শান্তনু দত্তগুপ্ত: আজ সোনাম ওয়াংচুকের ভুল-ত্রুটি, গোলমাল খুঁজতে আমরা উঠেপড়ে লেগেছি। হঠাৎ। তিনি ইনভেন্টর নন, ইঞ্জিনিয়ার। তিনি গরিব নন, পয়সাওয়ালা। সাধারণ ঘর থেকে তিনি উঠে আসেননি, তাঁর বাবা ছিলেন জম্মু-কাশ্মীরের মন্ত্রী। একটা ব্যাপার বোধগম্য হচ্ছে না... এইগুলো সত্যি হলেই কি এখন যা চলছে, তার সবটা মিথ্যা হয়ে যায়? একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, আত্মঘাতী ছেলেমেয়েরা, বোর্ডের পরীক্ষায় খাতা দেখা নিয়ে বিতর্ক এবং সোনাম ওয়াংচুকের এই সিস্টেম বদলানোর দাবিতে অনশন। নজর তো থাকা উচিত ওই ব্যক্তির লক্ষ্যে, মানসিকতায়, মানবিকতায়... তাঁর নামে নয়! আজ এই নামটা নেহা, আমিন অমিতোজ, কিংবা মণীশ কুমার যদি হয়? আমরণ অনশনে রয়েছেন এঁরাও। প্রত্যেকে পিএইচডি স্কলার। বদল চান তাঁরাও। সিস্টেমের। এঁদের খবর আমরা জানতে পারি না। কারণ নামগুলো বড়ো নয়। আড়ালে থেকেই আন্দোলনের ব্যাটন ধরেছেন। শাসকের সমস্যা হল, এই নামগুলোও এখন বড়ো হচ্ছে। এখন আমাদেরও নড়েচড়ে বসতে হবে। খুঁজতে হবে এই পড়ুয়াদের ত্রুটি। কী বলব এঁদের? আরবান নকশাল?
মধ্যপ্রদেশে সত্যাগ্রহ চলছিল ১৫ দিন ধরে। আদিবাসীদের। কেন-বেতোয়া লিঙ্ক প্রজেক্টের বিরোধিতায়। সাড়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। কিন্তু প্রতিবাদ কেন? অভিযোগ অনেক। অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণে দুর্নীতি, জমি জোর করে নেওয়া এবং তারপরও যথাযথ টাকা না দেওয়া, পুনর্বাসন বা প্যাকেজের প্রতিশ্রুতি স্রেফ ভুলে মেরে দেওয়া, ভরা বর্ষায় বাড়িঘর-স্কুল গুঁড়িয়ে দেওয়া। এরপরও আন্দোলন কি ‘অন্যায়’? নিশ্চয়ই। কারণ, শাসক তাই মনে করে। তাই ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও আমরণ অনশনে শুয়ে থাকা আদিবাসীদের দেখতে কেউ আসে না। কোনো মেডিকেল টেস্ট হয় না। আর ১৫ দিনের মাথায় গ্রেপ্তার হন বিক্ষোভকারী আদিবাসীদের নেতা, জয় কিষান সংগঠনের অমিত ভাটনাগর। ঘাড় ধরে তুলে দেওয়া হল বিক্ষোভ, আন্দোলন, সত্যাগ্রহ। কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন গলায় দড়ি দিয়ে। কেউ শুয়ে ছিলেন চিতায়। কেউ নদীর বুকজলে শুয়েছিলেন। বোঝাতে চেয়েছিলেন তাঁরা... এই প্রকল্প তাঁদের মৃত্যুর শামিল। দৌধন বাঁধ হলে আক্ষরিক অর্থে ভেসে যাবে ২২টি গ্রাম। পথে বসবে ৭ হাজার পরিবার। তাই আন্দোলন করছিলেন তাঁরা। অনশনরত অবস্থায় অমিত ভাটনাগর ‘চিতা’য় শুয়েই বলেছিলেন, ‘এর থেকে তো ব্রিটিশ শাসন ভালো ছিল! আমাদের জল-জঙ্গল-জমির অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। ভুয়ো লোকজনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। সব করে দেখে নিয়েছি আমরা। কোনো লাভ হয়নি। মহিলাদের পর্যন্ত লাঠি মেরেছে। ভুয়ো মামলা দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে ১২টা, ওই যে মেয়েটা... আইনের ছাত্রী। ওর বিরুদ্ধে আটটা ফলস মামলা দিয়েছে। গর্ভবতী মহিলা ওষুধের জন্য গিয়েছে, চড়-থাপ্পড় মেরে ভাগিয়ে দিয়েছে। এই দেশে তো এখন অধিকারের দাবি তোলার স্বাধীনতা নেই, আছে শুধু দুর্নীতি আর অত্যাচারের স্বাধীনতা।’ বুন্দেলখণ্ড ফুঁসছে। কিন্তু স্থানীয় কিছু চ্যানেল ছাড়া কেউ তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। এই আন্দোলনও আড়ালে থেকে যাচ্ছে। কারণ, অমিত ভাটনাগর বা আদিবাসী ওই মেয়েরা শাসকের বিরুদ্ধে। ‘উন্নয়নে’র বিরুদ্ধে। ছত্তরপুর জেলার স্লোগান ‘ন্যায় দো ইয়া মার দো’ তলিয়ে যাচ্ছে বারানা নদীর জলে। দাবি ছিল তাদের সামান্য, জমির বদলে জমি। গ্রামের বদলে গ্রাম। দাবি নয়, অধিকার। কেন ও বেতোয়ার ধরন একই। খরা হলে একসঙ্গে, বন্যা হলেও। তাহলে এক নদীর জল অন্যটির পরিপূরক হবে, এই যুক্তি কীভাবে খাটে? তাহলে কেন গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে দেবে শাসক? কেন পান্না রিজার্ভ ফরেস্টের মূল অংশে থাবা পড়বে কর্পোরেটাইজেশনের?
জি ডি আগরওয়ালের কথা আমরা ভুলে গিয়েছি। কানপুর আইআইটির প্রাক্তন অধ্যাপক। তার পরের পরিচয়, হরিদ্বারের মাতৃ সদন আশ্রমের স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ। ১১১ দিনের অনশনের পর ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। দাবি তুলেছিলেন, নমামি গঙ্গে প্রকল্পের নামে যা হচ্ছে, তা যথাযথ নয়। বলেছিলেন, গঙ্গোত্রী থেকে উত্তর কাশী পর্যন্ত গঙ্গার অবাধ প্রবাহ যাতে বাধাপ্রাপ্ত না হয়, তা নিশ্চিত করুক সরকার। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ‘উন্নয়নে’র নামে অন্যান্য কারবারে তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কান দেয়নি সরকার। দূষণ রোধে কঠোর ‘গঙ্গা সুরক্ষা আইন’ চালুর দাবিও তুলেছিলেন তিনি। ৮৬ বছরের বৃদ্ধের সেই দাবি ভেসে গিয়েছিল গঙ্গার জলের সঙ্গেই। শাসক প্রমাণ করেছিল, গান্ধীর দেশে অহিংস সত্যাগ্রহের আর মূল্য নেই। তাঁর পরও ব্যাটন ধরে রেখেছেন মাতৃ সদন আশ্রমের সাধুরা। সত্যাগ্রহ চলছে তাঁদের। চলছে অনশন। দাবি তুলছেন তাঁরা, গঙ্গার উপনদী অববাহিকায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলতে দেওয়া যাবে না। বন্ধ করতে হবে পাথর ভাঙা। শাসকের ফুরসৎ নেই দেখার, শোনার, ব্যবস্থা নেওয়ার। ভাবটা হল, ৪২ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট দিয়েছি। আর কী চাই? কিন্তু প্রশ্ন থাকছে। কারণ, এ পর্যন্ত খরচ হওয়া ২১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার কোটিই খরচ হয়েছে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের জন্য। আর বেশিটাই অপরিকল্পিত। গলদে ভরপুর। ক্যাগের রিপোর্টেই তার উল্লেখ রয়েছে। নকশায় ত্রুটি, কিছু প্লান্টের সঙ্গে বাড়ি-ঘরদোরের সংযোগই না দেওয়া... এগুলি হিমশৈলের চূড়ামাত্র। একটা গোটা এলাকায় যত বাড়ি রয়েছে, তার সঙ্গে বা মূল নিকাশি ব্যবস্থার সঙ্গে যদি প্লান্টের যোগই না থাকে, তাহলে সেই দূষিত জল সরাসরি গিয়ে পড়বে গঙ্গায়। হচ্ছেও সেটাই। উত্তরাখণ্ডে দেখা গিয়েছে, প্রায় ৩২ শতাংশ এমন ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্রেফ তৈরি হয়ে পড়ে আছে। তারা কাজ করছে না বা করানো হচ্ছে না। ফল? দূষিত নিকাশির অবারিত প্রবেশ গঙ্গাবক্ষে। এছাড়া বছরের পর বছর বরাদ্দ হওয়া অর্থ পড়ে থাকার মতো গাফিলতি তো রয়েছেই। আর সরকার কী করছে? স্রেফ বিজ্ঞাপনে কোটি কোটি টাকা খরচ। গঙ্গাকে কীভাবে দূষণমুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু হরিদ্বার থেকে সাগর—নদীর প্রতিটা বাঁকে কোনো না কোনো ছোটো কারখানা বা ট্যানারি ব্যবসা চলছে গঙ্গার জলের ভরসাতেই। তাদের প্রশ্ন করলে বলছে, গঙ্গার জল ব্যবহার না করলে ব্যবসা চালাব কীভাবে? খাব কী? ‘কত কী করেছি’র বদলে ‘কী কী করতে হবে’, সচেতনতার এই প্রচারটা বেশি ভালো হত না? এই প্রশ্নই তুলছেন সত্যাগ্রহীরা। কিন্তু তা শাসকের উন্নয়নের ঢাক এবং চোখরাঙানিতে গোঁত্তা খেয়ে ফিরে যাচ্ছে অন্ধকারে।
আদিবাসীরা আজ বলছেন, আমার দেশে আর অধিকার রক্ষার দাবি জানানো যায় না। নতুন প্রজন্ম বলে, এখন আন্দোলনের অর্থ শহুরে নকশালিজম। সমাজকর্মীরা আক্ষেপ করেন, নীতির আড়ালে দুর্নীতি চলছে। এই তিনটি আন্দোলন কি পৃথক? কোথাও গিয়ে এরা একসূত্রে বাঁধা নয়? অন্যায় দাবি তো কারও নয়! কেউ চায়, প্রশ্ন ফাঁস বা অনিয়মের নামে ভবিষ্যৎ যেন নষ্ট না হয়ে যায়। কারও দাবি শুধুমাত্র জমির... যথাযথ ক্ষতিপূরণের। আর কেউ চাইছেন, প্রকৃতিকে ভাঙিয়ে আখের গোছানো বন্ধ হোক। কিন্তু সবটাই থেকে যাচ্ছে আড়ালে। আজ এই ভারতের সোনাম ওয়াংচুকের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ, তাঁর নামে জোরটা ছিল বলে যুব সম্প্রদায়ের পায়ে কুড়ুল মারার মতো একটা ইস্যু আজ জনসমক্ষে এসেছে। না হলে এই আন্দোলনও হয়তো থেকে যেত আড়ালে। মণিপুরের মতো। অসমের লক্ষ লক্ষ ‘অ-নাগরিক’দের মতো। সময় কিন্তু বদলাচ্ছে। এই নতুন ভারতে জেন-জি মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। তারা শুধু চায় যোগ্যতার মূল্য। এক কাঁড়ি টাকা তাদের কাছে যোগ্যতার মাপকাঠি নয়। তারা চায়, প্রশ্ন ফাঁস হবে না। যে যেমন পরীক্ষা দেবে, তেমনই স্থান অধিকার করবে। চাকরি হবে, নিয়োগের নামে ধোঁকা নয়। বাবা-মাকে নিজেদের বিকিয়ে দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার জন্য লোন করতে হবে না। বদল হবে সিস্টেমের। কে সরকারে থাকল, তাদের মাথাব্যথা নেই। কিন্তু শাসকের আসনে যে বসবে, তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে। এই হাওয়াটা ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভের আগুন হয়ে... সমাজের আনাচে কানাচে। ব্যর্থতা ধামাচাপা দেওয়াটা সরকারের কাজ নয়। তার দায়িত্ব ব্যর্থতার কারণ খুঁজে সংশোধন, নাগরিকের অধিকার রক্ষা। তা না হলে শুধু ‘অপারেশন’ চালিয়ে ঘোড়া কেনাকাটির দিনও ফুরোবে। খুব দ্রুত। বিরোধী দল এবং নেতানেত্রীরা যদি দায়িত্ব না নেন... ইগো এবং স্বার্থচিন্তা ছেড়ে এগিয়ে না আসেন, সেই গুরুভার কাঁধে তুলে নেবে নতুন প্রজন্ম। তখন কিন্তু আর কোনো আন্দোলনই আড়ালে থাকবে না। রাখা যাবে না।