সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: একাকিত্ব ঘোচাতে নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়ুল মারছে মহিলারা! ঘরে বসেই অ্যাপের মাধ্যমে বিশেষ বন্ধু খুঁজছেন তাঁরা। অনেকে আবার জীবনসঙ্গীর খোঁজেও ভরসা রাখছেন নানা অ্যাপে। আর এই অ্যাপগুলিতে ওঁত পেতে রয়েছে ‘দেওঘর গ্যাং’য়ের সদস্যরা। তারা কখনও ধনকুবের, আবার কখনও বড় ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে মহিলাদের সঙ্গে ভাব জমাচ্ছে। আর পয়সাওয়ালা বন্ধু পাওয়া মানেই জীবন বদলের স্বপ্ন। উপেক্ষা করতে পারছেন না অনেকেই। বিপত্তি ঘনাচ্ছে এখানেই। ভাব জমানোর কিছুদিনের মধ্যেই ফোন নম্বর আদান প্রদান। চলছে প্রাণ খুলে কথা। ক’দিন যেতে না যেতেই ফোনের ওপারে বিশেষ বন্ধু কাঁদো কাঁদো ভাবে বলছে, মহাবিপদে পড়েছি। ত্রাতা তুমি। সেই বিপদ আবার হরেক। কখনও আয়কর বিভাগ মোটা অঙ্কের টাকা জরিমানা করছে। কখনও দোকানে জিএসটি হানা হয়েছে। আবার কখনও ব্যবসায় মোটা টাকা লোকসান হয়েছে। প্রেমিককে উদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন প্রেমিকা। কিন্তু, তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছেন না, প্রেমিকের এইসব ‘মহাবিপদ’ আসলে দেওঘর গ্যাংয়ের ফাঁদ! পা দিলেই সর্বস্বান্ত। কেউ খোয়াচ্ছেন কষ্টার্জিত সঞ্চিত অর্থ। কেউ হয়তো হারাচ্ছে প্রিয় স্বর্ণালঙ্কার। রাজ্যে একের পর এক এমন প্রতারণার ঘটনা সামনে আসতে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। সতর্ক করা হচ্ছে, অ্যাপ নির্ভর বন্ধকে অন্ধের মতো বিশ্বাস না করা। পুলিশ সূত্রে খবর, সম্প্রতি হুগলির এক তরুণীর কাছে থেকে দেওঘর গ্যাং ৪৪ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পুলিশ তদন্তে নেমে ঝাড়খণ্ডের দেওঘরের বাসিন্দা অভিষেক রায় নামে এক প্রতারককে গ্রেফতার করেছে। গ্যাংয়ে কাজ করত খানাকুলের জামির আব্বাস নামে আর এক প্রতারক। সে অ্যাপে নিজেকে অনুপম রায় নামে পরিচয় দিত। তাকেও জালে তুলেছে পুলিশ। ক’দিন আগে গ্যাংটি বর্ধমানের এক মহিলার থেকেও ১৮ ভরি সোনা এবং কয়েক লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছে। জেলার এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, ম্যাট্রিমনির মতো বিভিন্ন অ্যাপ সোশ্যাল মিডিয়ায় রয়েছে। অনেকেই তাতে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে। বিশেষ করে অবিবাহিত কিংবা বিবাহ বিচ্ছিন্না চল্লিশোর্ধ মহিলারাই এই গ্যাংয়ের টার্গেট। প্রতারকরা তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করতে বেশ কিছুদিন কথা বলে। ভালবাসার অভিনয় করে। তার পরই আসল রূপ ধারণ করে। আধিকারিকদের মতে, গত কয়েক বছরে সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা বেড়েছে। তাতে অনেক মহিলাই নিঃসঙ্গতা ও একাকীত্বে ভুগছেন। মুক্তি পেতে গিয়ে গ্যাংয়ের খপ্পরে পড়ে যাচ্ছেন। জানা গিয়েছে, গ্যাংটিতে পাঁচ থেকে সাতজন সদস্য রয়েছে। প্রথমে একজন অ্যাপের মাধ্যমে পরিচয় করে। কয়েক মাস কথা বলার পর সে বন্ধু হিসেবে অন্য আর একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। প্রথমজনও ওই মহিলার সঙ্গে প্রেমিকের বন্ধু হিসেবে কথা বলতে থাকে। কয়েক মাস পর ওই মহিলাকে প্রথম পরিচিত বন্ধুটি জানায়, ‘অপনার প্রেমিক খুব সমস্যায় পড়েছে। ওর ব্যবসায় প্রচুর লোকসান হয়ে গিয়েছে। সে কথা আপনাকে বলতে পারছে না। আমরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছি। আপনার যদি সম্ভব হয় ওকে সাহায্য করবেন।’ এরপরই শুরু হয়ে যায় আসল খেলা। ধাপে ধাপে মহিলার কাছে থেকে টাকা বা সোনার গয়না হাতাতে থাকে প্রেমিক। হুগলি জেলা পুলিশ গ্যাংয়ের কয়কজনকে গ্রেফতার করলেও বাকিরা অধরা রয়েছে। হুগলিতে গ্রেফতার হওয়া প্রতারকদের বর্ধমান জেলা পুলিশও হেফাজতে নিয়ে জেরা করবে। সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।



