Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভূতুড়ে ভোটার দিয়ে কি আদৌ বাংলা জয় সম্ভব?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু আবারও এখানে জিতে গেলেন। ভূতুড়ে ভোটার নিয়ে তাঁর অভিযোগ শুনে প্রথমে যাঁরা তৃণমূল নাটক করছে বলে তোপ দেগেছিলেন

ভূতুড়ে ভোটার দিয়ে কি আদৌ বাংলা জয় সম্ভব?
  • ৯ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু আবারও এখানে জিতে গেলেন। ভূতুড়ে ভোটার নিয়ে তাঁর অভিযোগ শুনে প্রথমে যাঁরা তৃণমূল নাটক করছে বলে তোপ দেগেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের ল্যাজেগোবরে অবস্থা দেখে তাঁদের সংবিৎ ফিরছে। মমতার অভিযোগ যে অকাট্য ছিল, ধীরে ধীরে তার ইঙ্গিত মিলতে শুরু করেছে। চাপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় বাধ্য হয়ে কমিশন ঘোষণা করেছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে একই নম্বরে একাধিক ভূতুড়ে এপিক আর থাকবে না। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ইউনিক নম্বর চালু হচ্ছেই শীঘ্রই। সৌজন্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশনের এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে, বাংলার ভোটার তালিকা নিয়ে বিজেপি’র চক্রান্তকে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিতে সমর্থ হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথম রাউন্ডে জয় এলেও আগামী একবছর কিন্তু আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটার তালিকা সহ প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়েই নজর রাখতে হবে। সুযোগ পেলেই দিল্লির নির্দেশে ঝাঁপাতে কসুর করবে না গেরুয়া শিবির। 

Advertisement

মহারাষ্ট্র, দিল্লিতে জিতে রক্তের স্বাদ পেয়ে গিয়েছে বিজেপি। সেই কারণেই বিধানসভা ভোটের এক বছর বাকি থাকতেই বাংলায় ভোটার তালিকা ধরে ধরে এক ভয়ঙ্কর ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছিল তারা। প্রথমে যখন অভিযোগটা কানে এসেছিল তখন ভেবেছিলাম দু’একটা অভিযোগ বুঝি। তেমন বিরাট কিছু একটা হবে না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী নেতাজি ইন্ডোরের প্রকাশ্য সভায় এই সংক্রান্ত তথ্য পরিসংখ্যান দেওয়ার পর বিভিন্ন জেলা থেকে যে খবর পাওয়া যাচ্ছে তা এক কথায় ভয়াবহ। একই এপিক নম্বরে বাংলা এবং বিজেপিশাসিত গুজরাত-হরিয়ানার ৬১১ ভোটারের সন্ধান মিলেছে। সংখ্যাটা রোজ বাড়ছে। যত অনুসন্ধান চলছে ততই ডুপ্লিকেট কার্ডের সন্ধান মিলছে।  রাজ্যের ভোটার তালিকায় ‘বহিরাগত’ অনুপ্রবেশকারীর অভিযোগ এনেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুর্শিদাবাদের রানিনগর বিধানসভা ও দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর বিধানসভা কেন্দ্রেই ৬১১ জন এমন ভোটারের সন্ধান মিলেছে, যাঁদের সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রের নম্বরের লোক রয়েছে গুজরাত ও হরিয়ানায়। বিজেপিশাসিত দুই রাজ্যের এপিক কার্ডধারীদের নাম রয়েছে বাংলার ভোটার তালিকায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি এপিকেই প্রথম তিনটি অক্ষর এবং তারপর সাতটি সংখ্যা থাকার কথা। তাহলে বাংলার সঙ্গে হরিয়ানা কিংবা গুজরাতের এপিকের প্রথম তিনটি অক্ষর এক হলো কীভাবে? এই ত্রুটিকে ‘জেনেবুঝে ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিলে অপরাধ কোথায়?
বাংলা নিয়ে বিজেপি’র স্বপ্ন অনেক দিনের, কিন্তু সংগঠন দুর্বল। সাধ্য সীমিত। গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে। বিগত কয়েকমাস নাগাড়ে চেষ্টা চালিয়েও একজন লড়াকু সর্বজনগ্রাহ্য সভাপতি খুঁজে পায়নি যে দল, ভোটের লক্ষ্মী ঘরে তুলতে তারা যে বাঁকা পথই ধরবে তা বারবার প্রমাণ হয়েছে। দল ভাঙাবে। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে হাঙ্গামা বাধাবে। রাজ্যের প্রাপ্য আড়াই লক্ষ কোটি টাকা নানা অজুহাতে বন্ধ করে দেবে। সিবিআই, ইডিকে লাগিয়ে শাসক দলের নেতানেত্রীদের কাছে টানবে, তাও জানা গল্প। ভোট এলেই ধুলো উড়িয়ে বহু কোটি ব্যয় করে গ্রামেগঞ্জে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সতীর্থদের হাওয়াই জাহাজ নামবে তাও চেনা ‘প্লট’। প্রধানমন্ত্রীর ডেলি প্যাসেঞ্জারিও নিষ্ফলা। রাজ্য সভাপতি তো দূরঅস্ত, স্থানীয় স্তরে মণ্ডল সভাপতি খুঁজতেই হিমশিম অবস্থা! অহরহ মারামারির খবর মিলছে। মহারাষ্ট্র ও দিল্লির উপর্যুপরি সাফল্যের পর নতুন দাওয়াই আমদানি করেছে বিজেপি। দুই রাজ্যেই ভোটের আগের ছ’মাসে রকেট গতিতে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি। মহারাষ্ট্রে প্রায় ৪০ লক্ষ আর দিল্লিতে ৮ লক্ষ। সঙ্গে বেছে বেছে নাম কেটে দেওয়ার ফিকির। নির্বাচন কমিশন প্রথমটায় উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষে বঙ্গে ভোটার তালিকা নিয়ে কেন্দ্রের শাসক শিবিরের এই কুনাট্য মানতে বাধ্য হয়েছে।
একটি রাজনৈতিক দল ভোটে জিততে অনৈতিক পথ নিতেই পারে। কিন্তু সন্দেহের কেন্দ্রে যখন নির্বাচন কমিশন, তখন নানা অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠবেই। তার উপর দেশের ২৬তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বে আসা ব্যক্তিটি যদি হন কেন্দ্রের বর্তমান শাসক দলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, তাহলে তো কথাই নেই। নাম জ্ঞানেশ কুমার। অত্যন্ত মেধাবী আইএএস। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে আসার আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গুরুদায়িত্বই শুধু সামলাননি, অগ্নিগর্ভ কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ সহ যাবতীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মুখ ছিলেন তিনি। এক কথায়, গোটা কাশ্মীর অপারেশনে অমিত শাহের বিশ্বস্ত সেনাপতি। এহেন একজন যখন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পান তখন ভারতের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। এক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। স্বয়ং বিরোধী দলনেতাও তাঁর নিয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। সামনেই ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। তাই আগামী কয়েক বছর এই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের গুরুত্ব বিরাট। তিনি এই পদ থেকে অবসর নেবেন ২০২৯ সালের ২৬ জানুয়ারি, অর্থাৎ আগামী লোকসভা ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার এক মাস আগে।
ভুয়ো ভোটার নিয়ে বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে যেসব অভিযোগ এসেছে তা মূলত দু’টি ভাগে বিভক্ত। ১) বঙ্গের বিভিন্ন জেলায় শহরে একজন ভোটার দেখছেন তাঁর এপিক নম্বরের সঙ্গে হরিয়ানা, গুজরাত সহ বিজেপিশাসিত রাজ্যের একাধিক ভোটারের এপিক নম্বর হুবহু মিলে যাচ্ছে। এত আধুনিক হয়েছে আমাদের নির্বাচন কমিশন, কিন্তু মমতা চোখে আঙুল দিয়ে না দেখালে এটা আমরা জানতেও পারতাম না। এখনও ভোটার কার্ডের নম্বরটাই গোটা দেশে ইউনিক করতে পারেননি কমিশনের কর্তারা। অনেকে এমনও বলছেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যের সঙ্গে বাংলার অগুনতি এপিক নম্বর মিলিয়ে দেওয়ার পুরোটাই কি স্রেফ ভুল না স্বেচ্ছাকৃত? ২) এতবার সংশোধনের পরও জেলায় জেলায় ভোটার তালিকায় মৃত ভোটারের সংখ্যা কমেনি, বেড়েই চলেছে। তাহলে কমিশন কি ঘুমিয়ে রয়েছে?
দু’টি ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশন কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। তৃণমূল নেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে সরব না-হলে এবং তাঁর নির্দেশে প্রতিনিধি দল দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে প্রতিবাদ না জানালে এত সহজে কি সেখানকার কর্তারা এই ভোটার তালিকার বিভ্রাট (পড়ুন, চক্রান্ত!) মেনে নিতেন? নিতেন না! জেলা থেকে প্রতিদিন ভূরি ভূরি অভিযোগ আসছে। ইংলিশবাজার পুরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে একটি পরিবারে চার সদস্য। অথচ ভোটার তালিকায় রয়েছেন তাদের সাতজন! চোপড়ায় একটি পরিবারের এপিক নম্বরের সঙ্গে গুজরাতের এপিক মিলে যাচ্ছে কোন রহস্যে? এসবই বিধানসভা ভোটের আগে বহিরাগত হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক দলের নির্মম কারসাজি নয় তো? 
এসবের বিহিত না করে নির্বাচনে যাওয়ার অর্থ, জেনেবুঝে গেরুয়া দলের ফাঁদে পা দেওয়া। কারণ, যতই রাজ্যে রাজ্যে সাফল্য আসুক বিজেপি বুঝে গিয়েছে, এবার আর তৃণমূল ভাঙিয়ে সিবিআই-ইডির জুজু দেখিয়ে, গরিবের দাওয়ায় নেতাদের পাত পেড়ে বাংলা দখল করার খোয়াব দেখা যাবে না। উত্তর দিতে হবে কেন বাংলার আবাস আর ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে রাখা হয়েছে নির্দয়ভাবে! প্রচার শুরুর আগে বলতে হবে ভোটে জিতলে গেরুয়া দলের মুখ্যমন্ত্রী কে? কোনও আগমার্কা আরএসএস না দলবদলু? বিজেপি’র কাছে উস্কানির বারুদ আছে, বিভেদের অস্ত্র আছে, কিন্তু বাঙালির সংস্কৃতিকে ভালোবেসে উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। বাংলায় তাই ভোটার তালিকার কেরামতি ছাড়া এক ইঞ্চিও এগতে পারবে না। উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ যেটুকু সংগঠন ছিল তাও ক্ষীয়মাণ। বাংলা ভাগের চক্রান্ত রাজ্যবাসী মেনে নেবে না। এই দলের কেউ কাউকে মানে না। এই পরিস্থিতিতে ঘি তুলতে শুধু আঙুল বাঁকালেই হবে না, শেষে শিশিটাই ভেঙে ফেলতে হবে। কয়েক বছর আগেও পূর্ব ভারতে গেরুয়া দলের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। মহারাষ্ট্রে সংগঠন চলত বালাসাহেব থ্যাকারের দয়ায়। মোদি রাজত্বে ত্রিপুরা, ওড়িশা, অসম, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং বকলমে বিহার আজ বিজেপি’রই শাসনে। বাকি শুধু বাংলা। তাই নীতি আদর্শ, গণতন্ত্রের কথা ভুলে বাংলা দখলে যে তারা মরিয়া হবে, তা বলাই বাহুল্য। কেন্দ্রে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার সুবাদে টাকার জোগানও কম নেই তাদের। হাওয়াই জাহাজের ধুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নোটও উড়বে। যে নোট তিনি ক্ষমতায় এসেই বাতিল করেছিলেন, সেই কালো টাকার রমরমাও দেখা যাবে আসন্ন নির্বাচনে। তবু বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি কি ধরা দেবে এক সাম্প্রদায়িক শক্তির অঙ্গুলি হেলনে? উত্তরটা সবার জানা হলেও চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ছাব্বিশ সালের মে মাস পর্যন্ত। একুশ সালের মতো বাঙালির স্বাভিমান ও অস্মিতা এবারও জিতে যাবে। বিজয় তিলক সবসময় সাহসীরই কপালেই শোভা পায়। তবে যাবতীয় বিভেদ ভুলে দলকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। বাংলাকে ভাতে মেরে কেউ ক্ষমতা দখল করতে পারেনি, পারবেও না। 

সম্পর্কিত সংবাদ