষ্টির দোকানে।
শিলিগুড়ি শহরের উপকণ্ঠে জাতীয় সড়কের ধারে ফুলবাড়িতে আজও রয়েছে সেই দোকান। ডুয়ার্সে বেড়াতে যাওয়ার পথে পর্যটকেরা গাড়ি থামিয়ে এখানে লালমোহন খেতে ঢোকেন। ফুলবাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তপথে যাতায়াত শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে আসা বহু মানুষ দেশে ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যান এই মিষ্টি। দোকানের বর্তমান মালিক রতন ঘোষ ও তাঁর ছেলে রূপম ঘোষের কথায়, বাজারে নানা ধরনের মিষ্টির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তরুণ প্রজন্মের খাবারের পছন্দেও এসেছে পরিবর্তন। তবু লালমোহন ও ছানার জিলিপির চাহিদায় ভাটা পড়েনি। রূপমবাবুর বিশ্বাস, একবার এই লালমোহন খেলে তার স্বাদ ভোলা মুশকিল। তবে মানুষের স্বাস্থ্যসচেতনতা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং ভেজালের আশঙ্কা নিয়ে চিন্তাও রয়েছে তাঁদের। বাইরে থেকে দেখলে একে সাধারণ মিষ্টির দোকানের থেকে আলাদা করা কঠিন। কয়েকটি চেয়ার-টেবিল, কড়াই ভরা রসে ডোবা লালমোহন ও ছানার জিলিপি— এই নিয়েই তার সাজ। চারপাশে নানা দোকানের ভিড়েও ফুলবাড়ির এই দোকান নিজের পুরানো চেহারা ধরে রেখেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাদ ও গুণমানের উপর ভরসা করেই চলছে তার পথ।

Advertisement

ডুয়ার্স যাওয়ার রাস্তায় ছোট্ট জনপদ ফুলবাড়ি। তবে এখানে পর্যটকরা দাঁড়িয়ে যান মিষ্টির টানে। এই অঞ্চলের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান ‘ফুলবাড়ী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। এদের লালমোহন ও ছানার জিলিপি মন জয় করেছে বহু বিশিষ্টজনের।

ছানার জিলিপি

ভাজা মিষ্টির জগতে ছানার জিলিপি প্রিয় নয়, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। রসালো এই পদ মন জয় করে ভোজনরসিকদের।

উপকরণ: ছানা ৫০০ গ্রাম, ময়দা ২ টেবিল চামচ, সুজি ১ টেবিল চামচ, বেকিং সোডা এক চিমটে, এলাচ গুঁড়ো সামান্য, ঘি বা সাদা তেল ভাজার জন্য। 
রসের উপকরণ: চিনি ৪০০ গ্রাম, জল ২ কাপ, এলাচ ২-৩টি।
প্রণালী: প্রথমে ছানার জল ভালোভাবে ঝরিয়ে হাতের তালু দিয়ে ৮-১০ মিনিট মেখে মসৃণ করে মেখে নিন। এরপর ময়দা, সুজি, বেকিং সোডা ও এলাচ গুঁড়ো দিয়ে আবার ভালো করে মাখুন। এবার মিশ্রণ থেকে ছোটো ছোটো অংশ নিয়ে লম্বা করে পাকিয়ে সর্পিল করে জিলিপির আকার দিন। এরপর একটি পাত্রে চিনি ও জল ফুটিয়ে হালকা ঘন রস বা সিরা তৈরি করে রাখুন। এই রসে এলাচ যোগ করুন। কড়াইয়ে ঘি বা সাদা তেল গরম করে নিন। এবার মাঝারি কিংবা ঢিমে আঁচে জিলিপিগুলি ধীরে ধীরে সোনালি বাদামি হওয়া পর্যন্ত ভাজতে থাকুন। অতিরিক্ত আঁচে ভাজলে বাইরে রং ধরলেও ভিতরটা কাঁচা থেকে যাবে। ভাজা জিলিপি গরম অবস্থায় হালকা উষ্ণ চিনির রসে ১৫-২০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। জিলিপি রস শুষে নিলে পরিবেশন করুন। ছানা মাখা এবং ধীরে ধীরে ভাজার উপরেই ছানার জিলিপির নরম, মুচমুচে ও রসালো স্বাদ অনেকটাই নির্ভর করে।

লালমোহন

ছানার এই মিষ্টান্ন রসনাতৃপ্তিতে বিশেষ দক্ষ। সাধারণ মানুষ থেকে সেলিব্রিটি সকলেরই প্রিয় এই মিষ্টিটি।

উপকরণ: ছানা ৫০০ গ্রাম, খোয়া ক্ষীর ১০০ গ্রাম, ময়দা ২ টেবিল চামচ, সুজি ১ টেবিল চামচ, বেকিং সোডা ১ চিমটে, চিনি ৫০০ গ্রাম, জল ৪০০ মিলিলিটার, এলাচ ৪টি, ঘি ভাজার জন্য।
প্রণালী: প্রথমে ছানার জল ভালোভাবে ঝরিয়ে হাতের তালু দিয়ে মসৃণ করে মেখে নিন। এর সঙ্গে খোয়া ক্ষীর, ময়দা, সুজি ও এক চিমটে বেকিং সোডা মিশিয়ে মণ্ড তৈরি করে রাখুন। মণ্ড যেন খুব শক্ত বা অতিরিক্ত নরম না হয়। এবার মণ্ড থেকে ছোটো ছোটো অংশ নিয়ে গোল বা সামান্য লম্বাটে আকার দিন। অন্যদিকে, চিনি ও জল ফুটিয়ে পাতলা রস তৈরি করে, তাতে এলাচ দিয়ে রাখুন। কড়াইয়ে ঘি বা সাদা তেল গরম করে মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে লালমোহনগুলি ভাজতে শুরু করুন। বাইরে সুন্দর বাদামি রং এলে, তুলে গরম চিনির রসে দিন। অন্তত ২-৩ ঘণ্টা রসে ভিজিয়ে রাখলে মিষ্টির ভিতর পর্যন্ত রস ঢুকে যাবে। ভালো লালমোহনের জন্য ছানা মসৃণ করে মাখা, ধীরে ভাজা ও পর্যাপ্ত সময় রসে ভিজিয়ে রাখা জরুরি।
• সঞ্জিত সেনগুপ্ত
• ছবি: পুলক কর্মকার