এই সাজানো চিত্রনাট্য আগেও দেখেছে বিশ্ব। পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমগুলি যা নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলে না। রাজনীতিবিদেরা যুদ্ধের দামামা বাজায়, নিরাপত্তার কথা বলে আগ্রাসনের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়। আগেরবার ছিল ইরাক। আর এবারে ইরান। খাতায় কলমে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্যরাষ্ট্র। তারা তাদের পারমাণবিক সম্ভার পরিদর্শনের জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) অনুমতি দিয়েছে। ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সব সময় নজরদারির মধ্যে থাকে। তবুও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার অভিযোগে ইরানের উপর বছরের পর বছর ধরে বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। গত ৩০ বছর ধরে তাদের উপর ইজরায়েল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ, ইজরায়েল এনপিটিতে স্বাক্ষরই করেনি। ইজরায়েল কখনও আইএইএকে তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলি পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। অনুমান করা হয়, ইজরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়্যারহেড রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রে শক্তিধর দেশ ইজরায়েল। দীঘদিন ধরেই তারা অসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রাণঘাতী কৌশল অবলম্বন করে আসছে। তারা ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে আসছে। তবুও কেউ তাদের নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। সে আমেরিকা হোক কিংবা ইউরোপ! গোটা বিশ্ব এই ভণ্ডামি দেখছে। আর প্যালেস্তাইনের জনগণ সেটি প্রতিদিন ভোগ করছে!
এই মুহূর্তে ইজরায়েলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তদন্ত চলছে। এটা কোনও তত্ত্ব কিংবা জল্পনা নয়। ইজরায়েলের হাতে গাজা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। শিশুদের দেহ খণ্ডবিখণ্ড হচ্ছে। গোটা পরিবার ধরে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। এক একটা তল্লাট পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। আর এসব ভয়ঙ্কর ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যে রাষ্ট্র দায়ী, পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত সেই রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রকে নজরদারির মধ্যে আনার দাবি জানাচ্ছে। ভাবুন, কী বিস্ময়কর ভণ্ডামি! গোটা দুনিয়ার মাতব্বররা আমাদের কী শেখাচ্ছে? নিয়মকানুন শুধু দুর্বলদের জন্য প্রযোজ্য। শেখাচ্ছে, কিছু রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে যেকোনও কিছু করতে পারে। এই কাজে সেই রাষ্ট্রগুলি বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত, সবচেয়ে শক্তিশালী জোটের প্রশ্রয় পায় এবং তাদের মদতদাতারা নীরব থাকে। যেসব সংবাদমাধ্যমে ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান একসময় দাবি করেছিল, ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে (যা পরে চরমভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল), সেসব সংবাদমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠান এখন ইরানের দিকে আঙুল তুলছে। ইরানের ক্ষেত্রে বা অন্য কোনও দেশের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়, সেটা কেন ইজরায়েলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় না? একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারাধীন। কেন সেই দেশ আমেরিকা-ইউরোপের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু নয়? ইজরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আছে, সেটা আতঙ্কের বিষয় নয়, অথচ ইরান পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলেছে—এমনটা কল্পনা করে আমরা কেন আতঙ্কিত হচ্ছি? এই দ্বিচারিতা বিস্ময়কর! এই প্রশ্ন তোলা মানে, ইরানের পক্ষে দাঁড়ানোর বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের ধারাবাহিক ও বিপজ্জনক অবক্ষয়ের বিষয়।
যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সত্যিই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে সব পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে যেসব রাষ্ট্রের কোনও স্বচ্ছতা নেই, যারা যুদ্ধাপরাধে জড়িত এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা উস্কে দেয়। ইজরায়েল যদি এভাবে তাদের হিংসা ও পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের জন্য প্রশ্নহীন সমর্থন পেতেই থাকে, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) অর্থহীন হয়ে পড়বে। আইএইএ নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। আর ভবিষ্যতে তারা যে ‘রেড লাইন’ বা বিপদের সীমারেখা টেনে দেবে, সেটা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই হবে না। মিথ্যা অজুহাত— কারও ক্ষেত্রে নিয়মের দোহাই, আর কারও ক্ষেত্রে দায়মুক্তি! এই পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান থেকে বিশ্বকে আরও একটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া যায় না। ইরাকে ব্যবহার করা সেই পুরনো চিত্রনাট্য বহু আগেই বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটি কি আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে ইরানে? এই দ্বিচারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কোনও চরমপন্থা নয়, বরং এটা উপেক্ষা করাই অন্যায়। এই অন্যায় মেনে নেওয়া মানে বিশ্বকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া!