Bartaman Logo
১৯ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রামকৃষ্ণ

কলিকাতার তিন ক্রোশ উত্তরে গঙ্গাতীরে দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি। প্রায় আশি বৎসর আগে রামকৃষ্ণদেব সেখানে ছিলেন

রামকৃষ্ণ
  • ২৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলিকাতার তিন ক্রোশ উত্তরে গঙ্গাতীরে দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি। প্রায় আশি বৎসর আগে রামকৃষ্ণদেব সেখানে ছিলেন। এমন শিক্ষিত লোক ভারতে নেই, যে তাঁর নাম শোনেনি। পৃথিবীর যত বড় বড় লোক, প্রায় সকলেই আজকাল রামকৃষ্ণের কথা জানেন ও তাঁকে ভক্তি করেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ছবি দেখেনি, এমন ছেলে মেয়ে বাংলা দেশে খুব কমই আছে। আশি বৎসরও হয়নি রামকৃষ্ণ শরীর ত্যাগ করেছেন। কিন্তু এই অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর নাম সারা জগতে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি যে-ভাবের মানুষ ছিলেন, সেরূপ মানুষের নাম এত শীঘ্র ছড়িয়ে পড়া কম আশ্চর্যের বিষয় নয়।

Advertisement

দক্ষিণেশ্বরে মা কালীর মন্দির। রামকৃষ্ণ করতেন মায়ের পূজো। তাঁর অসাধারণ ভক্তিতে মা স্থির থাকতে পারেননি, তাঁকে দর্শন দিয়েছিলেন। আমরা আমাদের মাকে যেমন সর্বদা দেখি, মার সঙ্গে কথা বলি, মা যেমন বলেন তেমনি চলি, রামকৃষ্ণও তেমনি মা কালীকে সর্বদা দেখতে পেতেন, মার সঙ্গে কথা বলতেন, মা তাঁর সঙ্গে কথা কইতেন, মার কথা ছাড়া রামকৃষ্ণ এক পা-ও চলতেন না।
হিন্দুদের মধ্যে অনেক ভাগ আছে, অনেক মত আছে। যারা মা কালীর পূজো করে তারা শাক্ত। যারা বিষ্ণুকে কালীর পূজো করে তারা বৈষ্ণব। শিবের পূজকরা শৈব। ব্রহ্মের উপাসকগণ ব্রাহ্ম। আরো কত মত যে হিন্দুদের মধ্যে আছে তা ব’লে শেষ করা যায় না। রামকৃষ্ণের মনে সাধ হয়েছিল, তিনি সব মতে ভগবানের সাধনা করবেন। মায়ের ইচ্ছায় তাই হ’ল। তিনি এক এক ক’রে প্রত্যেকটি মতে সাধনা আরম্ভ করলেন। মায়ের আদুরে ছেলে তিনি। তাঁর যখন যা আবশ্যক হয়েছে, সবই মা যোগাযোগ ক’রে দিয়েছেন। তাঁর যখন যেমন সাধনার ইচ্ছা হয়েছে, সে রকম গুরু তাঁর কাছে তখন এসেছেন। যে-সব জিনিস তাঁর দরকার হয়েছে, তাই তিনি পেয়েছেন। সাধনায় সিদ্ধিলাভ ক’রে তিনি বললেন—সব ধর্মই সত্য। সব ধর্মই এক ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যায়। ঈশ্বর এক, কিন্তু তাঁর কাছে যাবার নানা পথ। ধর্মগুলো ঈশ্বরের কাছে যাবার পথ মাত্র। যত মত তত পথ।
কলিকাতার অনেক বড় বড় বিদ্বান লোক তাঁর নাম শুনে দক্ষিণেশ্বরে যেতে আরম্ভ করলেন। তাঁকে যে একবার দেখেছে, তাঁর কথা একবার যে শুনেছে, জীবনে সে তাঁকে ভুলতে পারেনি, এমন একটা জিনিস রামকৃষ্ণের মধ্যে ছিল। তিনি সোজা সোজা কথায় ছোট ছোট গল্পে এমন সুন্দর উপদেশ দিতেন, লোক মুগ্ধ হ’য়ে যেত। পণ্ডিতেরা ভুলে যেতেন তাঁদের বিদ্যার অভিমান, ধনীরা ভুলে যেত ধনের অহংকার, শোকাতুর ভুলে যেত দারুণ পুত্রশোক। ধর্মপিপাসু তাঁর উপদেশ শুনে শান্তিলাভ করত। পাপী তাপী তাঁর কাছে গিয়ে হৃদয়ের জ্বালা জুড়াত। কিন্তু সব চেয়ে মজার কথা এই, রামকৃষ্ণ লেখাপড়া বিশেষ জানতেন না। তথাপি ধর্মের যত বড় কঠিন প্রশ্নই হ’ক না কেন, তিনি জলের মতো সকলকে বুঝিয়ে দিতেন। কারু মনে তিনি দুঃখ দিতেন না বা কাউকে নিরাশ করতেন না, যে যেমন তাকে তেমনি উপদেশ দিতেন। তাঁকে সকলে রামকৃষ্ণ পরমহংস বলে। 
স্বামী প্রেমঘনানন্দের ‘রামকৃষ্ণের কথা ও গল্প’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ