মাতৃ আরাধনার সময় আসন্ন। যেসব মহিলা উদ্যোগপতি কাজের মাধ্যমে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন তাঁদের শক্তিকে কুর্নিশ জানানোর সময়। আজ আর চৌধুরী অ্যান্ড সন্স-এর অন্যতম ডিরেক্টর শ্রীপর্ণা চৌধুরী।
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পারিবারিক ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলেন বাবা। ব্যবসায় ছিলেন জেঠুও। কিন্তু বাবার যে দুই মেয়ে! তাহলে পরে ব্যবসার হাল ধরবে কে? তাও আবার এমন ব্যবসা, যেখানে শুধু ছেলেরাই রাজত্ব করে এসেছে। ব্যবসার ভার নিতে আগ্রহী ছিলেন জাঠতুতো দাদারা। ছোটো বোনেরও যে ব্যবসায় অধিকার ও আগ্রহ থাকতে পারে এমন কথা কারও মনেই হয়নি। আজ থেকে প্রায় ২৫-৩০ বছর আগে সমাজের এমন ভাবনা অস্বাভাবিক ছিল না। সেই ভাবনাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলেন বাড়ির ছোটো মেয়ে। বরাবরই ব্যবসায় আগ্রহী। তাই যখনই বাবা প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজ দিয়েছেন, প্রাণপণে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। আজ বাংলার অলংকার জগতে আর চৌধুরী অ্যান্ড সন্স-এর অন্যতম কর্ণধার শ্রীপর্ণা চৌধুরীকে কে না চেনে! ছোটো থেকেই জেদি ও এককাট্টা শ্রীপর্ণা। স্বভাবের গুণ চলকে এসে পড়ে কথাবার্তাতেও। স্পষ্টবক্তা মানুষ। সংগ্রাম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর জীবনধর্ম। ব্যবসায় তাঁর সঙ্গী দিদি অপর্ণা দত্ত।
এই সংগ্রাম তাঁকে নিয়ে গিয়েছে সাফল্যের অমিততোরণে। কিন্তু সে পথ সহজ ছিল না। বরং দুনিয়াদারির আজব কিসসায় শ্রীপর্ণা দেখেছেন নিজের আত্মীয়দের বিরোধিতা, কর্মীদের চোখে সন্দেহ ও অবজ্ঞা। একটা মেয়ে কেন এই ব্যবসায় আসবে, এমন তাচ্ছিল্য চাখতে চাখতেই শ্রীপর্ণা নিজেকে যাচাই করেছেন কষ্টিপাথরে। তারপর একসময় এসেছ বড়ো অসুখ। স্নেহশীল বাবা মা ও দায়িত্ববান স্বামী নিজেদের সবরকম স্বাচ্ছন্দ্য বন্ধক রেখে সুস্থ করেছেন তাঁকে। টালমাটাল সেই সময় কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই অংশীদারী ব্যবসা পৃথক করার প্রয়োজন এল। বাড়িও গেল বন্ধকে। তবু বাবার তৈরি করা ব্যবসা ছাড়েননি বিমলেন্দু বিকাশ চৌধুরী, শ্রীপর্ণা-অপর্ণার বাবা।
পুরানো কথা বলতে বলতে বারবার নস্টালজিক হয়ে পড়ছিলেন শ্রীপর্ণা। বললেন, ‘যখন মাস্টার্স করে ব্যবসায় ঢুকতে গেলাম, বাধা এল নিজের লোকজনদের থেকেই। জেঠুর তিন ছেলে। আমরা দুই বোন। কেউ ভাবেননি ছেলেদের মতোই মেয়েরাও এগিয়ে আসবে ব্যবসায়। তখন কর্মীদের চোখেও ছিল সন্দেহ, আদৌ পারবে তো? দোকানে আমার উপস্থিতি তাঁরা পছন্দ করতেন না। তবু ভেঙে পড়িনি। বরং বাবা যখন যা দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই কাজ প্রাণভরে করেছি। কষ্টিপাথরে সোনা যাচাই থেকে শুরু করে সব কাজ শিখেছি। মনে আছে একদিন এক নামী মহিলা এসেছিলেন দোকানে। কিন্তু ভিড় থাকায় কাউন্টার অবধি এগতে পারছিলেন না। আমার নজরে আসে। আমি তাঁকে আলাদা করে গয়না দেখাতে শুরু করি। সেদিন আমি তাঁকে একটি বহুমূল্যের অলংকার কেনাতে পেরেছিলাম। বাবার কাছে এটাই ছিল আমার ব্যবসার পরীক্ষায় পাশ!’
পারিবারিক ব্যবসা আলাদা হওয়ার পর আরও বেশি মন দিতে পেরেছেন শ্রীপর্ণা। নিজেদের স্বপ্ন ও ভাবনাকে সাকার করতে দুই বোন একসঙ্গে সামলাচ্ছেন প্রতিষ্ঠান। এক সময় বাধা এসেছে পুরুষ কর্মীদের থেকে। তাই ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে শুধুই মহিলা কর্মীদেরই নিয়োগ করেন। মহিলাদের পরিশ্রম ও ভাবনার উপর নির্ভর করেই প্রতিষ্ঠানকে নবরূপ দিয়েছেন তাঁরা। অলংকারের সাতসতেরো কাজ দুই বোন শেখান মেয়েদের। বললেন, ‘আমরা দুই বোন মিলে ব্যবসা সামলাই। এই প্রতিষ্ঠানে মেয়েরাই কাজ করেন শুধু। কাজের যে কোনো লিঙ্গভেদ হয় না, মেয়েরা যে সব কাজেই সমান পারদর্শী হতে পারেন, সেই বার্তাই দিই সমাজকে।’
এই পদ্ধতিতেই ৭৬ বছরের ব্যবসার হাল ধরে আছেন চৌধুরী বাড়ির দুই কন্যে। আগে ছিল একটি আউটলেট। এখন আড়েবহরে বেড়েছে দোকান। ২২ ক্যারাটের পাশাপাশি ১৮ ক্যারাট সোনার জন্য আলাদা ইউনিট খুলেছেন। রুপো, হীরে সবকিছুর জন্যই রয়েছে আলাদা বিভাগ। বসতবাড়িতেই একটি বড়ো অংশ জুড়ে দোকানের বিস্তার ঘটিয়েছেন। সব মিলিয়ে অলংকারের ব্যবসায় শ্রীপর্ণা ও অপর্ণা আজ সফল নাম। কলকাতার বাজারে তাঁদের সোনার সুখ্যাতিও আছে। শ্রীপর্ণা বললেন, ‘বাবা কোনোদিন সোনার মান নিয়ে আপস করেননি। আমরাও করি না।’ ফোনের ওপ্রান্তে গলায় তখন চুঁইয়ে পড়ছে আত্মবিশ্বাসের সোনালি ঝলক।
মনীষা মুখোপাধ্যায়



