জীবমাত্রেই জীবন চায়। বাঁচার ইচ্ছা সকলেরই। কেহ কেহ মরিয়াও বাঁচিতে চায় বলে ‘মরিলে বাঁচি’। জীবকুলের মধ্যে মনুষ্যই ভগবানের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হওয়ায় শ্রেষ্ঠ জীব। অন্যান্য জীব সৃষ্টি করিয়াও ভগবান্ আনন্দ পাইলেন না কিন্তু মনুষ্য সৃষ্টি করিয়া আনন্দ পাইলেন কেন তাহা ভাগবত বলিয়াছেন, ‘ব্রহ্মাবলোকাধিষণং মুদমাপ দেবঃ’ অর্থাৎ একমাত্র মনুষ্যই সাধনার দ্বারা বুদ্ধিকে এমন নির্মল করিতে পারে যাহাতে ব্রহ্মদর্শন হয়। ব্রহ্মদর্শন করিতে গেলে মনুষ্যজীবন আবশ্যক বলিয়াই দেবতারাও এই ভারতবর্ষের মনুষ্যজন্ম আকাঙ্ক্ষা করেন। ব্রহ্মজ্ঞানের জন্য মনুষ্যজন্ম আবশ্যক এবং জন্মের পর জীবন ধারণের জন্য অনুকূল বিষয়ভোগ না হইলেও চলে না। শ্রুতি পরম কর্তব্য বিধান করিয়াছেন—“আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যো মন্তব্যো নিদিধ্যাসিতব্যঃ।” শাস্ত্র বলেন অন্যান্য বৈদিক ও লৌকিক ক্রিয়া করিলেও চরম লক্ষ্য রাখিতে হইবে সেই পরম কর্তব্যের দিকে। কোনও অফিসের কর্মচারী বেলা ১০টায় দ্রুতগতিতে অফিসের অভিমুখে ছুটিয়াছেন। তাঁহাকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায়—“মহাশয়! আপনি এত ব্যস্ত হইয়া কোথায় যাইতেছেন?” তিনি বলিবেন, “আমার কর্মক্ষেত্রে যথাসময়ে উপস্থিত হইতে হইবে বলিয়া ছুটিয়াছি” “কর্মক্ষেত্রে যান কেন?” “অর্থ উপার্জনের জন্য।” “অর্থ উপার্জন করেন কেন?” “জীবিকা নির্বাহের জন্য।” “জীবিকা নির্বাহ করেন কেন?” “বাঁচিবার জন্য।” “বাঁচেন কেন?” এইবার ভদ্রলোক সহসা কোনও সদুত্তর খুঁজিয়া পাইবেন না। শুধু একটি ভদ্রলোক কেন যাঁহারা ছোট বড় যে কোনও কর্মে নিযুক্ত থাকিয়া স্বল্প বা প্রচুর অর্থ উপার্জন করিতেছেন তাঁহাদের অনেকেই উক্ত প্রশ্নে নিরুত্তর হইবেন। পাশ্চাত্য দেশের বড় বড় মনীষীও উক্ত প্রশ্নের খুব সদুত্তর দিতে পারিয়াছেন বলিয়া মনে হয় না। একমাত্র ভারতবর্ষের আর্য ঋষিরাই এই প্রশ্নের সত্য ও সুসঙ্গত উত্তর দিয়াছেন যাহা ভুলিয়া আমাদের প্রভূত অর্থ সম্পদ্, বিজ্ঞানের উন্নতি এবং স্কুল-কলেজ প্রভৃতি বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকিলেও আমরা দুঃখ, অশান্তি, উচ্ছৃঙ্খলতা ও হাহাকার এড়াইতে পারিতেছি না, বরং প্রগতির নামে দুর্গতির গহ্বরেই প্রবেশ করিতেছি।আর্য ঋষিদের মতে আমরা অমৃতের সন্তান কর্মফলে সচ্চিদানন্দময় পিতার নিকট হইতে বহুদুরে নির্বাসিত হইয়াছি। তাঁহার নিকট ফিরিয়া যাওয়াই আমাদের একমাত্র অভীষ্ট হওয়া উচিত। সেজন্য সাধনা আবশ্যক এবং সাধনার জন্য মনুষ্য দেহই একমাত্র উপযোগী। মনুষ্য দেহটি নশ্বর অথচ পরমার্থপ্রদ। ‘অধ্রূবমর্থদম্’ এই দুর্লভ দেহ পাইয়াও যিনি নরজন্মের সার্থকতা রক্ষা করেন না তাঁহাকে শাস্ত্রকার ‘আত্মহা’ বা আত্মহত্যাকারী বলিয়াছেন। এই দেহেই জীবাত্মা জ্ঞানভক্তি লাভ করিয়া পরম পিতাকে জানিতে সমর্থ হন যাহাকে জানা ভিন্ন আর উদ্ধারের পথ নাই।



