Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

তিন কিশোরের কামাল

সিবিএসই পরীক্ষার ফল নিয়ে বিতর্কে তিন কিশোরের প্রতিবাদ। পরীক্ষার্থীদের জন্য নতুন ডিজিটাল পদ্ধতি নিয়ে উঠেছে জটিলতা। বিস্তারিত পড়ুন।

তিন কিশোরের কামাল
  • ১০ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত: জেন জি মানেই উদাসীনতা। রিল লাইফ। সমাজ বিমুখতা। হামেশাই এই কথাগুলি শোনা যায়। কিন্তু যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে—সেই আপ্তবাক্য যেন আবার স্মরণ করিয়ে দিল তিনটি কিশোর। জেন জি। দিল্লির ১৭ বছরের বেদান্ত শ্রীবাস্তব, ঝাড়খণ্ডের ১৮ বছরের সার্থক সিদ্ধান্ত, আর পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির ১৯ বছরের তরুণ এথিক্যাল হ্যাকার নিসর্গ অধিকারী। তাদের সমবেত প্রয়াস আরও একবার বেআব্রু করে দিল ঘুণ ধরা একটি সিস্টেমকে। 

Advertisement

নিট প্রশ্ন ফাঁসের মাঝেই সিবিএসই-র দ্বাদশের ফল নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে উত্তরপত্রের মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে। এতদিনের চেনা পদ্ধতি থেকে একটু আধুনিক হতে চেয়েছিল বোর্ড। তাতে দোষের কিছু নেই। সময়ের সঙ্গে আধুনিক হওয়াটাই দস্তুর। কিন্তু এদের দোষটা হল, ধৈর্য কম। সবেতেই তাড়াহুড়ো। পূর্ববঙ্গে একটা প্রবাদ আছে—ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়া। এটাও তেমনি। এখনই করতে হবে। তার জন্য প্রশিক্ষণ নাম কা ওয়াস্তে হলেও চলবে। ঠিক করেছি যখন এবারই হবে, তখন যেনতেনপ্রকারেণ করতেই হবে। এই পদ্ধতি প্রয়োগ এখনই বাস্তবসম্মত কি না, তা দেখার দরকার নেই। এতে পড়ুয়াদের কোনো ক্ষতি হবে কি না, সেটা ভাবার প্রয়োজন নেই। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল অন স্ক্রিন মার্কিং সিস্টেম (ওএসএম) এখন রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে সিবিএসই দ্বাদশের পড়ুয়া ও অভিভাবকদের।
নতুন ব্যবস্থা নিয়ে বোর্ডের যুক্তি কী ছিল? তারা জানিয়েছিল এটি একটি ডিজিটাল রূপান্তর। এই নতুন পদ্ধতিতে খাতা দেখার জন্য প্রচলিত খাতা-কলম বর্জন করা হবে। বদলে পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র ধাপে ধাপে স্ক্যান করে ডিজিটাল মাধ্যমে পরীক্ষকদের কম্পিউটারে পৌঁছে দেওয়া হবে। বোর্ড সাফ জানিয়েছিল, এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যেমন দ্রুত হবে, তেমনি গোটা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় থাকবে। কারণ সব খাতাই একই মানদণ্ডে নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করা হবে। এতে পরীক্ষকের পছন্দের উপর পরীক্ষার্থীর নম্বরের ভবিষ্যৎ ঝুলে থাকবে না। ২০২৬ সালের পরীক্ষাকে এই ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছিল। এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু গোল বাঁধল অন্যত্র। উপযুক্ত পরিকাঠামো ছাড়া হড়বড় করে কোনো কিছু করতে গেলে যা হয় আর কী। সিবিএসই দাবি করেছে, প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। পড়ুয়া তো বটেই অভিভাবকরাও বিষয়টি জানত। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, মাত্র এক মাসের একটা ড্রাই রান শুধু হয়েছিল। এটা সত্যি হলে তো সেটাকে ছেলেখেলা বলে। শিক্ষামন্ত্রকের অনুমোদন ছাড়া সিবিএসই এত বড়ো সিদ্ধান্ত নিয়েছে? এটা বিশ্বাসযোগ্য? একজন পড়ুয়ার কেরিয়ারের সবচেয়ে বড়ো সন্ধিক্ষণ হল ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষা। তাঁর কেরিয়ার কোন পথে যাবে, সবটাই ঠিক হয়ে যায় এই পরীক্ষার পর। এই পরীক্ষার নম্বর যেমন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, তেমনি নষ্টও করতে পারে। এত বড়ো পরীক্ষার জন্য এমন ঝুঁকি কেন নেবে বোর্ড? কেন সময় নিয়ে নতুন ব্যবস্থার প্রয়োগ হবে না? 
সিবিএসই ফল তো তড়িঘড়ি প্রকাশ করল। তখন কিছু ধরা যায়নি। বহু পরীক্ষার্থীই মন পছন্দ মার্কস না পেয়ে পুনর্মূল্যায়নের পথে হাঁটে। সেখানেই পোর্টালে গিয়ে পড়ুয়ারা দেখতে পেল নিজেদের স্ক্যান করা উত্তরপত্র চেনাই যাচ্ছে না। এতটাই ঝাপসা। এটা নিজের হাতের লেখা না অন্যের, সেটা নিয়েই কনফিউশন দেখা দিল। তার উপর এই বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগের বিভিন্ন সাবজেক্ট যেমন অঙ্ক, কেমিস্ট্রি, ফিজিক্সে স্টেপ নম্বর থাকে। সেখানে কোথাও ধাপ কেটে গিয়েছে, কোথাও আবার ডায়াগ্রাম অস্পষ্ট। কোথাও পুরো পৃষ্ঠা কালো। এহেন অবস্থায় প্রথম বোমাটি ফাটায় বেদান্ত শ্রীবাস্তব নামে দিল্লির এক পরীক্ষার্থী।
নিজের ফল আশানুরূপ না হওয়ায় সে রিভিউয়ের জন্য খাতা দেখতে চায়। আর তখনই সামনে আসে বিস্ফোরক তথ্য। সে দেখে যে উত্তরপত্র তাকে দেখানো হয়েছে, সেটা তার নিজেরই নয়। স্বভাবতই সে যোগাযোগের চেষ্টা করে বোর্ডের সঙ্গে। কিন্তু কোনো ফল মেলেনি। তারপরই বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে বেদান্ত। এই একটা পোস্টেই শোরগোল পড়ে যায়। ভাইরাল পোস্টের পরই বহু পরীক্ষার্থীই একই পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে ভক্তকুল আসরে নেমে পড়ে। বেদান্তকে পাকিস্তানের চর, দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করা হয়। যেন একটা সিস্টেমের গলদে নিজের ক্ষতি দেখেও চুপ থাকতে হবে। কারণ সরকারের রয়েছেন মোদিজি। কেউ বলেছেন, পুরোটাই ফেক। ভাবুন একবার। একটা ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষার্থী। নম্বর পায়নি বলে পুনর্মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখেছে এটা নিজের খাতাই নয়। কিন্তু সে নিয়ে প্রশ্ন করাটাই ওই কিশোরের অপরাধ হয়ে গিয়েছে! তাকে ট্রোল আর অপমান করা হল। স্রেফ একটা প্রশ্ন তোলার অপরাধে। রাজ্যের শিলিগুড়ির ছেলে নিসর্গ একধাপ এগিয়ে আসে। সে স্পষ্টই জানায়, বোর্ডের এই সাইটটি যে হ্যাক করা যায়, সেটি অনেক আগেই জানিয়েছিল। কিন্তু বোর্ড কানেই তোলেনি। কীভাবে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই পোর্টাল হ্যাক করা যায়, সেটি প্রমাণও করে দিয়েছিল নিসর্গ। পরিষ্কার জানিয়েছিল হাজার হাজার উত্তরপত্রের অ্যাকসেস তার কাছে রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড়ো বিস্ফোরণটা ঘটিয়েছে ঝাড়খণ্ডের সার্থক।
সার্থক দেখিয়েছে, সিবিএসই দায়িত্ব দিয়েছিল কোয়েম্পট এডুটেক বলে একটি সংস্থাকে। এই সংস্থার আগের নাম নাকি ছিল গ্লোবেরানা টেকনোলজিস। ২০১৯ সালে তেলেঙ্গানার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম হয়। অভিযোগ, সেখানে যুক্ত ছিল গ্লোবেরানা। মোট ২৩ জন পড়ুয়া এর জেরে আত্মহত্যা করে। এই বিতর্কের জেরে তদন্ত কমিটি গঠন করে তেলেঙ্গানা সরকার। সেই কমিটি গ্লোবরানার নানাবিধ অসঙ্গতি খুঁজে পায়। তারপরই ওই সংস্থা নাম বদল করে হয় কোয়েম্পট এডুটেক। অর্থাৎ, একটি বিতর্কিত সংস্থাকেই ফের দায়িত্ব দেয় সিবিএসই। শুধু তাই নয়, অভিযোগ, কোয়েম্পটকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য টেন্ডারেও ব্যাপক নিয়মের বদল ঘটায় তারা। টিসিএসের মতো প্রতিষ্ঠিত সংস্থাকে দায়িত্ব না দিয়ে ঘুরপথে বেআইনিভাবে এমন একটি সংস্থার হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া কেন? এর উত্তর কে দেবে?
সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও হাজির হয়েছিল সার্থক। সেখানে সংসদীয় কমিটি ও সার্থকের প্রশ্নে রীতিমতো দিশাহার অবস্থা হয় তৎকালীন চেয়ারম্যান রাহুল সিংয়ের। একটা ১৭-১৮ বছরের ছেলের প্রশ্নের নাকি কোনো জবাবই দিতে পারেননি দুঁদে আইএএস অফিসার। ওএসএম নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকায় সামাল দিতে নামে ক্যাবিনেট সেক্রেটারিয়েট। গড়া হয়েছে এক সদস্যদের একটি তদন্ত কমিটি। ক্যাপাসিটি বিল্ডিং কমিশনের চেয়ারপার্সন শ্রীমতী এস রাধা চৌহানের সভাপতিত্বে এই কমিটি এক মাসের মধ্যে তদন্ত করে কেন্দ্রকে রিপোর্ট জমা দেবে। বিষয়টির গুরুত্ব যে কতটা সেটা বোঝা যায়। কেন না শিক্ষামন্ত্রক নয়, খোদ কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিবালয় ওএসএম নিয়ে তদন্ত করবে। শুধু তাই নয়, ওএসএম বিতর্ক বাড়তে থাকায় সিবিএসই’র চেয়ারম্যান রাহুল সিং এবং সচিব হিমাংশু গুপ্তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। 
কিন্তু মনে রাখা উচিত, একটি পদের রদবদলে ব্যবস্থা বদলে যায় না। শীর্ষ পদাধিকারীদের আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা নয়, পড়ুয়াদের প্রতি সহমর্মিতা থাকাটা সবার আগে জরুরি। দেখলেন না নিট বাতিল হওয়ার পরেও এনটিএ প্রধান কেমন উচ্চস্বরে প্রশ্ন ফাঁস অস্বীকার করে গেলেন। তিনি নিজেও তো একজন অভিভাবক। তিনি জানেন না, এই সব প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য পড়ুয়ারা কতটা জান দিয়ে পড়ে? এই ধরনের ঘটনায় তাঁরা মানসিকভাবে কতটা ভেঙে পড়ে? আগামী ২১ জুনের পরীক্ষার প্রশ্নও যে ফাঁস হবে না, সে গ্যারান্টি কি তিনি দিতে পারবেন?। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান কোনো নৈতিক দায় নিয়েছেন? অথচ খেয়াল করে দেখুন দেশের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী নিজে একসময় নৈতিক দায় নিয়ে মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। মনমোহন জমানায় ইস্তফা দিয়েছিলেন শিবরাজ পাতিল। অটলবিহারীর সময়ে নীতীশ কুমার। সে সব দিন এখন অতীত। এখন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার দিন। দায়িত্ব চাই, ক্ষমতা চাই। কিন্তু দায় নেব না। একটা পরীক্ষা ঠিকভাবে আয়োজনের জন্য বায়ুসেনাকে ডাকা হচ্ছে। ভাবা যায়! এটা এনটিএ’র ব্যর্থতা নয়? কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দু’টি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা শুধু কয়েকজন পড়ুয়া বা অভিভাবককে হতাশ করেছে এমন নয়, নাগরিক সমাজই হতাশ। সরকার এখন বলছে, প্রধানমন্ত্রী পুরো বিষয়ে নজর রাখছেন। আমার দু’টি প্রশ্ন আছে? সব কিছুতেই কি প্রধানমন্ত্রীকে নজর রাখতে হবে? তাহলে বাকি মন্ত্রীদের দরকার আছে কি? আর চোর পালানোর পর সরকারের টনক নড়তে হল?  
আমাদের দেশের একটা সাধারণ ভাবনা রয়েছে— প্রতিবাদ করে কী হবে? কোনো কিছু বদলাবে না। যা ছিল তাই থাকবে। কিন্তু  এই ভাবনার স্রোতের উলটো পথে হাঁটল তিন তরতাজা কিশোর। তারা দেখিয়ে দিল, জেন জি মানেই শুধু রিল দুনিয়া নয়। তারা সত্যকেও সবার সামনে  নির্দ্বিধায় নিয়ে আসতে পারে। এটাই তাদের কামাল।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ