Bartaman Logo
২৩ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাণী

সাম্য ও শান্তির বাণী আজকের যুগে অপরিহার্য। মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নিয়ে বিশেষ আলোচনা। বিস্তারিত পড়ুন।

বাণী
  • ২৩ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বর্তমান সময়ে সভ্যদেশসমূহে সামা ও ঐক্যের বাণী মানুষের মুখে, গ্রন্থে ও সংবাদপত্রাদিতে প্রায় সর্বদাই শ্রুত ও দৃষ্ট হইতেছে। জনগণের অন্তরে যে ভাব থাকুক না কেন, সাম্যের কথায় প্রায় সকলেই মুখর। সকল বিষয়েই সকলের সমান অধিকার থাকিবে, কেহ অধিক সুবিধা সুযোগ ভোগ করিতে পারিবেন না এবং কেহ অন্যকে বঞ্চনা বা প্রতারণা বা অন্যায় আক্রমণ করিবেন না ইত্যাদি সাম্য ও শান্তিমূলক বাণী খুব মূল্যবান সন্দেহ নাই। এই শুভ বাণীসমূহের বিশ্বে ব্যাপক প্রচার চলিলেও পৃথিবীর কোন্ জাতির কত জনের হৃদয়ে এই সত্যের আন্তরিক অনুভব এবং তদনুসারে জীবনে আচরণ ঘটিয়াছে বা ঘটিতেছে তাহাই বিবেচ্য বিষয়। যদি উক্ত বিষয়ের আন্তরিক ও অকপট অনুভব সকল জাতির মনে জাগিত তাহা হইলে মানব সভ্যতার উৎকর্ষের হেতু বিজ্ঞানের বহু আবিষ্কার, বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মাধিকরণ, উপাসনার স্থান, ধর্মপ্রচার ও ধর্মীয় উৎসবাদির দিনের পর দিন আধিক্য এবং সাধুমহাজনগণের প্রভূত যত্ন সত্ত্বেও জগতের সকল দেশের ভিতরে ও বাহিরে পরস্পর হিংসা, জিঘাংসা, অবৈধ আক্রমণ, হত্যা, প্রতারণা, ছল, চাতুরী প্রভৃতি ধ্বংসাত্মক ও দুঃখজনক অশান্তি ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পাইত না।

Advertisement

বিশ্ববন্দিত ও গৌরবময় অতি প্রাচীন ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির অধিকারী আমরা ভারতবাসী—আমাদের নিজেদের স্বরূপ ও ভাণ্ডারের অমূল্য সম্পদ ক্রমে ক্রমে ভুলিতে বসিয়াছি ইহা আমাদের একপ্রকার অপমৃত্যু সন্দেহ নাই। আমাদের নিজেদের অক্ষয় সম্পত্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখিয়া বাহিরের দেশ হইতে যাহা উত্তম তাহা নিশ্চয়ই গ্রহণ করিতে হইবে। (“দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে”।) আদর্শ মানব চরিত্র গঠনের ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য ঋষিভারতে যে সকল উপদিষ্ট সত্য স্মরণাতীতকাল হইতে আছে, তাহা অন্যত্র কুত্রাপি নাই বরং ভারত হইতে উজ্জ্বল আলোক অন্য দেশে গিয়া অন্ধকার দূর করিয়াছে। 
ঐহিক সুখসমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য অন্য দেশ হইতে আবশ্যকমত বস্তু গ্রহণে আমাদের আগ্রহ থাকা উচিত। মানবনীতি ও অধ্যায়বিষয়ে ভারতের শাশ্বত বাণী বিশ্বের সকল মনীষী সাদরে উচ্চপ্রশংসার সহিত স্বীকার করিতেছেন। অপরের অনিষ্ট সাধন করিয়া যদি আমি লাভবান হইতে পারি, কেন আমি অপরের সেবা বা মঙ্গলজনক কর্ম করিতে যাইব, কেন আমি নিজেকে যেমন ভালবাসি আমার প্রতিবেশীকে সেইরূপ ভালবাসিব (Love thy neighbour as you love thyself) এই সকল প্রশ্নের সঙ্গত সদুত্তর পৃথিবীর অন্য কোনও দেশের লোক দিতে পারেন নাই। কিন্তু ভারতের ঋষি মাত্র তিনটি শব্দে এই বড় প্রশ্নের উত্তর দিয়াছেন ছান্দোগ্য উপনিষদে—‘তত্ত্বমসি’ এবং ইহা লক্ষ্য করিয়াই স্বামী বিবেকানন্দ বলিয়াছেন—“Metaphysics and Ethics in three words”। 
প্রত্যেক প্রাণীর মধ্যে একই সর্বভূতাত্মা পরমেশ্বর নারায়ণ বিরাজ করিতেছেন, অতএব নিজের সুখে যেমন সুখী হই, অপরের সুখেও সেইরূপ সুখ অনুভব করিতে হইবে এবং নিজের দুঃখে যেরূপ দুঃখী হইয়া কষ্ট অনুভব করি, অপরের দুঃখকষ্টেও সেইরূপ দুঃখ বোধ করিতে হইবে। গীতায় এই কথাই “আত্মোপম্যেন সর্বত্র স্মং পশ্যতি মেহর্জুন। সুখং বা যদি বা দুঃখং স যোগী পরমো মতঃ।” এই শ্লোকে বিবৃত হইয়াছে। সর্বভূতে অবস্থিত ঈশ্বরকে অর্থাৎ সর্বভূতকে অবজ্ঞা করিয়া কেবল প্রতিমাদিতে ঈশ্বরের পূজাকে ভাগবত ভস্মে ঘৃতাহুতি তুল্য বলিয়াছেন। সকল জীবের সেবা ও বিশ্বপ্রেমই ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ অর্চনা ও ভক্তি।
পণ্ডিতপ্রবর জ্যোর্তিময় নন্দের ‘জ্যোর্তিময় রচনাঞ্জলি’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ