Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নজর দেওয়া দরকার

রাজ্যে মিড ডে মিলের সংকট ও ছাত্র ভরতির সংখ্যা ৯ লক্ষ কমে যাওয়ার খবর। নতুন সরকারের বাজেটের দিকে নজর। বিস্তারিত পড়ুন।

নজর দেওয়া দরকার
  • ৯ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ছবিটা আশাপ্রদ তো নয়ই, বরং যথেষ্ট উদ্বেগের। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২০-২১ সালে এরাজ্যে সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলে ছাত্র ভরতির সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১৯ লক্ষ। পাঁচ বছর পর ২০২৫-২৬-এ তা নেমে এসেছে ১ কোটি ১০ লক্ষের কাছে। গত এক বছরে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিকে শতাংশের বিচারে ছাত্র ভরতি কমেছে যথাক্রমে ৪ এবং ৬ শতাংশ। এক বছরে স্কুল বন্ধের সংখ্যা ৭৫০টি। এরাজ্যে গত শিক্ষাবর্ষে ক্লাস হওয়ার কথা ছিল ২৪৮ দিন। কিন্তু গরমের ছুটি ও দুর্গাপুজোর ছুটির দিন বেড়ে যাওয়ায় ক্লাস হয়েছে ৩৩ দিন কম। ২১৫ দিন। এই অবনমনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পালটেছে রাজ্যের মিড ডে মিলের ছবিটাও। যেমন, গত শিক্ষাবর্ষে যত পড়ুয়া স্কুলে ভরতি হয়েছে, গড়ে তার ৬৭ শতাংশ মিড ডে মিল পেয়েছে। অন্যভাবে বললে, প্রাথমিকে মিড ডে মিল খাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এক বছরে কমেছে ৫ শতাংশ, উচ্চ প্রাথমিকে ৬ শতাংশ। সরকারের দেওয়া এই তথ্য দেখলে মনে হতে পারে, তাহলে কি মিড ডে মিল (বর্তমান নাম পিএম পোষণ অভিযান) চালুর আসল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হতে বসেছে! রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন’-এর সরকার গঠিত হওয়ার পরেও কি ছবিটা বদলাবে না? 

Advertisement

মিড ডে মিল মানে দুপুরে রান্না করা খাবারের বন্দোবস্ত। অভাব অনটনের জ্বালায় জর্জরিত দেশের গরিব, পিছিয়ে পড়া, প্রান্তিক পরিবারের সন্তানরা খাবারের টানে স্কুলমুখী হবে—এই মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ২০০১ সালে গোটা দেশে এই প্রকল্প চালু হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে ২০০৩ সালে। এরাজ্য তো বটেই, গোটা দেশেই স্কুলের সংখ্যা বেশি গ্রামাঞ্চলেই। স্বভাবতই ছাত্রছাত্রীদের সিংহভাগ কৃষক-খেতমজুর, ভ্যানচালক, ইটভাটায় কাজ করা শ্রমিক ও কৃষক পরিবারের সন্তান। এদের মুখে অন্তত একবেলা রান্না করা পুষ্টিকর খাবার তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করলে শিক্ষার প্রাথমিক আলোটুকু পৌঁছে যাবে ঘরে ঘরে। গোটা দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে ১৯৯৫ সালের ১৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় সরকার প্রথম ‘জাতীয় পুষ্টি সহায়তা’ কর্মসূচির অধীনে মিড ডে মিল চালুর কথা ঘোষণা করে। কিন্তু ২০০১ সালে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, প্রতিটি রাজ্যে সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে রান্না করা খাবার বাধ্যতামূলকভাবে দিতে হবে। গোড়ার দিকে এই প্রকল্প যথেষ্ট সাড়া জাগালেও পরবর্তীকালে গোটা দেশের সঙ্গে এই রাজ্যেও প্রকল্পের সাফল্য, রূপায়ণ ও অর্থবরাদ্দ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়। যার পরিণতিতে মিড ডে মিল নিয়ে এখন আর সরকারি তরফে অগ্রাধিকারের বার্তা শোনা যায় না। 
মিড ডে মিলের খাবারে পুষ্টির পরিমাণ এবং গুণমানে অবহেলার ছাপ বহু ক্ষেত্রে স্পষ্ট। কাগজ-কলমে এখন সপ্তাহে দু’দিন ডিম ভাত, দু’দিন তরকারি ভাত, একদিন সয়াবিনের তরকারি ভাত এবং একদিন ডাল আলুভাতে দেওয়ার কথা। এ জন্য বরাদ্দ প্রাথমিকে ৬.৭৮ টাকা এবং উচ্চ প্রাথমিকে ১০.১৭ টাকা। রান্নার গ্যাসের দামও এই বরাদ্দের মধ্যে ধরা রয়েছে। ঘটনা হল, বর্তমানে মূল্যবৃদ্ধি ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই সামান্য বরাদ্দে পড়ুয়াদের পাতে ঠিকমতো খাবার তুলে দেওয়া যাচ্ছে না। যা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। ফাঁকি থেকে যাচ্ছে বিস্তর। এই অর্থে যে রান্না করা খাবার দেওয়া যায় না, তা অন্য সকলে বুঝলেও বুঝতে পারেন না সরকারি কর্তারা! ফলে যত দিন যাচ্ছে, মিড ডে মিলের উদ্দেশ্য, বিধেয় সবই বড়োসড়ো প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় রাজ্যের নতুন ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের কাছে প্রত্যাশা বাড়ছে। প্রকল্পের অংশীদার যেহেতু কেন্দ্র-রাজ্য দুই সরকারই তাই নবান্নের নতুন কর্তাদের কাছে শিক্ষক মহলের একাংশের দাবি, অর্থের ঘাটতি পোষাতে বাড়তি টাকা বরাদ্দ করুক রাজ্য, যাতে প্রতিটি পড়ুয়া ন্যূনতম পুষ্টিকর খাবার পেতে পারে। স্কুল শিক্ষার সঙ্গে যুক্তদের যুক্তি, অন্নপূর্ণা যোজনা বা অন্যান্য ভাতার মতো বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে অর্থবরাদ্দ দ্বিগুণ ঘোষণা করেছে নতুন সরকার। একইভাবে মিড ডে মিলেও রাজ্যের বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হোক। ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছাতে এবং স্কুলছুট আটকাতে এটা করা বেশি জরুরি। যদিও খবরে প্রকাশ, খুব সম্প্রতি দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বৈঠকে চলতি অর্থবর্ষে মিড ডে মিলের বরাদ্দ নাকি কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অঙ্কটা প্রায় ৭৭ কোটি টাকার মতো। তবু আশা ছাড়তে রাজি নয় শিক্ষক সমাজ। তাঁদের আশা বাড়াতে সাহায্য করেছে মা আহার প্রকল্পে নতুন সরকারের উদ্যোগে ৫ টাকায় মাছ ভাত খাওয়ানোর ব্যবস্থাটি। অনেকের মধ্যেই যা খুব সাড়া ফেলে দিয়েছে। তাই স্কুল পড়ুয়াদের মিড ডে মিলে পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা এই সরকার করবে বলেই অনেকের মনেই প্রত্যাশা বেড়েছে। কারণ, এই পড়ুয়ারাই আগামী দিনে জাতির ভবিষ্যৎ। আগামী ২২ জুন রাজ্যের নতুন সরকার পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করতে চলেছে। সেখানে মিড ডে মিলের জন্য কোনো সুখবর থাকে কি না সেদিকেই তাকিয়ে শিক্ষকরা।

সম্পর্কিত সংবাদ