Bartaman Logo
২৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভোটারদের সামনে ফের খাঁড়া!

ভারতের ভোটার তালিকায় ৯০ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী জন্ম শংসাপত্র যাচাই করবে রাজ্য সরকার। বিস্তারিত পড়ুন।

ভোটারদের সামনে ফের খাঁড়া!
  • ২৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারতে শুধু বৈধ নাগরিকরাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। নাগরিকের ভোটেই তৈরি হয় রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকার। এছাড়া পঞ্চায়েত এবং পুরসভার মতো স্থানীয় সরকারও নাগরিকের প্রত্যক্ষ ভোটে তৈরি হয়। অর্থাৎ স্থানীয় প্রশাসন থেকে রাজ্য এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় নাগরিকের প্রত্যক্ষ ভূমিকা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। আর এখানেই প্রশ্ন, এই সাংবিধানিক ব্যবস্থা মতে নাগরিক কে? যিনি ভারতে জন্মগ্রহণ করে এই দেশে বসবাস করেন এবং দেশগঠন প্রক্রিয়ায় নানাভাবে যুক্ত। জন্মের সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ হল—সরকার স্বীকৃত জন্ম শংসাপত্র বা বার্থ সার্টিফিকেট। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি ইস্যু করার অথরিটি কার? এই ক্ষমতা দীর্ঘদিন শুধুমাত্র উপযুক্ত সরকারি অফিসারদের হাতে ছিল। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট জমানায়, পঞ্চায়েত প্রধান এবং পুর চেয়ারম্যানদের (মেয়র) হাতে তা তুলে দেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, জনপ্রতিনিধিদের একাংশ ওইসময় থেকেই এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। মূলত ‘রাজনৈতিক ফায়দা’ তুলতেই তা করা হয়েছে। নথি বণ্টনে দুর্নীতি রুখতে রাজ্যের নয়া বিজেপি সরকার জনপ্রতিনিধিদের সেই বিশেষ ক্ষমতা কেড়ে নিল। ফের সরকারি অফিসারদের উপর ভরসা রাখল নবান্ন। আপাতত পঞ্চায়েত এবং পুরসভা ধরে ডিএমরা ঠিক করে দেবেন, কোন অফিসার এই দায়িত্ব পালন করবেন। সারা রাজ্যের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে স্বাস্থ্যদপ্তর শীঘ্রই একটি বিজ্ঞপ্তি জারি হবে। 

Advertisement

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে সংশোধিত ভোটার তালিকা তৈরির সময় অবৈধ ভোটার বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। ওই উদ্দেশ্যে যে এসআইআর করা হয়, তাতে রাজ্যে একলপ্তে মোট ৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৩৫ জন ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় রাজ্যের প্রারম্ভিক ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ থেকে কমে ৬ কোটি ৭৭ লক্ষে নেমে আসে। এত নাম বাদ পড়ার কারণ একাধিক: মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত বা একাধিক জায়গায় নাম থাকা ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট নথির ম্যাপিং বা শুনানিতে চিহ্নিত অমিল বা ‘অ্যাজুডিকেশন’। প্রাথমিক খসড়া তালিকায় প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়ে, যা পরবর্তী সংশোধনে বেড়ে হয় প্রায় ৯১ লক্ষ। পরে অবশ্য ট্রাইবুনালে আরজি জানাবার সুযোগ দেওয়া হয়। ওই প্রক্রিয়ায় গৃহীত হয় ২৭ লক্ষ আবেদন। কিন্তু তার নিষ্পত্তির খতিয়ান মোটেই উজ্জ্বল নয়। অন্যদিকে, ভোটার তলিকায় নাম না-থাকায় নানাভাবে বিপাকে পড়েছেন অসংখ্য মানুষ। কারও রেশন বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কেউ আবার বার্ধক্যভাতা বা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাচ্ছেন না। আয়ুষ্মান ভারত-এর সুবিধাও হাতছাড়া হচ্ছে তাঁদের। এমনকি উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় পাচ্ছেন কিছু মেধাবী তরুণ-তরুণী। 
আমরা জানি, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ইসিআই অনেকগুলি নথি দেখাতে বলেছিল। সেগুলির মধ্যে এক নম্বরে ছিল জন্ম শংসাপত্র। রাজ্যজুড়ে জন্ম শংসাপত্রের চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে যায় তখনই। তৎকালীন রাজ্য সরকারের নির্দেশে স্থানীয় সরকারগুলি (পঞ্চায়েত/ পুরসভা/ কর্পোরেশন) ঢালাও জন্ম শংসাপত্র ইস্যু করেছিল। নতুন ডবল ইঞ্জিন সরকারের কাছে খবর, ওইসময় বহু অযোগ্য ব্যক্তিও জন্ম শংসাপত্র বাগিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ অসংখ্য অবৈধ নথি বণ্টিত হয়ে গিয়েছে। নবান্ন সেগুলি বাতিল করার পাশাপাশি দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার জন্য জন্ম শংসাপত্র ইস্যু করার নিয়মে তাৎপর্যপূর্ণ বদল আনা হয়েছে আচমকাই। ১৯৯৭ সাল থেকে পঞ্চায়েত এবং ২০০০ সাল থেকে পুরসভা মারফত বণ্টিত জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্র ফের যাচাই করবে রাজ্য সরকার। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪৭ হাজার ‘ডিলেড’ বার্থ সার্টিফিকেট যাচাই করিয়েছে তারা। তার মধ্যে ২৫ শতাংশই ‘ভুয়ো’ চিহ্নিত হয়েছে! এছাড়া ইতিমধ্যেই ডিজিটাইজ হয়ে যাওয়া ১১ লক্ষ ২৪ হাজার শংসাপত্রের মধ্যে ভুয়ো মিলেছে ১ লক্ষ ৮০ হাজার। এই পরিস্থিতিতে জন্ম শংসাপত্রের স্বচ্ছ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতেই বেনজির অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য। ভুয়ো শংসাপত্রের তথ্যাদি পাঠানো হবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং ফরেন রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসে। অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের ‘ডিপোর্ট’ করার মতো চরম পদক্ষেপ গ্রহণেও এই তথ্যভাণ্ডার যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে তা সহজ অনুমান। আরও আশঙ্কা, পরবর্তী ভোটার তালিকার উপরেও খাঁড়া নেমে আসতে পারে। এসআইআর পর্বের ভোগান্তি যন্ত্রণার অবসান এখনো হয়নি। তার মধ্যেই এই নতুন যন্ত্রণার ইঙ্গিত। স্বচ্ছতার অভিযান ভালো। তবে দেখতে হবে তা যেন নিছক ধুয়ো না হয়। নতুন কিছু করে দেখানোর নেশায় যেন একজনও নিরপরাধ ব্যক্তি বা পরিবারের উপর শাস্তির খাঁড়া নেমে না আসে। আর রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় পরিচয় যেন বড়ো না হয়ে ওঠে, নিশ্চিত করতে হবে এটাও। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ