এত ক্ষোভ জমা হয়েছিল ভিতরে ভিতরে। এত অসন্তোষ! বিন্দুমাত্র আভাসটুকুও পায়নি সরকার। বশংবদ গোয়েন্দারা। সরকারের কেষ্টবিষ্টু, মহামান্য দোভাল সাহেব! কেউ টের পাননি। প্রেশার কুকারের উপরের ছিদ্রটা এঁটে বন্ধ করে দিলে যা অনিবার্য পরিণতি! যা হল তা সরকারের পক্ষে খুব স্বস্তির নয়। সংসদের বাদল অধিবেশন শুরুর দিনে দলে দলে নিরস্ত্র জেন জি’র ঢল রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলে। দাবি একটাই, বিচার পাইনি, এখনই বিচার চাই! কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল রাজধানীর সীমানা বরাবর। এভাবে কাঁপিয়ে দেয়নি সংসদের গেট থেকে অভিজাত দিল্লির রাজপথ। নিরাপদ অট্টালিকার ভিতর ও বাহির। আন্না হাজারের অনশনও দেখেছে দিল্লি। ১৫ বছর আগে। সেখানে এত ছাত্র-যুবক-তরুণের ভিড় ছিল না। এবার কিন্তু বাদল অধিবেশনের শুরুটাই হল মাথায় ঝড় নিয়ে। সংসদভবনের গেট বন্ধ করে। এই রোষ দেখে কি টনক নড়বে নরেন্দ্র মোদি সরকারের। নাকি ‘এত গোলযোগ সয় না’ বলে পাশ ফিরবে শাসক। এই ক্ষোভ যদি বাড়তে থাকে তাহলে তথাকথিত বিরোধী নেতানেত্রীদের ম্যানেজ করেও আগামী লোকসভা ভোটে খুব স্বস্তিতে থাকতে পারবে না বিজেপি। বিপদ সংকেত কিন্তু জানান দিচ্ছে এখন থেকেই। দেওয়াল লিখন পড়তে শিখুন পদ্মনেতারা।
দিল্লি ও তার আশপাশের অধিকাংশ রাজ্যই নিরাপদ ডবল ইঞ্জিন সরকারের ঘেরাটোপে মোড়া। দু-পাঁচ পিস নাছোড় বিরোধী অবশিষ্ট থাকলেও অধিকাংশই আজ গেরুয়া আশ্রয়ে লালিত। ঠিক ৪ মে’র পরের পশ্চিমবঙ্গের মতো। সরকার বিরোধী ভেদরেখাটাকেই মুছে দেওয়ার চেষ্টা। নেতা, এমএলএ, এমপি’র কেনাবেচা চলছে খোলা বাজারে। দেওয়া নেওয়ার সওদায় ব্যস্ত গুজরাতি বণিক। এই প্রলোভনের সামনে বিক্রি হবে না কে? দুই তৃতীয়াংশ সমর্থন পেয়ে সংবিধান সংশোধনের বিপুল আয়োজন। ওয়ান নেশন ওয়ান ইলেকশন। মহিলা বিলের আড়ালে ডিলিমিটেশন। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। আরও দুশো ফিরিস্তি! এককথায় দেশটাকে বদলে দেওয়ার বিরাট আয়োজন। কিন্তু যে সমাজে ছাত্র, যুবক, তরুণ তরুণীরাই সরকারের উপর ক্ষুব্ধ, দলে দলে যোগ দিচ্ছে মিছিলে বিক্ষোভে, ফুঁসছে প্রতিবাদের আগুনে সেখানে কিছু সুযোগসন্ধানী বিরোধী নেতানেত্রীকে বশ করে কি সরকার নিরাপদে নিদ্রা যেতে পারে? ভগবানেরও কিন্তু নিদ্রা ভাঙে কলরব যখন সীমা ছাড়ায়! এই সরকার এরপরও কি উচ্চ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নিয়ে নীরবই থাকবে? লক্ষ কোটি টাকার প্রশ্ন সেটাই। এরপরও কি সরকার ক্ষমতাসীন দল সব ভুলে মেতে থাকবে পরবর্তী অপারেশন লোটাসের সন্ধানে! কিন্তু মানুষ? সাধারণ তরুণ তরুণী যুব সমাজ? যাদের চাকরি নেই। কর্মসংস্থান শিকেয়। ব্যবসা লাটে! নিটের মতো পরীক্ষা বাতিল করছে সরকার। মন্ত্রীসান্ত্রি নির্ভয়ে পায়ের উপর পা তুলে সংবিধানই যেদেশে বিপন্ন সেখানে পরিত্রাণ মিলবে কোথায়? প্রশ্ন একটাই। জেন জি সম্মিলিতভাবে যে দেশে ফুঁসতে থাকে সেখানে সরকার শুধু পাটিগণিতের সংখ্যার জোরে সুরক্ষিত থাকতে পারে? ২০ মে যন্তরমন্তরের বাঁধ ভাঙা বিক্ষোভ এবং শাসকের নির্দেশে পুলিশের অমানবিক লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, অস্ত্র উঁচিয়ে নিরস্ত্র যুবক যুবতীদের দিকে ছুটে যাওয়া প্রমাণ করল শাসক বদলায়, পারিপার্শ্বিক রং পোশাক পালটে যায়, কিন্তু কোথাও অস্বস্তি দেখলেই বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়ার ঝোঁক বদলায় না কিছুতেই। কী অপরাধ ছিল সোনাম ওয়াংচুকের। অভিজিৎ দিপকের। সমবেত ছাত্রছাত্রী এবং আর পাঁচটা সংগঠনের। নিট এদেশের গুরুত্বপূর্ণ সর্বভারতীয় পরীক্ষাগুলির মধ্যে প্রথম সারিতে। এই পরীক্ষার আয়োজনের দায়িত্বে সরকারের শীর্ষ মহল। তাহলে কেন প্রশ্নফাঁসের দায়িত্ব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ইস্তফা দেবেন না। কেন দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে না। সরকারের হাতে প্রভূত ক্ষমতা, বিরোধীরা কার্যত ছত্রভঙ্গ। কিন্তু এই আপাত নিস্তব্ধতার আড়ালেই গোকুলে বাড়ছে ধিকিধিকি যুব ছাত্রের রোষ। এখানে সোনাম ওয়াংচুক, অভিজিৎ দিপকে কিংবা গীতাঞ্জলি আংমো উপলক্ষ্য মাত্র। সরকারকে নেমে এসে অবিলম্বে তাঁদের দাবিদাওয়া নিয়ে কথা বলতে হবে। সমাধান দিতে হবে। একটা দুটো মন্ত্রীকে যদি সরাতে হয় তো হবে। কিন্তু যুবক যুবতী, ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ যদি কমানো না যায় তাহলে মোদিজির বিকশিত ভারতের স্বপ্ন কিন্তু অচিরেই মাঠে মারা যাবে। স্নো পাউডার মাখিয়েও ইতরবিশেষ হবে না।
সোমবারই স্টার্টআপের প্রশংসা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আটাশ বছরের উদ্যোগীদের ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন। ওই একুশ থেকে আটাশের হাতেই দেশের ভবিষ্যৎ। ৭৫ পেরনো বৃদ্ধদের হাতে নয়। তাঁদের ক্ষুব্ধ রেখে, তাঁদের উপর লাঠি চালিয়ে, নির্মমভাবে মেরে সরকার নিরাপদ থাকতে পারে না। সোনাম ওয়াংচুককেও যেভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা অগণতান্ত্রিক। তেমনি রাজধানীর বুকে একুশ থেকে আটাশ বছরের ধিকিধিকি ক্ষোভের বিস্ফোরণ কোনোদিন পুলিশ দিয়ে আটকানো যায় না। যদি সরকার আবারও সেই একই ভুল করে তাহলে বলতেই হবে সর্বনাশের আর বেশি বাকি নেই। মোদি সরকারের কাছে একটাই আবেদন নিঃশর্ত আলোচনায় বসুন। লাঠি গুলি গ্যাস দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কেউ যেন না বলে ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন!