Bartaman Logo
২২ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু

শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কের অবনতি নিয়ে কোচবিহারে মামলা হয়েছে। শিক্ষকদের শাসনের অধিকার নিয়ে আলোচনা চলছে। বিস্তারিত পড়ুন।

গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু
  • ২২ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়: করিডরে যাঁদের পায়ের আওয়াজে বুক ধড়ফড় করে উঠত, ক্লাসরুমের দরজায় যাঁদের বেত হাতে ঢুকতে দেখে মুখ শুকিয়ে আমসি, মনে হত পড়াশোনা ছেড়েই দেব ছাই, আসব না স্কুলে, কিন্তু স্কুলজীবনের পর সেই বেতওয়ালা লোকগুলির সঙ্গে হঠাৎ দেখা হলে কেন মাঝ রাস্তাতেও পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে হয়? কেন মনে হয়, আজও লোকটা বলুক, বদমাইশি করছিস না তো। করলে থাপ্পড় কিন্তু। ছোটোবেলায় তাঁদের সেই থাপ্পড়গুলি, পিঠে বেতের সপাং, বেতের মতোই সিধে রেখে দিয়েছে জীবনটাকে। সে শাসন না থাকলে সংসারে পথ চলা এত সোজা-সরল-শক্ত-পোক্ত হত না। আদরে-শাসনে মনের যে প্রতিমা তাঁরা গড়ে দিয়েছিলেন, তারই ডিভিডেন্ট নিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে মোটামুটি ঠিকঠাকই চলে যাচ্ছে গোটা জীবন।

Advertisement

আজ স্নেহ-শাসনে জড়িয়ে থাকা সে সম্পর্ক 
ক্রমশ দূরে সরছে। কেন সরছে? সে প্রসঙ্গে ঢোকার আগে সাম্প্রতিক দু’টি ঘটনার দিকে একবার নজর না দিলেই নয়। 
এক নম্বর ঘটনাটি ঘটেছে কোচবিহারের মাথাভাঙা হাইস্কুলে। দেরি করে আসার কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষক তন্ময় চক্রবর্তী শাসন করেছিলেন এক ছাত্রকে। তা নিয়ে পুলিশে অভিযোগ। এবং আদালত অবধি গড়ায় বিয়য়টি। মামলা চলাকালীন বিচারক গোটাটা শোনার পর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘শিক্ষকরা শাসন করেন বলেই আমরা আজ এই জায়গায় পৌঁছেছি।’ দু’নম্বর ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়। বিজেপির বিধায়ক অসীম সরকার বলেছেন, ‘পাশ-ফেল প্রথা ও মাস্টারমশাইয়ের হাতে ছড়ি না থাকলে ছাত্ররা ভালো মানুষ হতে পারে না।’ এই দু’টি ঘটনা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু মূল্যবোধের জায়গায় দু’টি উক্তিরই সামাজিক অভিঘাত কম নয়।
এটা আমরা কেউই অস্বীকার করতে পারি না, শিক্ষকরা না থাকলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইএএস, আইপিএস, শিক্ষক, অধ্যাপক, সাংবাদিক হওয়া যায় না। বস্তুত কিছুই হওয়া যায় না। সভ্যতার যে মানদণ্ড সমাজে নির্দিষ্ট তার উচ্চতম শৃঙ্গে অবস্থান শিক্ষকেরই। সামাজিক ভিত্তি তিনিই স্থাপন করেন আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই দেখানো পথেই হাঁটে। সমাজের এটাই দস্তুর। সভ্যতার অগ্রগতি এই নিয়মেই চলে। যদিও গত কয়েক শতকে অগ্রগতির এ পথে বিস্তর চোরকাঁটা ছড়িয়ে হাঁটতে গেলেই পায়ে ফুটছে, যন্ত্রণা দিচ্ছে। ফলে ক্রমশ অগম্য হয়ে উঠছে সে পথ। এরই হাত ধরে তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। সে সংকট মর্মান্তিক।
শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কের অবনতিমূলক দৃশ্যটি কী? এ ছবি দেখায়, অবলীলায় শিক্ষকদের হেনস্তা করা যায়। এমনকি গায়ে হাতও তোলা যায়! সম্পর্কের সবথেকে ক্ষতিকারক দিকটি হল, শিক্ষকদের শাসনের অধিকার নির্দ্বিধায় কেড়ে নেওয়া যায়। শিক্ষক পড়ানোর সময় বেত বের করলে পালটা লাঠি বের করে ফেলেন কোনো কোনো অভিভাবক। যে কারণে শ্রদ্ধা-সৌহার্দ্য-শাসন-ভালোবাসার পরম্পরা ক্ষয়ে ক্ষয়ে পাতলা হয়ে গিয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবমূল্যায়নই এখন ধারাবাহিকতা।
শিক্ষক, ছাত্র ও অভিভাবকের মধ্যে বিশ্বাসের ত্রিভুজই একসময় ছিল শিক্ষার ভিত্তি। সেখানে আজ অনেক সময়ই সন্দেহ, অভিযোগ ও আইনি আশঙ্কা জায়গা নিয়েছে। এখন অধিকাংশ শিক্ষক শাসন করতে শঙ্কিত। আবার ছাত্রদের একাংশও শিক্ষককে শুধুমাত্র একজন পরিষেবা প্রদানকারী হিসাবে দেখতে শিখছে। এ খুব একটা স্বস্তির কথা নয়। দ্বিতীয়ত, মানসিকতার পরিবর্তন এসেছে। বহু অভিভাবক সন্তানের ভুল স্বীকার করতেই রাজি নন। তাঁরা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। ফলে ছাত্রের কাছেও তার নিজের ভুলের গুরুত্ব যাচ্ছে কমে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তির যুগে তথ্য সহজলভ্য কিন্তু মূল্যবোধ হয়েছে দুর্বল। মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যম শিশুদের মনোযোগ, ধৈর্য ও শ্রদ্ধাবোধকে একাধিক দিক দিয়ে প্রভাবিত করছে। শুধুমাত্র শিক্ষকই তার জ্ঞানের একমাত্র উৎস নন। ফলে প্রথাগত শিক্ষার গুরুত্ব যাচ্ছে হারিয়ে। তার হাত ধরেই হারাচ্ছে শিক্ষকদের গুরুত্ব। ফলে স্নেহমিশ্রিত কঠোরতা, শৃঙ্খলা শেখানোর দৃঢ়তা এবং ভুল শুধরে দেওয়ার সদিচ্ছা কমছে শিক্ষকদেরও। আর এসব নেই বলেই প্রকৃত শিক্ষা থেকে যাচ্ছে অসম্পূর্ণ।
এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের মূল কাঠামোটিকে ধ্বংস করছে। শ্রদ্ধার আসন থেকে নামিয়ে শিক্ষকদেরও ভোগবাদী দুনিয়ার অংশীদার হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে, নড়বড়ে করে তোলার চেষ্টা চলছে সামাজিক কাঠামো। খুব সুচারুভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা চলছে জনমানসে। পুঁজিবাদী ‘শাসনব্যবস্থা’ শিক্ষাকে ভোগ্যপণ্য হিসাবে প্রতিপন্ন করতে চেয়ে শ্রদ্ধার পরিবর্তে আর্থিক লেনদেনকে প্রাধান্য দিতে চাইছে। তারই ফসল এই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিভঙ্গি। যার অনিবার্য ফলশ্রুতি, শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি। আন্তরিকতার অভাব। এবং শিক্ষাকে ভোগ্যপণ্য হিসাবে শুধুমাত্র তুলে ধরার চেষ্টা। এই কর্মফলেরই ফসল সরকারি স্কুলগুলির ক্রমাবনতি, শিক্ষক-ছাত্র সংখ্যা কমে যাওয়া, সর্বোপরি বন্ধ হয়ে যাওয়া। 
এরকম পরিস্থিতি কি তৈরি হওয়ার কথা ছিল? যে অভিভাবকরা উঠতে বসতে নিজেদের ছেলে-মেয়েদের বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ দেন। মহাপুরুষদের জীবনী পড়তে বলেন। তাঁদের কি মনে পড়ে, ছোটোবেলায় পড়া লেখাগুলি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কঠোর শৃঙ্খলার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু তাঁর কঠোরতার ভিতরে মানবতাই ছিল। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, শিক্ষা হল মানুষের ভিতরে যে পূর্ণতা প্রথম থেকেই বিদ্যমান, তারই প্রকাশ। সেই পূর্ণতার প্রকাশ ঘটাতে শিক্ষককে স্নেহ দিতে হয়, কখনো ছাত্রের ভুলের সামনে কঠোর হয়ে দাঁড়াতে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চেয়েছিলেন এমন শিক্ষা, যেখানে শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক হবে বিশ্বাস, স্বাধীনতা ও মানবিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি শান্তিনিকেতনে এমন এক পরিবেশ গড়ে তুলেছিলেন যেখানে শাসন ছিল মর্যাদাপূর্ণ, আর ভালোবাসাই ছিল শিক্ষার প্রাণ।
ভারতবর্ষ এই সংস্কৃতিরই ধারক ছিল। গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, এই মন্ত্র স্রেফ ধর্মীয় ছিল না, ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার চিরন্তন দর্শন ছিলেন শিক্ষাগুরু। শিক্ষক কেবল পাঠ দিতেন না, তিনি চরিত্র তৈরি করতেন। তাঁর স্নেহে ছাত্র আশ্রয় পেত, তাঁর শাসনে জীবনের দিশা দেখত। ভারতবর্ষের শিক্ষা-সংস্কৃতির ইতিহাসে শিক্ষক কেবল একজন পাঠদাতা নন, তিনি ছিলেন মানুষ গড়ারও শিল্পী। মা-বাবার পর যদি কারও হাতে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নিরাপদ রয়েছে বলে ভাবা হত, তবে তিনি ছিলেন তার শিক্ষক। তাঁদের একদিকে স্নেহের ছোঁয়া, অন্যদিকে শাসন। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠত ছাত্রচরিত্র। গড়ে উঠত ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষের চরিত্রও। সমাজ যদি এই সম্পর্কের মর্যাদা হারায়, তবে ক্ষতি শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার নয়, পুরো জাতির। কারণ পাঠ্যবই মানুষকে শিক্ষিত করতে পারে, কিন্তু একজন মহান শিক্ষকই শিশুকে প্রকৃত অর্থে মানুষ করে তোলেন। এখন জীবনে তথ্যের অভাব নেই কিন্তু প্রজ্ঞার অভাব। মুড়িমুড়কির মতো ডিগ্রি, কিন্তু মূল্যবোধ পড়ছে প্রশ্নের মুখে। সম্পর্ক ক্রমশ ম্লান হচ্ছে। সমাজ বদলাচ্ছে, শিক্ষা বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে। এত এত পরিবর্তনের ভিড়ে ভাঙছে শুধু বিশ্বাসের সেই অদৃশ্য সেতু। যা সমাজের সবস্তরের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের অন্যতম অবলম্বন।
একদিন স্কুলে শিক্ষকের বকুনি খেয়ে যে ছাত্র চোখের জল ফেলত, সেই ছাত্রই পরীক্ষায় ভালো ফল করলে প্রথমেই ছুটত সেই শিক্ষকের কাছেই, আশীর্বাদ নিতে। সে বিলক্ষণ জানত, স্যারের শাসনের আড়ালে কোনো বিদ্বেষ নেই, শুধু ভালোবাসা আছে, যা অকৃত্রিম, ভালোবাসার সে নদীর শেষ গন্তব্য ছাত্রের কল্যাণসাধন। এখনও বহু মানুষ জীবনের সাফল্যের কৃতিত্ব দেন সেই শিক্ষককে যিনি একদিন কঠোরভাবে বলেছিলেন, এভাবে চলবে না, আরও ভালো হতে হবে। না হলে থাপ্পড় খাবি। তখন হয়তো কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু এখন জীবনের কোনো কঠিন বাঁকে পৌঁছে বোঝা যায়, সেই কঠোরতা আরও ভালো আচরণের শিক্ষা গেঁথে দিয়েছিল মনে। তারই ফসল ফলছে সমস্ত জীবনের মাঠ, প্রান্তরজুড়ে। 
যে জাতি তার শিক্ষকদের সম্মান করতে শেখে, সেই জাতিই ভবিষ্যৎ তৈরি করে। যে ছাত্র একদিন শিক্ষকের বকুনির মধ্যে স্নেহের ভাষা পড়তে শিখেছিল, সেই ছাত্রই না জেনে জীবনের কঠিন সময় সঠিক পথ বেছে নেওয়ার শক্তি অর্জন করে ফেলেছিল। সমাজ সেই স্নেহ ও কঠোরতার কদর করুক। মূল্যবোধের বিচ্যুতি না আটকালে দেশ তৈরি হয় না।
যে অপরিচ্ছন্ন তমসাঘন পরিবেশ গত কয়েক শতকে তৈরি হয়েছে তার সর্বত্র হয়তো আলো পৌঁছতে সময় লাগবে। তবে আলো আসেই। মহাশূন্যের অন্ধকার ভেদ করে সূর্যের কিরণ রোজই ছড়িয়ে পড়ে মহাজগতে। জগৎ এই নিয়মেই চলে। রাত কাটে, ভোরও হয়। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ