কান্তি গাঙ্গুলী: ভারতবর্ষের বুকে জনপ্রতিনিধি প্রত্যাহার এবং পুনরায় সেই প্রতিনিধিদের নতুন করে নির্বাচিত হয়ে আসা সম্বন্ধীয় বিতর্কটি নিয়ে বর্তমানে বিশেষভাবে আলোচনা করা দরকার। ইতিমধ্যেই দলত্যাগ বিরোধী আইন, ১৯৮৫’কে এড়িয়ে বিভিন্ন দলে ভাঙন সৃষ্টি করে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি এক চরম অনৈতিক কার্যক্রমে লিপ্ত হয়েছে। কখনো মহারাষ্ট্রের এনসিপি, শিবসেনা, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা, আবার কখনো-বা আম আদমি পাটি বা পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে বিভাজন করতে নেমেছে বিজেপি। লক্ষ্য, সংবিধান সংশোধন করে বিভিন্ন সাংবিধানিক বিষয় বা সংশোধিত ‘অযৌক্তিক’ মহিলা বিল কিংবা কৃষি বিল সহ বিভিন্ন কালাকানুন পাশ করানো। লোকসভা বা বিধানসভায় যে মানুষ বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে, সেই জনমতকে অমর্যাদা করে সুবিধাবাদী জনপ্রতিনিদের উৎকোচ কিংবা পদের লোভ দেখিয়ে পক্ষে টানার হীন রাজনীতি বস্তুত গণতন্ত্রের মূলেই কুঠারাঘাত করছে। নিজেদের দলীয় শাসন ব্যবস্থার একাধিপত্য কায়েম করার এই চোরাগোপ্তা আক্রমণ সদ্য জায়মান গণতন্ত্রের টিকে থাকাকেই সন্ধিহান করে তুলবে, সন্দেহ নেই। মজার বিষয় হল এই যে, দলত্যাগীদের অনেকেই নির্বাচনের মুখোমুখি হলে সসম্মানে জনপ্রতিনিধি রূপে পুনরায় নির্বাচিত হতে পারবেন, সেই সম্ভাবনা বহুক্ষেত্রেই প্রায় নেই। এতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁদের অনেকের মৃল্য যে কানাকড়িও নেই, তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। দলত্যাগ বিরোধী আইন দল এবং দলের হুইপ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। তদপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আদালতে গেলেও সবসময় সমাধান মেলে না। কারণ স্পিকার সাহেব দলত্যাগীদের ব্যাপারে কবে বা কখন সিদ্ধান্ত নেবেন, তার কোনো বাঁধাধরা সময় নেই, তদুপরি স্পিকারের রায়ই চূড়ান্ত এবং স্পিকার নিজে তাঁর দলের সিদ্ধান্ত মানতে খুবই উদগ্রীব। গণতন্ত্রের সাংবিধানিক কাঠামোর অভ্যন্তরস্থ আইনসভার গরিমা বজায় রাখতে স্পিকারের হয়তো বয়েই গিয়েছে। ১৯৮৫ সালের দলত্যাগ বিরোধী আইন এবং ২০০৩ সালে সংযুক্ত হওয়া সিদ্ধান্ত মোতাবেক অন্তত দুই তৃতীয়াংশ সদস্যকে অবশ্যই দল ভেঙে বেরতে হবে এবং সেক্ষেত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইন বাঁচিয়ে দলত্যাগ করা যায়। ভোট দেওয়ার অধিকারের সঙ্গে নির্বাচিত করা বা না করার এবং নির্বাচিত প্রার্থীকে নৈতিক কারণে প্রত্যাহার করার বিষয়টি নিয়ে গণপরিষদেও আলোচনা হয়েছে। স্বাধীন ভারতবর্ষে অনেকগুলি বেসরকারি বিলও সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। বলাই বাহুল্য, গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমির এহেন পলকা অবস্থায় উল্লসিত হবেন পুঁজিপতি শ্রেণির প্রতিনিধিরাই। এছাড়াও দলত্যাগে উদ্যত জনপ্রতিনিধি নিজের দলবিরোধী বক্তব্য রেখে দলীয় অনুশাসন ভঙ্গ করলে, সেই ব্যক্তিকে যদি বহিষ্কার করা হয়, তাহলে যেকোনো দলে যোগদান করতে আর কোনো বাধা থাকে না।
জনপ্রতিনিধি প্রত্যাহার এবং নৈতিকতার স্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের পুনরায় নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টিকে নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বা নির্বাচন কমিশন উভয়ই তেমন কোনো নির্দিষ্ট মতামত প্রদানে অপারগতা জানিয়েছেন। তাদের যুক্তি এই যে, এক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগতভাবে মোট বৈধ ভোটারের অন্তত এক-চতুর্থাংশ ব্যক্তি যদি জনপ্রতিনিধিদের পুনরায় নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার পিটিশনে স্বাক্ষর করেন, তবেই সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পুনরায় নির্বাচন হতে পারে। তাদের মতে নিঃসন্দেহে এই প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল এবং জনবল সহ সরকারি স্তরে ব্যাপক উদ্যোগও প্রয়োজন, যা ভারতবর্ষের মতো উন্নতশীল দেশের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সাযুজ্যহীন। তবু ছত্তিশগড় নগর পালিকা আইন-১৯৬১’র ৪৭ ধারা মোতাবেক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণ নির্বাচিত কর্মকর্তাদের অপসারণের জন্য প্রত্যাহার নির্বাচনের ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও মধ্যপ্রদেশ, বিহার সহ বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলিকে প্রত্যাহারের অধিকার বিদ্যমান রয়েছে। প্রায় দেড় দশক আগে লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় আইন প্রণেতাদের ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের অধিকার ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানিয়েছিলেন। আসলে জনপ্রতিনিধিদের বৃহদাংশের এমন একটা ধারণা রয়েছে যে, একবার ভোটে জিতলেই হল, তারপর জনগণের কাছে আর তাদের যেন কোনো দায়বদ্ধতা নেই! মনে রাখতে হবে, নোটা আর অনৈতিক কাজের জন্য দলত্যাগ করার বিরুদ্ধে প্রতিনিধি প্রত্যাহার—দুটো এক জিনিস নয়। একটা ভোটের আগে আর একটা ভোটের পরে। অন্যদিকে ‘রাইট টু রিকল’ ভোটারদের জন্য একটি নিরবিচ্ছিন্ন জবাবদিহিতার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা। যার ফলে ভোটারদের পরবর্তী নির্বাচন ব্যবস্থা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। তবে সতর্ক থাকা উচিত, এই ব্যবস্থার অপব্যবহার যেন না হয়। কেন না অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিম্নবর্ণের জাতি অথবা মহিলাদের অপদস্থ করার জন্য পিতৃতান্ত্রিক এবং বর্ণবাদী সমাজব্যবস্থার মাথারা চেষ্টা চালায় জনগণকে বিভ্রান্ত করে এই অংশের মানুষদের মূলস্রোতের রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার। এই অপব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য নয়। ত্রিশঙ্কু সংসদ বা বিধানসভা তৈরি হলে ‘সংখ্যা’ একটা গুরত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অথচ গণপরিষদে ১৯৪৮ সালের ২৯ নভেম্বর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ লোকনাথ মিশ্র একটি সংশোধনী এনে ‘রাইট টু রিকল’-এর বিধান চেয়েছিলেন। প্রস্তাবটি গণপরিষদ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। আজ নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা এবং আদালতের ঘুলঘুলির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে ‘রাইট টু রিকল’-এর দাবি।
আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা মোটের উপর তাহলে দাঁড়াচ্ছে এই যে, একবার কোনোভাবে জিতে গেলেই হল, তারপর যে জনগণ নির্বাচিত করেছে তাঁদের আবেগ, অনুভূতি নিয়ে কোনো চিন্তা না করলেও চলবে। তারপরে অনৈতিক প্রকারে যতরকম সুযোগ-সুবিধা, উৎকোচ, মন্ত্রিত্ব নেওয়া যায়, সেই দিকেই ফিকির। অর্থাৎ ফকিরি বাদ দিয়ে সুযোগ শুধুই ফিকিরি। স্পিকার থাকাকালীন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় ‘টাকার জন্য প্রশ্ন কেলেঙ্কারি’র কারণে ১০ জন লোকসভার সদস্য এবং একজন রাজ্যসভার সদস্যকে বহিষ্কার করেন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে বাংলা-বিহার সংযুক্তির কথা ঘোষণা করলে বিরোধীরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। ফলস্বরূপ সেই সময় উত্তর-পশ্চিম কলকাতার উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী ব্যারিস্টার অশোক সেন পরাজিত হন সংযুক্ত জোটের প্রার্থী মোহিত মৈত্র’র কাছে। বিধানচন্দ্র রায় বলেছিলেন, এই উপনির্বাচনকে বাংলা-বিহার সংযুক্তি বিষয়ক গণভোট হিসাবে স্বীকার করে নেওয়া হবে। জনমানসের প্রতিক্রিয়াকে সম্মান দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় বাংলা-বিহার সংযুক্তির প্রস্তাব বাতিল বলে ঘোষণা করেন। কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা অবশ্যই আছে, তবে তা ব্যতিক্রমই। যদিও শুভেন্দু অধিকারী, তাপস রায়’রা যে দল করেন সেই দলের রাজনৈতিক মতাদর্শে আমি বিশ্বাস করি না, তবুও এ-কথা স্বীকার করতেই হবে যে, তাঁরা যখন দল বদলেছিলেন, তখন সমস্ত পদ থেকে পদত্যাগ করেই তাঁরা দল পালটে ছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁদের বিষয়টা ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
তবু আজকের নীতিহীন, মূল্যবোধহীন এই দল ভাঙাভাঙির বিরুদ্ধে একমাত্র নীতি-নিষ্ঠ অবস্থান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই করতে পারে বামপন্থীরাই। দল ভাঙানোর যে ভয়ংকর নোংরা খেলা বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর অলঙ্কার হয়ে দাঁড়িয়েছে, বামপন্থীরাই তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের স্বর তুলেছেন। বামপন্থী দলগুলো অন্য কোনো দলের জনপ্রতিনিধিকে যেমন কোনো দিন তাদের দলে প্রশ্রয় দেয়নি, তেমনি বামপন্থী দল থেকে কোনো নেতা যদি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলে যোগদান করে, সেক্ষেত্রে সেই ব্যক্তির জন্য বামপন্থী দলের দরজা আদর্শগত বিচ্যুতির কারণে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। তাই জনমত গঠনে বামপন্থীদেরই গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে, বিকল্প পথ দেখাতে হবে রাজনৈতিক আদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। না হলে, দেশ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমরা অপরাধী সাব্যস্ত হব। ১৯৬৭ সালে হরিয়ানার গয়ালাল অতি দ্রুত তিন-তিনবার দলবদল করে রেকর্ড গড়েছিলেন। যে ঘটনা থেকে ‘আয়া রাম গয়া রাম’ বাক্যবন্ধটি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে রাজধর্ম শব্দটি এককথায় হাস্যকর অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। স্বাধীন ভারতবর্ষে একের পর এক ঘটে গিয়েছে অলীক কুনাট্য রঙ্গ। গয়া লালের পর ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার সাংসদরা সাংবাদিক সম্মেলন করেই ঘোষণা করেন যে, তাদের উৎকোচ হিসাবে অর্থ দেওয়া হয়েছিল। অচিরেই হয়তো সংসদের বাদল অধিবেশনের পর মন্ত্রিসভা পুনর্গঠিত হবে, যেখানে গোপিনাথ শিন্ডে, রাঘব চাড্ডা, কাকলি ঘোষ দস্তিদারদের নতুন মুখ হিসাবে দেখা যেতে পারে। যে বিজেপি বা সংঘ পরিবার পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং নীতির রাজনীতির স্বপক্ষে কুম্ভীরাশ্রু ঝরিয়েছিল, আজ তাদের দাঁত-নখ বেরিয়ে এসেছে অবিমিশ্র ক্ষমতার দম্ভে। এটা আজ থেকে নয়, সেই নারদা কেলেঙ্কারি সময় থেকেই এটা স্পষ্ট যে, বিজেপির কাছে ন্যায়নীতিযুক্ত রাজনীতি আশা করাটাই মূর্খামি। ২০১৪ সালে নারদ কেলেঙ্কারির বিচারের জন্য গঠিত সংসদের এথিক্স কমিটির চেয়ারম্যান লালকৃষ্ণ আদবানি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তো দূরের কথা, এথিক্স কমিটির একটি মিটিংও পাঁচ বছর ধরে ডাকতে পারেননি। আজ দেশ এবং রাজ্যের মানুষকে এই নীতিহীন জনপ্রতিনিধিদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। সোচ্চার হতে হবে দলত্যাগী জনপ্রতিনিদের পদত্যাগ করে পুনর্নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার দাবিতে। না হলে, সাধারণতান্ত্রিক গণতন্ত্র ভবিষ্যতে আরও ভঙ্গুর এবং অকার্যকর হবে!
লেখক পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মন্ত্রী, মতামত ব্যক্তিগত